উত্তরখানে বদ্ধঘরে মা ও দুই সন্তানের লাশ

হত্যা ধরেই তদন্ত করছে পুলিশ

ময়নাতদন্তে হত্যার আলামত : চিকিৎসক * মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল পরিবারটি * স্বজনরা মামলা করার জন্য সময় চেয়েছেন * মা ও ছেলের নাম করে দুটি চিরকুট উদ্ধার করেছে পুলিশ

  যুগান্তর রিপোর্ট ও ভৈরব প্রতিনিধি ১৪ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হত্যা ধরেই তদন্ত করছে পুলিশ

রাজধানীর উত্তরখানের একটি বদ্ধঘরে মা, ছেলে ও মেয়ের লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি হত্যা ধরেই তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। তবে এখনও ক্লুলেস বলছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। পুলিশ বলছে, স্বজনরা হত্যা মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এজন্য ১ দিন সময় চেয়েছেন। তাদের কেউ হত্যা করেছে নাকি নিজেরাই আত্মঘাতী হয়েছেন এ বিষয়ে তদন্ত চলছে। ঘটনাস্থল থেকে মা ও ছেলের নাম করে দুটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। এ চিরকুট দুটি একই খাতা থেকে পাতা ছিঁড়ে লেখা হয়েছে। তবে হাতের লেখা আলাদা।

চিরকুট দুটি তারা নিজেরা লিখেছেন নাকি অন্য কেউ লিখেছেন এ বিষয়টিও তদন্ত করা হচ্ছে। পরিবারটি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল বলে জানা গেছে। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক বলছেন, মা ও মেয়েকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। ছেলের গলায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে হত্যা করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে ঘটনাটি আত্মহত্যা মনে হয়নি।

এ ঘটনা তদন্তে ভৈরবের জগন্নাথপুরের গ্রামের বাড়ি নিয়ে শরিকদের সঙ্গে বিরোধের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে মৃত জাহানারার প্রয়াত স্বামী বিআরডিবির ব্যবস্থাপক ইকবাল হাসানের পেনশনের ৪০ লাখ টাকা তুলতে না পারার ঘটনাকেও বিবেচনায় নিয়েছে পুলিশ। ২০১৬ সালে মারা যাওয়ার পরও তার পরিবার কেন টাকা তুলতে পারছে না সেদিকও দেখা হচ্ছে।

পুলিশ জানায়, নিহত ব্যক্তিরা হলেন- জাহানারা আক্তার মুক্তা (৪৮), তার ছেলে মুহিব হাসান (২৮) ও জাহানারার মেয়ে তাসফিয়া সুলতানা মিম (১৮)। রোববার রাতে উত্তরখানের চাপানেরটেক এলাকার ৩৪/ডি নম্বর বাড়ি থেকে তাদের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ।

পরিবারটি চলতি মাসের শুরুতে ওই বাসাটি ভাড়া নিয়েছিল। ওই বাড়িটি ছিল একতলা। পুলিশ বন্ধঘরের দরজা ভেঙে তিনটি লাশ উদ্ধার করে। ওই বাড়ির একটি কক্ষের বিছানায় জাহানারা এবং তার মেয়ে তাসফিয়ার লাশ পড়েছিল।

মেঝেতে পড়েছিল জাহানারার বড় ছেলে মুহিবের লাশ। পাশের ড্রয়িংরুমে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে রক্তের দাগ লেগে আছে। ঘটনাস্থল থেকে একটি ধারালো বঁটি উদ্ধার করা হয়েছে। ঘরের সব দরজা-জানালা লাগানো ছিল।

তিনটি লাশের ময়নাতদন্তের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ সোমবার দুপুরে সাংবাদিকদের বলেন, মা ও মেয়েকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে।

মায়ের শরীরে ছোট্ট একটি আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অপরদিকে ছেলেটির গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে তাকে হত্যা করা হয়েছে। এটি আত্মহত্যা মনে হয়নি। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং ভিসেরা প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

পুলিশের দক্ষিণখান জোনের এডিসি হাফিজুর রহমান সোমবার বিকালে যুগান্তরকে বলেন, একই পরিবারের তিনজনের লাশ উদ্ধারের ঘটনাটি হত্যা ধরেই তদন্ত করা হচ্ছে। এ ঘটনায় স্বজনরা হত্যা মামলা করবে। ঘটনাস্থল থেকে দুটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। চিরকুট দুটি নিহত ব্যক্তিরা লিখেছেন নাকি অন্য কেউ লিখেছে এ বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।

পুলিশ ও স্বজনরা বলছেন, ২০১৬ সালে জাহানারার স্বামী বিআরডিবির ব্যবস্থাপক ইকবাল হোসেনের মৃত্যুর পর পরিবারটি অথৈ সাগরে পড়ে। মৃত্যুর সময় ইকবাল মৌলভীবাজারের বড়লেখায় কর্মরত ছিলেন।

ইকবালের মৃত্যুর পর তার পেনশনের ৪০ লাখ টাকা তুলতে পারছিল না পরিবারটি। জাহানারার ছেলে মুহিব হাসান সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে চাকরির চেষ্টা করছিলেন। জাহানারা একজন গৃহিণী। জাহানারার মেয়ে তাসফিয়া মানসিক প্রতিবন্ধী ছিলেন। তার কারণে বিভিন্ন সময় পরিবারটিকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছে।

জাহানারার স্বামীর মৃত্যুর পর পরিবারটি মৌলভীবাজার থেকে ভৈরবে চলে আসে। মেয়েটির অসুস্থতার কারণে আত্মীয়রা তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন। পরে তারা ঢাকার কাফরুলে চলে আসেন। সেখানেও তারা টিকতে পারছিলেন না।

প্রতিবন্ধী মেয়ের জন্য প্রতিবেশীরা বিরক্ত হচ্ছিলেন। মেয়েটি সারাক্ষণ চিৎকার-চেঁচামেচি করত। বিভিন্ন বাসার দরজায় গিয়ে নক করত। এ কারণে ওই বাসা ছেড়ে দেয়ার জন্য তাদের চাপ দিচ্ছিলেন প্রতিবেশীরা। ২ মাস আগে তারা আবারও ভৈরবের জগন্নাথপুরে গিয়ে বাসা ভাড়া নেন। সেখানে আবারও একই ধরনের সমস্যা হলে তারা চলতি মাসের শুরুতে উত্তরখানে চলে আসেন।

জাহানারার বড় ভাই মনিরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, জাহানারার স্বামী ইকবাল উত্তরখানে চার কাঠা জমি কিনেছিল। তারা ভৈরবে থাকতে না পেরে চলতি মাসের শুরুতে উত্তরখানে চলে আসে। স্বামীর কেনা জমিতে আপাতত টিনশেড বাড়ি করে স্বজনদের কাছ থেকে দূরে থাকার চিন্তা ছিল তার। এ কারণে জাহানারা ওই জমির কাছেই বাসা ভাড়া নিয়েছিল। কিন্তু এভাবে তাদের মৃত্যু হবে বুঝতে পারিনি।

তিনি আরও বলেন, জাহানারার স্বামী ইকবালের পেনশনের টাকা এখনও তুলতে পারেনি। এ নিয়ে পরিবারটি হতাশার মধ্যে ছিল। ঘটনাটি কীভাবে হল আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। তারা আত্মহত্যা করবে এটা আমরা বিশ্বাস করি না। তাদের কোনো শত্রু আছে বলেও আমরা জানি না। তবে আমাদের অজ্ঞাতে কোনো শত্রু থাকতেও পারে। ঘটনাটি সঠিকভাবে তদন্ত করা উচিত।

জাহানারার স্বামী ইকবালের ছোট ভাই আহসানউল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, তাদের কোনো শত্রু আছে বলে শুনিনি। তবে এ ঘটনার সঠিক তদন্ত হওয়া উচিত।

চিরকুট নিয়ে রহস্য : পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল থেকে দুটি চিরকুট উদ্ধার করা হয়েছে। দুটি চিরকুটেই লেখা ছিল, ‘আমাদের মৃত্যুর জন্য ভাগ্য ও আমাদের আত্মীয়স্বজনদের অবহেলাই দায়ী। মৃত্যুর পর আমাদের সম্পদ গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দেয়া হোক।’ একটি চিরকুটে লেখা রয়েছে জাহানারার নাম, অন্যটিতে লেখা রয়েছে জাহানারার ছেলে মুহিব হাসানের নাম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তদন্তসংশ্লিষ্ট একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, চিরকুট নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে। এ চিরকুট দুটি তারা লিখেছেন, নাকি তাদের কেউ হত্যা করে চিরকুট দুটি লিখে গেছে এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।

মুহিবের ফেসবুক স্ট্যাটাস খতিয়ে দেখছে পুলিশ : পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার মুহিব হাসানের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একটি স্ট্যাটাস দেয়া হয়। সেখানে বলা হয়, ‘এ সমাজে ভালো মানুষের কোনো দাম নেই। দাম আছে শুধু টাকা-পয়সার। হে সমাজ বিদায়। তোমার কাছে আর ফিরব না।’

ঘটনা তদন্তের সঙ্গে যুক্ত একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ওই স্ট্যাটাস মুহিব নিজে দিয়েছিলেন, নাকি অন্য কেউ তার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে দিয়েছে এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। হত্যার ঘটনা ধরে তদন্ত হবে। তবে তদন্তে যদি অন্য কিছু পাওয়া যায়, সেই অনুযায়ী প্রতিবেদন দেয়া হবে।

সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে : জাহানারার স্বামী ইকবাল হোসেনের গ্রামের বাড়ি ভৈরবের জগন্নাথপুরের প্রতিবেশীরা জানান, ইকবাল হোসেনের বাড়িটি ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক করার সময় সরকার অধিগ্রহণ করেছিল। পরে ইকবাল হোসেন তার ভাইদের সঙ্গে জগন্নাথপুরে একটি বাড়ি কিনেছিলেন।

ওই বাড়ির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে তার ভাইদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। বিরোধের কারণে তাদের বাড়িতে থাকতেও দেয়া হতো না। সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা নিয়ে আগামী ঈদের পর ভৈরবে সালিশ হওয়ার কথা ছিল।

প্রতিবেশী ওয়াহিদ মিয়া জানান, ইকবালের পরিবারের সঙ্গে তার ভাইদের বাড়ি নিয়ে বিরোধ ছিল। তারা ভৈরবে ওই বাড়ির পাশে বাসা ভাড়া নিয়েও থেকেছিল। এ বিরোধের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এদিকে জগন্নাথপুর এলাকার পৌর কাউন্সিলর ফজলুর রহমান জানান, এলাকায় পরিবারটি ছিল নিরীহ।

ইকবালের মৃত্যুর পর পরিবারটি অসহায় হয়ে পড়ে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী মেয়েটির চিকিৎসা ও সংসার নিয়ে জাহানারা খুব চিন্তিত ছিলেন। তবে তিনজনের মৃত্যুর বিষয়টি সঠিকভাবে তদন্ত করে দেখা উচিত।

উত্তরখান থানার ওসি হেলাল উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, আমি নিশ্চিত দু’জনকে হত্যার পর একজন আত্মহত্যা করেছেন। কারণ ওই ঘর ভেতর থেকে তালাবদ্ধ ছিল। ভেতরে দুটি চিরকুট পাওয়া গেছে। ভেতর থেকে কেউ পালিয়ে গেছে এমন কোনো আলামতও পাওয়া যায়নি। সার্বিক অবস্থা দেখে আমি নিশ্চিত এটি আত্মহত্যার ঘটনা।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×