পুলিশ সদর দফতরের তদন্ত কমিটির সুপারিশ

এসপির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে

রংপুর থেকে ওসি মোয়াজ্জেমকে প্রত্যাহারের দাবি * দুই এসআই সাময়িক বরখাস্ত

  যুগান্তর রিপোর্ট ১২ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শাস্তিমূলক ব্যবস্থা

ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যার ঘটনায় ফেনীর পুলিশ সুপার (এসপি) জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। পুলিশ সদর দফতরের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

তাকে একটি নন অপারেশনাল ইউনিটে সংযুক্ত করা হবে। তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। শনিবার পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) সোহেল রানা যুগান্তরকে এ কথা জানিয়েছেন।

এআইজি সোহেল রানা বলেন, ব্যবস্থা নিতে ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করে রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এছাড়া, তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে অভিযুক্ত এসআই (নিরস্ত্র) মো. ইউসুফকে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয় এবং এসআই (নিরস্ত্র) মো. ইকবাল আহাম্মদকে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় সংযুক্ত করা হয়েছে।

তাদের বিরুদ্ধেও নেয়া হচ্ছে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। তিনি বলেন, সাময়িক বরখাস্ত করে তাদের দূরবর্তী বিভিন্ন ইউনিটে সংযুক্ত করা হয়েছে। সংযুক্তি কোনো বদলি নয়। এটি শাস্তি প্রক্রিয়ার একটি অংশ। সংযুক্তিকালে তাদের কোনো দায়িত্ব প্রদান করা হয় না। তিনি আরও বলেন, তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ফেনীর পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের অংশ হিসেবে তাকেও একটি ইউনিটে সংযুক্ত করা হবে। তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি বর্তমানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন।

রংপুর ব্যুরো ও সোনাগাজী (ফেনী) প্রতিনিধি জানান, ফেনীর সোনাগাজী মডেল থানার বিতর্কিত সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে রংপুরে সংযুক্ত করায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেছে শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষ। শনিবার তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ বিক্ষোভ ও সমাবেশ করে। রংপুরে তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে জুতা ও স্যান্ডেল প্রদর্শন করা হয়। তাকে প্রত্যাহারের দাবিতে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম ঘোষণা করা হয়েছে। রাফি হত্যা মামলায় পৌর কাউন্সিলর মাকসুদসহ চার আসামিকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত।

দুপুর ১টার দিকে রংপুর মহানগরীর লালবাগ চত্বরে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে কর্মসূচি পালন করা হয়। নুসরাত জাহান রাফির হত্যাকাণ্ডের সময় সোনাগাজীতে দায়িত্ব পালনকারী মোয়াজ্জেমের সংযুক্তির আদেশ প্রত্যাহারের জন্য ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়। আদেশ প্রত্যাহার করা না হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, রংপুর রেঞ্জ ডিআইজিসহ প্রশাসনকে স্মারকলিপি প্রদান ও টানা আন্দোলনের হুমকি দেয়া হয়।

ছাত্র সংরক্ষণ অধিকার পরিষদের রংপুর বিভাগীয় কমিটির আহ্বায়ক রায়হান শরিফের সভাপতিত্বে প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তব্য দেন সমন্বয়ক হানিফ খান সজীব, যুগ্ম আহ্বায়ক আলমগীর নয়ন, আলমগীর কবির, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির আহ্বায়ক রোকনুজ্জামান রবিউল, কারমাইকেল কলেজ জাতীয় ছাত্রসমাজের সদস্য সচিব আরিফ আলী প্রমুখ। প্রতিবাদ সমাবেশে ওসি মোয়াজ্জেমকে রংপুরে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে জুতা ও স্যান্ডেল প্রদর্শন করা হয়। এরপর লালবাগ চত্বর থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক প্রদক্ষিণ করে। এতে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।

মোয়াজ্জেমকে রংপুরে বদলির সংবাদে শুক্রবার থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে চলছে সমালোচনার ঝড়। নগরীর সবখানে তাকে ঘিরে আলোচনা ও সমালোচনা চলছে। রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার পর মোয়াজ্জেমকে সাময়িক বরখাস্ত করে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজির কার্যালয়ে বদলি ও সংযুক্ত করা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করে পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, পুলিশ সদর দফতরের গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। মোয়াজ্জেম বেতন-ভাতা ও পদ অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা পাবেন না। শুধু খোরাকি ভাতা পাবেন। তাকে কোথাও পদায়নও করা হবে না।

পুলিশের রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য জানান, শাস্তি হিসেবে মোয়াজ্জেমকে সাময়িক বরখাস্ত করে আলাদা রেঞ্জ অফিসে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাকে কোনো দায়িত্ব দেয়া হয়নি। তাকে পদায়নও করা হয়নি। এ নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির কারণে ক্ষোভ দেখাচ্ছেন কেউ কেউ। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কোনো উত্তেজনা না ছড়াতে তিনি আহ্বান জানান।

রংপুর পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান জানান, যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ করছেন তারা প্রকৃত ঘটনা না জেনে তা করছেন। তিনি বলেন, পুলিশের সদর দফতর থেকে মোয়াজ্জেমকে রংপুরে পদায়ন করে বদলি করা হয়নি। বরং তাকে আলাদা রেঞ্জে বদলি করা হয়েছে। যাতে তদন্ত চলাকালে মোয়াজ্জেম কোনো প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন। রংপুর ডিআইজি অফিসে তিনি কেবল হাজিরা দেবেন এবং সেখানে সংযুক্ত থাকবেন। তার চলাচলের পরিধি সীমিত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ হলে সে বিষয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেবেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ।

রাফিকে হত্যার মামলায় পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদুর রহমানসহ চার আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। শনিবার সন্ধ্যায় ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসাইন তাদের কারগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। অন্য আসামিরা হল- সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ইংরেজির প্রভাষক আফসার উদ্দিন, মোহাম্মদ শামীম ওরফে শামীম ও আরিফুল ইসলাম।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক মো. শাহ আলম জানান, চার আসামিকে পাঁচ ও তিনদিনের রিমান্ড শেষে আদালতে হাজির করা হয়। তিনি বলেন, আসামিদের জবানবন্দি নেয়ার কাজ শেষ হলে অভিযোগপত্র তৈরির কাজে হাত দেবে পিবিআই। তিনি বলেন, নুসরাত হত্যায় ২২ জনকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পিবিআই। প্রধান আসামি অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাসহ এ পর্যন্ত ১২ জন দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়া দুই তরুণীসহ পাঁচজন রয়েছে। নুসরাতের গায়ে আগুন লাগাতে বোরকা পরে আসে দুর্বৃত্তরা। তারা তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়। ইতোমধ্যে কেরোসিন ও বোরকা বিক্রেতা ও বোরকা দোকানের কর্মচারী, নুসরাতের দুই বান্ধবী, মাদ্রাসার একজন নৈশপ্রহরী ও একজন পিয়নের সাক্ষ্য নিয়েছেন আদালত। এই সাতজনই মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী।’

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×