ফেনীর সেই এসপি প্রত্যাহার

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৩ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ফেনীর সেই এসপি প্রত্যাহার
পুলিশ সুপার এস এম জাহাঙ্গীর আলম। ফাইল ছবি

ফেনীর আলোচিত পুলিশ সুপার (এসপি) জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। রোববার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের এক আদেশে তাকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়।

মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা তদন্তে পুলিশ সদর দফতরের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেয়া হল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতর সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) সোহেল রানা যুগান্তরকে বলেন, ‘ফেনীর এসপি জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দফতরে সংযুক্ত করা হয়েছে। এর আগে পুলিশ সদর দফতরের তদন্ত কমিটি ফেনীর এসপি ও সোনাগাজী থানার ওসির বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছিল।’

এর আগে একই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করে রংপুর রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়। এছাড়া তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে অভিযুক্ত এসআই (নিরস্ত্র) মো. ইউসুফকে খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়ে এবং এসআই (নিরস্ত্র) মো. ইকবাল আহাম্মদকে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলায় সংযুক্ত করা হয়েছে।

৬ এপ্রিল সকালে আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যান নুসরাত জাহান রাফি। বোরকা পরিহিত কয়েকজন তাকে কৌশলে ছাদে ডেকে নিয়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে করা শ্লীলতাহানির মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়। অস্বীকৃতি জানালে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়।

এ ঘটনায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলা, পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলমসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন রাফির বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে মারা যান অগ্নিদগ্ধ রাফি। এর আগে ২৭ মার্চ রাফিকে নিজ কক্ষে নিয়ে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রোববার তাকে আদালতে হাজির করা হয়। এ পর্যন্ত রাফি হত্যার ঘটনায় গ্রেফতার ২২ জনের মধ্যে সিরাজ উদ্দৌলাসহ ৯ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

এ ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়া এবং মামলা ভিন্ন খাতে নেয়ার অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। এমনকি জেলা পুলিশ সুপার এসএম জাহাঙ্গীর আলম অভিযুক্ত ওসিকে রক্ষায় ঘটনা সম্পর্কে ভুল তথ্য পাঠান পুলিশ সদর দফতরে। বিষয়গুলো নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিস্তর সমালোচনা হয়। এর মধ্যে নুসরাতের পরিবারের দাবির মুখে প্রথমে সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে বদলি করা হয়। পরে এ ঘটনায় পুলিশের দায়দায়িত্ব খতিয়ে দেখতে ১৩ এপ্রিল পুলিশ সদর দফতরের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) এসএম রুহুল আমিনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।

৩০ এপ্রিল কমিটি তাদের প্রতিবেদন পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে জমা দেয়। প্রতিবেদনে সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম ও এসআই ইকবালকে সাময়িক বরখাস্ত এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও এসপি জাহাঙ্গীর আলম সরকার ও এসআই আবু ইউসুফের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং তাদের নন অপারেশনাল ইউনিটে বদলির সুপারিশ করা হয়।

পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, রাফি হত্যার ঘটনায় এসপি জাহাঙ্গীর আলম চরম মিথ্যাচার করেছেন। এমনকি রাফির গায়ে আগুন দেয়ার ঘটনাটি তাৎক্ষণিকভাবে জেনেও তিনি গুরুত্ব দেননি। ঘটনাস্থলে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। পুলিশ সদর দফতর থেকে হস্তক্ষেপ করা না হলে এসপি ঘটনাস্থলেই যেতেন না। ঘটনাটিকে আত্মহত্যার চেষ্টা বলে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। এটি জেনেও ওসির পক্ষেই অবস্থান নেন এসপি। তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে পুলিশ সদর দফতরের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এসপি জাহাঙ্গীর আলম চরম মিথ্যাচার করেছেন। তিনি তদন্ত কমিটিকে জানিয়েছেন, সকাল সাড়ে ৯টায় ঘটনা ঘটলেও তাকে শুরুতে জানানো হয়নি। খাগড়াছড়িতে তার একটি পূর্বনির্ধারিত অনুষ্ঠান ছিল। দুপুর সাড়ে ১২টার পর তিনি সেখানে রওনা দেন। রামগড় পার হওয়ার পর ঘটনাটি তাকে জানানো হয়। এরপর তিনি খাগড়াছড়িতে না গিয়ে ফেনীতে ফেরত আসেন। তদন্তে দেখা গেছে, ঘটনার পর পরই সকাল ১০টার দিকে এসপিকে বিষয়টি জানায় স্থানীয় পুলিশ। ঘটনা জানার পরও প্রায় ৩ ঘণ্টা তিনি ফেনীতে অবস্থান করেন। আধা ঘণ্টার মধ্যেই ফেনী থেকে সোনাগাজীতে যাওয়া যায়। কিন্তু রাফিকে আগুনে পোড়ানোর ঘটনা শোনার পর এসপি তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে যাননি। খাগড়াছড়ির একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দুপুর ১টার দিকে তিনি ফেনী ত্যাগ করেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশ সদর দফতর হস্তক্ষেপ না করলে ঘটনার দিন এসপি ঘটনাস্থলেই যেতেন না। জীবন্ত মানুষ পোড়ানোর মতো মর্মান্তিক ঘটনা স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে নাড়া দেয়নি। পুলিশ সদর দফতর থেকে যখন এসপিকে ফোন করা হয়, তখন এসপি ছিলেন খাগড়াছড়ির পথে। তাকে ঘটনাস্থলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হলে বিকাল ৫টার দিকে তিনি সোনাগাজীতে যান। অথচ কারও নির্দেশের অপেক্ষায় না থেকে এসপির উচিত ছিল সোনাগাজীতে ছুটে যাওয়া। পুলিশের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনের সঙ্গে মিলে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালানোর সব ধরনের চেষ্টা করেন। বিষয়টি মিডিয়াতে আসার কারণে অপচেষ্টা সফল হয়নি। ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টার অংশ হিসেবেই ঘটনা বিকৃত করে ওসি মোয়াজ্জেমের পক্ষে পুলিশ সদর দফতরে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন এসপি জাহাঙ্গীর আলম।

রাফি হত্যায় মানি লন্ডারিংয়ের প্রমাণ পাওয়া যায়নি : মাদ্রাসাছাত্রী রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় মানি লন্ডারিংয়ের যে অভিযোগ উঠেছিল তার প্রমাণ মেলেনি। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম এই তথ্য জানিয়েছেন। রোববার সিআইডি কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান।

তিনি বলেন, রাফি হত্যাকে কেন্দ্র করে কোনো অবৈধ লেনদেন হয়েছে কি না, তা আমরা তদন্ত করছি। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, রাফি হত্যাকাণ্ডে মানি লন্ডারিং হয়নি। অল্পকিছু টাকা লেনদেন হয়েছে, যা মানি লন্ডারিং পর্যায়ে পড়ে না।

এর আগে সিআইডির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, রাফি হত্যাকাণ্ডে কোনো অবৈধ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে অর্থ জালিয়াতির মামলা দায়ের করা হবে। এরপর এ ঘটনায় মানি লন্ডারিং হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে সিআইডি তদন্ত শুরু করে।

ঘটনাপ্রবাহ : পরীক্ষা কেন্দ্রে ছাত্রীর গায়ে আগুন

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×