ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি

‘এক এক করে ডুবে গেল তারা’

তিউনিসিয়ায় প্রতিনিধি পাঠানো হচ্ছে * লাশ উদ্ধার হলে ফিরিয়ে আনা হবে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী * যোগাযোগ স্থাপনে হটলাইন চালু * সিলেটের সাতজনের সলিল সমাধি, এলাকায় শোকের মাতম

  কূটনৈতিক রিপোর্টার ১৩ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘এক এক করে ডুবে গেল তারা’
ছবি: সংগৃহীত

অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে ৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার রাতে নৌকাডুবির ঘটনার আট ঘণ্টা পর ১৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে ১৪ জন বাংলাদেশি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, এ নৌকাডুবিতে কতজন বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই। লাশ উদ্ধার করা সম্ভব হলে তা দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।

তিনি বলেন, সরেজমিন ব্যবস্থা নিতে লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে তিউনিসিয়ায় প্রতিনিধি পাঠানো হচ্ছে। এদিকে নিহত ও জীবিতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে হটলাইন চালু করেছে রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি।

উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে সিলেটের বিলাল আহমেদ জানান, ‘একজন একজন করে যাত্রীরা ডুবে যেতে লাগল, হারিয়ে গেল সাগরের নিচে।’ যুগান্তরের স্থানীয় প্রতিনিধি, বিবিসি, এএফপি, রয়টার্সসহ বিভিন্ন সংবাদ সংস্থার খবর।

ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় হতাহত বাংলাদেশিদের ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে এবং জীবিতদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে তিউনিসিয়ায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি পাঠানো হচ্ছে। ঢাকায় রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন জানান, সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে জানতে পেরেছি, দুর্ঘটনাকবলিত নৌকায় ৫১ জন বাংলাদেশি ছিলেন। তার মধ্য থেকে ১৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এ হিসাবে ৩৭ জন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর জানতে পেরেছি।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, তবে নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা ৩০-৩৫ জন হতে পারে। এ ব্যাপারে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ ছাড়া জীবিতদের মধ্যে কত বাংলাদেশি আছেন সেটাও খোজ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, সরেজমিন ব্যবস্থা নিতে লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে তিউনিসিয়ায় প্রতিনিধি পাঠানো হচ্ছে। লাশ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে কি না, জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ত্রিপোলিতে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিনিধিরা সরেজমিন পরিদর্শন করে পরিস্থিতি দেখবেন। লাশ উদ্ধার হলে দেশে আনা হবে।

উদ্ধার ১৪ বাংলাদেশিকে দেশে ফেরত আনার ব্যাপারে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়ার পর দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেয়া হবে।

যোগাযোগ স্থাপনে হটলাইন চালু : নিহত ও জীবিত বাংলাদেশিদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে কাজ করছে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির আরএফএল বিভাগ। তথ্য আদান-প্রদানের জন্য দুটি হটলাইন নম্বর : ৮৮-০২-৪৯৩৫৪২৪৬ ও ০১৮১১৪৫৮৫২১ চালু করা হয়েছে। ৪৯৩৫৪২৪৬ নম্বরটি অফিস চলাকালে প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে বিকাল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত এবং ০১৮১১৪৫৮৫২১ নম্বরটি ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকবে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, জাতীয় সদর দফতর, ৬৮৪-৬৮৬, বড় মগবাজার অথবা ৬৪টি জেলা রেড ক্রিসেন্ট ইউনিটে আহত ও নিহতের স্বজনরা সরাসরি যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহ ও রেড ক্রিসেন্টের সেবা নিতে পারবেন।

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা : শনিবার তিউনিসিয়া উপকূলে বার্তা সংস্থা এএফপিকে বিলাল জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা সাগরের হিমশীতল পানিতে মৃত্যুপ্রহর গুনছিলেন। একপর্যায়ে সৃষ্টিকর্তা সহায় হন। তিউনিসিয়ার জেলেরা যেন সৃষ্টিকর্তার দূত হয়ে আসেন। যখন তাকে উদ্ধার করা হয়, ততক্ষণে দুই নিকটাত্মীয়কে তিনি তলিয়ে যেতে দেখেছেন। নিজের চোখের সামনে দুই নিকটাত্মীয়কে হারানোর প্রতিক্রিয়ায় ৩০ বছর বয়সী বিলাল বলেন, চোখের সামনে একের পর এক মানুষ ডুবতে দেখে নিজের বাঁচার আশাও ছেড়ে দিয়েছিলাম।

তিউনিসিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় শহর জার্জিসে রেড ক্রিসেন্টের একটি জরুরি আশ্রয় কেন্দ্রে ঠাঁই পেয়েছেন বিলাল। বিলাল জানান, ছয় মাস আগে তার ইউরোপ যাত্রা শুরু হয়। অন্য তিনজনের সঙ্গে তিনি আকাশপথে দুবাই প্রবেশ করেন। সেখান থেকে তুরস্কের ইস্তাম্বুল। এরপর আরেকটি ফ্লাইটে তাদের লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে নেয়া হয়। ত্রিপোলিতে তাদের সঙ্গে আরও প্রায় ৮০ বাংলাদেশির সঙ্গে তার দেখা হয়। তাদের সবাইকে পশ্চিম লিবিয়ার একটি কক্ষে তিন মাস রাখা হয়। বিলাল বলেন, ‘আমি ভেবেছিলাম আমি সেখানেই মারা যাব। দিনে একবার খাবার দেয়া হতো, কখনও কখনও কিছুই জুটত না। ৮০ জন মানুষের জন্য ছিল মাত্র একটি টয়লেট। গোসল করতে পারতাম না। কেবল দাঁত পরিষ্কার করতে পারতাম। খাবারের জন্য আমরা কাঁদতাম।’

সিলেট ও গোলাপগঞ্জ : ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবিতে সিলেটের সাত যুবকের মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন- ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার উত্তর কুশিয়ারা ইউনিয়নের সেনেরবাজার কটালপুর এলাকার মুহিদপুর গ্রামের মন্তু মিয়ার ছেলে আহমদ হোসেন (২১), একই গ্রামের হারুন মিয়ার ছেলে আবদুল আজিজ (২৪), সিরাজ মিয়ার ছেলে লিটন আহমদ (২৪), হাজী তজমুল আলীর ছেলে বেলাল আহমদ (৩০), উত্তর ফেঞ্চুগঞ্জ ইউনিয়নের ভেলকোনা গ্রামের তয়ারিছ আলীর ছেলে আয়াজ মিয়া (২৭) ও গোলাপগঞ্জের শরিফগঞ্জ ইউনিয়নের কদুপুর গ্রামের ইয়াকুব আলীর ছেলে কামরান আহমদ মারুফ (২০), একই উপজেলার ভাদেশ্বর ইউনিয়নের হাওরতলা গ্রামের রফিক মিয়ার ছেলে আফজল মাহমুদ (২৫)। ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যুগান্তরকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

লিটনের বাবা সিরাজ মিয়া জানান, আট লাখ টাকা চুক্তিতে ইতালি যাওয়ার কথা ছিল লিটনের। সিলেটের রাজা ম্যানশনের ইয়াহিয়া ওভারসিজ নামের একটি ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে এমন চুক্তি হয়েছিল তাদের। এ এজেন্সির মালিক এনাম আহমদের বাড়ি গোলাপগঞ্জের পনাইরচকে। এ ঘটনার পর থেকে বন্ধ রয়েছে ইয়াহিয়া ওভারসিজ। রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত একাধিকবার গিয়েও ওভারসিজের অফিস তালাবদ্ধ পাওয়া গেছে। এনামের ব্যবহৃত সব কটি মোবাইল ফোন নম্বরই বন্ধ রয়েছে। তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে তিনি পালিয়েছেন।

কুলাউড়া (মৌলভীবাজার) : কুলাউড়া উপজেলার ভুকশিমইল ইউনিয়নের বাদে ভুকশিমইল গ্রামে হাফিজ মো. শামীম আহমদের (২৮) বাড়ি। আবদুল খালিকের সাত ছেলের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন শামীম। সিলেট গোটাটিকর সরকারি মাদ্রাসায় তিনি দাখিল পর্যন্ত পড়েছেন। তার বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। শোকাহত মা রাজনা বেগম জানান, ‘বাবারে শেষবারের মতো আমার পুয়ার (ছেলের) মুখটা দেখতাম চাই।’

পারিবারিক সূত্র জানায়, পাঁচ মাস আগে পরিবারের কাউকে না জানিয়ে শামীম লিবিয়ায় চলে যান। কয়েকদিন আগে বাড়িতে ফোন দিয়ে তিনি জানান, লিবিয়ায় রয়েছেন এবং সেখান থেকে তিনি ফ্রান্সে যাবেন। মঙ্গলবার মায়ের কাছে ফোন দিয়ে শামীম জানান, বুধবার তিনি ফ্রান্সে যাওয়ার জন্য রওনা দেবেন। এরপর তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। শামীম সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহরিয়ার আলম সামাদের ছোট ভাই। আর ফেঞ্চুগঞ্জের কামরান আহমদ হলেন শাহরিয়ার আলম সামাদের শ্যালক।

ঘটনাপ্রবাহ : ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবি

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×