‘লোডেড মূল্যে’ শুল্ক আদায়

বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে আমদানিকারকরা

  শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, চট্টগ্রাম ব্যুরো ১৪ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস

আমদানি করা সিংহভাগ পণ্যেই ‘লোডেড মূল্যের’ (গ্রুপে রক্ষিত তিন মাসের ডাটা ভেল্যু বা গ্রুপ ভেল্যু) ওপর শুল্ক আদায় করছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস।

এই শুল্ক না দিলে আমদানিকৃত পণ্য চালান দিনের পর দিন বন্দরে পড়ে থাকছে। গুনতে হচ্ছে পোর্ট ও শিপিং লাইনের ডেমারেজ। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই অতিরিক্ত শুল্ক দিয়ে পণ্য খালাস করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ আমদানিকারকদের। এতে তারা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

তাদের আরও অভিযোগ, শুল্ক আদায়ের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম কাস্টমস কমিশনার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ করছেন। নিজের মতো করে পণ্যের ‘গ্রুপ ভেল্যু’ নির্ধারণ করছেন। রাজস্ব আদায়ে প্রদত্ত টার্গেট পূরণ করতেই তিনি এমনটি করছেন।

যদিও কাস্টমস কমিশনার কাজী মোস্তাফিজুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘শুল্ক আদায়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, যা এনবিআর বা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ঠিক করে দিয়েছে। এজন্য রয়েছে সুনির্দিষ্ট শুল্ক মূল্যায়ন বিধিমালা।

এর মধ্যে গ্রুপ ভেল্যুর ওপর ভিত্তি করে শুল্ক আদায় হচ্ছে অন্যতম একটি পদ্ধতি। এর বাইরে নিজের মতো করে শুল্ক আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। আইন সবার জন্য সমান। সুনির্দিষ্টভাবে কোনো আমদানিকারক বা প্রতিষ্ঠানকে বাড়তি সুবিধা দেয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

সম্প্রতি স্বয়ং কমিশনারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এনে তার (কমিশনার) কাছেই চিঠি দিয়েছেন দক্ষিণ পাহাড়তলীর আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ফনিক্স এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর মোহাম্মদ ইফাত। সেখানে লোডেড মূল্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ এবং এতে আমদানিকারকের কী ধরনের ক্ষতি হচ্ছে, তার একটি চিত্র ফুটে উঠেছে। চিঠির অনুলিপি এনবিআর’র চেয়ারম্যানের কাছেও দেয়া হয়েছে।

২ মে দেয়া ওই চিঠিতে আমদানিকারক বলেন, ‘আমার আমদানিকৃত শতভাগ পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য ‘প্রলিপ্রপলিন লুবান’ (একধরনের দানা) ওমান সরকারের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান থেকে আমদানি করি। শুল্কায়ন গ্রুপ ৭ (বি)তে শুল্কায়ন করতে গেলে তা ঘোষিত মূল্যে শুল্কায়ন করতে অনীহা প্রকাশ করে।

তাই আমি আপনার বরাবরে ওই পণ্য ঘোষিত মূল্যে শুল্কায়নের আবেদন করি। যার পত্র নম্বর: ২০৩০১ তারিখ ০২/০৫/১৯। এতেও আপনি ন্যায়সম্মত সিদ্ধান্ত প্রদান করেননি।

প্রতিনিয়ত অযৌক্তিক, মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে অন্যায়ভাবে লোডেড মূল্যকে রেকর্ড মূল্যে দেখিয়ে শুল্কায়নের আদেশ দিয়ে থাকেন, যা পূর্বের কমিশনারদের আদেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বটে। এতে আমি নিরূপায় হয়ে পোর্ট ডেমারেজ, শিপিং ডেমারেজ ও অন্যান্য ডেমারেজের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য লোডেড মূল্যের পার্থক্যের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক গ্যারান্টি প্রদান করে পণ্য খালাসের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। তবে ভবিষ্যতে ন্যায়বিচারের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতিসহ উচ্চহারে অযৌক্তিক লোডেড মূল্যে শুল্কায়নকৃত অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য উচ্চ আদালতের আশ্রয় নেব।’

চিঠিতে ওই আমদানিকারক ঘোষিত মূল্য ও লোডেড মূল্যের পার্থক্যের সমপরিমাণ রাজস্বের ব্যাংক গ্যারান্টি প্রদানের মাধ্যমে সাময়িক শুল্কায়ন করে পণ্য খালাসের ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করেন।

আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ইকবাল এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. ইকবাল যুগান্তরকে বলেন, ফনিক্স এন্টারপ্রাইজ তার ছেলের প্রতিষ্ঠান। তাদের আমদানি পণ্যটির সরবরাহকারী হচ্ছে ওমানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা।

আলোচ্য পণ্যটির মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে কত, তা ইন্টারনেটের মাধ্যমে এক মুহূর্তের মধ্যে দেখে নেয়া যায়। এখানে লুকোচুরি বা পণ্যমূল্য কম দেখানের অথবা আন্ডার ইনভয়েস করার কোনো সুযোগ নেই। এরপরও কাস্টম হাউস সেই পথে না গিয়ে গ্রুপ ভেল্যুর দোহায় দিয়ে অতিরিক্ত শুল্ক আদায় করছে।

প্রতিটন ১১৬০ ডলারে পণ্যটি কেনা হলেও বাধ্য হয়ে ১২০০ ডলার মূল্যে শুল্কায়ন করতে হয়েছে। এক্ষেত্রে ৪০ ডলার লোড দেয়া হয়েছে। এই পণ্যের শুল্ক হচ্ছে ১০ শতাংশ। এভাবে বেশ কয়েকটি চালানে তাদের প্রতিষ্ঠানকে লোডেড মূল্যে শুল্ক দিতে গিয়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়েছে। এতে তাদের ব্যবসা লাটে ওঠার উপক্রম হয়েছে।

এই আমদানিকারক আক্ষেপ করে বলেন, অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, কাস্টম হাউস ব্যবসায়ীদের সোজা পথে ব্যবসা করতে দিচ্ছে না। দেশে উৎপাদন হয় না- এমন পণ্য বা পণ্যের কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক কমিয়ে দিলে (যেসব ক্ষেত্রে দেশীয় শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে না) আমাদানি যেমন বাড়বে, সরকারের রাজস্বও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।

এখন শুল্ক কমানো তো দূরের কথা, ঘোষিত মূল্য বা আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের তোয়াক্কা না করে মনগড়া মূল্যের ওপর শুল্ক আদায় করছে কাস্টম হাউস। তিনি বলেন, কাস্টমসের এমন চাপাচাপির কারণে কমার্শিয়াল আমদানির পরিবর্তে বন্ডে আমদানির দিকে ঝুঁকছেন ব্যবসায়ীরা। এতে সরকারেরই ক্ষতি হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×