ধানের উৎপাদন খরচ নিয়ে দুশ্চিন্তায় লাখো কৃষক

বিভিন্ন স্থানে ছাত্র কৃষক জনতার বিক্ষোভ * রাজশাহীতে প্রতি বিঘায় ক্ষতি ৪ হাজার টাকা * দেওয়ানগঞ্জে দুই মণ ধানেও মিলছে না একজন কামলা * কৃষকের ধানে ফায়দা লুটছে মিলাররা

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৬ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কৃষক

চলতি বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। ধানের দাম নেই। বাজারে ক্রেতা নেই। সরকারি সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়নি। দিনমজুরের অগ্নিমূল্য। খরচ জোগাতে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক। এতে উৎপাদন খরচ উঠছে না।

উল্টো প্রতি মণে লোকসান হচ্ছে তিনশ’ টাকার বেশি। কোথাও ২ মণ ধান দিয়েও একজন কামলা মিলছে না। অনেকে ধার-দেনা করে বোরো ধান আবাদ করছেন। এখন দেনা শোধ করবেন কিভাবে আর খাবেনই বা কি? এমন দুশ্চিন্তায় ঘুম নেই লাখো কৃষকের।

রাগে-ক্ষোভে অনেক জায়গায় কৃষক পাকা ধান ক্ষেতে আগুন দিচ্ছেন। কালিহাতীতে আগুন দেয়া ক্ষেতের ধান কেটে দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। চলতি বোরো মৌসুমে কৃষকের উৎপাদন খরচের সঙ্গে প্রণোদনা যোগ করে সরকার প্রতি মণ বোরো ধানের মূল্য নির্ধারণ করে ১ হাজার ৪০ টাকা।

সিদ্ধান্ত হয় ১২ লাখ ৫০ হাজার টন ধান-চাল কিনবে সরকার। ২৫ এপ্রিল থেকে সংগ্রহ অভিযান শুরুর কথা। কিন্তু যথাসময়ে সংগ্রহ শুরু না হওয়ায় মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষককে সর্বস্বান্ত করতে ৪ থেকে ৫শ’ টাকা মণ ধান কিনছে। ফলে তাদের প্রতি মণে লোকসান গুনতে হচ্ছে ৩শ’ টাকার বেশি। সময়মতো সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু না হওয়ায় এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ অবস্থায় দ্রুত ধান-চাল সংগ্রহ শুরু করতে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) চিঠি দিয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।

বোরোর বাম্পার ফলন পেয়েও কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। কৃষকের তালিকা না পাওয়ায় ধান সংগ্রহ করতে পারছেন না খাদ্য কর্মকর্তারা- এমন অভিযোগের বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নাসিরুজ্জামান বুধবার যুগান্তরকে বলেন, তালিকা না পাওয়া সমস্যা নয়।

কৃষকের ধানের ন্যায্যদাম খাদ্য মন্ত্রণালয়কেই নিশ্চিত করতে হবে। ধান-চাল তারাই কেনে। তারপরও যেখানে পণ্যের সরবরাহ বেশি সেখানে দাম কমবে এটাই স্বাভাবিক। এবার টার্গেটের চেয়ে বেশি উৎপাদন হয়েছে। আমন মৌসুমে টার্গেট ছিল ১ কোটি ৪০ লাখ টন অথচ উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৫৩ লাখ টন।

আউশ ধানের টার্গেট ছিল ২৯ লাখ টন, উৎপাদন হয়েছে ৩৫ লাখ টন। বোরো টার্গেট ধরা হয়েছে ১ কোটি ৯৬ লাখ টন, এবার উৎপাদন টার্গেট ছাড়িয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আরিফুর রহমান অপু বুধবার যুগান্তরকে বলেন, ‘২৫ এপ্রিল থেকে বোরো ধান-চাল সংগ্রহের কথা থাকলেও ৯ মে চালকল মালিকদের সঙ্গে সরকারের চুক্তি হয়েছে। এরপর সব জায়গায় চাল সংগ্রহ শুরু হলেও ধান কেনা শুরু হয়নি। কিছু কিছু জায়গায় এখনও প্রকৃত কৃষকের তালিকা পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে সংগ্রহ কার্যক্রম দ্রুত করতে মাঠপর্যায়ের খাদ্য কর্মকর্তাদের তাগিদ দেয়া হয়েছে। বুধবার খাদ্য সচিব জেলা খাদ্য সংগ্রহ ও মনিটরিং কমিটির প্রধান জেলা প্রশাসকদের এ বিষয়ে তাগিদ দিয়ে চিঠি দিয়েছেন। আশা করি শিগগিরই এর একটি সুরাহা হবে। দালাল ও ফড়িয়ারা আগেও সুযোগ নিয়েছে এবারও চেষ্টা করবে। কিন্তু আমরা এসব বিষয় কঠোরভাবে মনিটর করব।’

এদিকে রাজশাহী, জয়পুরহাট, দিনাজপুর ও নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ধানের কম মূল্যের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন হয়েছে। কৃষক ও সাধারণ মানুষের পাশাপাশি এতে অংশ নিয়েছেন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। কোথাও শ্রমিক না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়া কৃষকের ধানও কেটে দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১২ লাখ ৫০ হাজার টন ধান-চাল কেনার কথা। এর মধ্যে ১ লাখ ৫০ হাজার টন বোরো ধান (চালের আকারে ১ লাখ টন), ১০ লাখ টন সিদ্ধ চাল এবং ১ লাখ ৫০ হাজার টন আতপ চাল থাকবে। এদিকে কৃষকের কাছ থেকে নামমাত্র ধান ক্রয়ের কথা বলে বিপুল পরিমাণ চাল মিল মালিকদের কাছ থেকে কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

এ নিয়েও বিভিন্ন জেলায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কৃষকরা। সরকার এবার প্রতি কেজি ধানের মূল্য ২৬ টাকা নির্ধারণ করেছে। এ হিসাবে প্রতি মণ ধানের দাম ১ হাজার ৪০ টাকা। কিন্তু কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান ক্রয় না করায় ন্যায্যমূল্য থেকে কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

দিনাজপুর : সোমবার সদর উপজেলার গোপালগঞ্জে ধানের হাটে গিয়ে দেখা যায়, বোরো ধান বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকায়। কৃষকরা জানান, এ দামে ধান বিক্রি করে লাভ তো দূরের কথা উৎপাদন খরচও উঠবে না তাদের। বাধ্য হয়েই লোকসান দিয়ে ধান বিক্রি করছেন। গোপালগঞ্জ হাটে ধান বিক্রি করতে আসা সদর উপজেলার নশিপুর গ্রামের কৃষক হাফিজ উদ্দীন জানান, প্রতি বিঘা জমিতে ধান উৎপাদন করতে খরচ হয়েছে সব মিলিয়ে ১৮ থেকে ১৯ হাজার টাকা। আর এক বিঘা জমিতে ধান উৎপাদন হয়েছে ৩৪ মণ। এক বিঘা জমির ধান বাজারে বিক্রি করে তিনি পেয়েছেন ১৭ হাজার টাকা। এতে তার লোকসান গুনতে হচ্ছে ২ হাজার টাকা।

দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর) : কামলা সংকটের কারণে সময়মতো ধান কাটাতে পারছেন না কৃষক। তারা বলছেন, ২ মণ ধানের দামেও পাচ্ছেন না একজন কামলা। কৃষি অফিস ও বোরো চাষীদের হিসাবমতে, বর্তমান বাজারে কৃষক ধান বিক্রি করছে ৪৫০ থেকে ৫শ’ টাকা মণ দরে। প্রতি বিঘায় উৎপাদিত ধান ৩ হাজার ২৫০ টাকা লোকসান দিয়ে বিক্রি করছেন কৃষক। বুধবার দুপুরে পৌর শহরের হাটে চর কালিকাপুরের বোরো চাষী শফিকুল ও রাজু বলেন, ‘ইবে গুনাগারি দিয়ে ধান আবাদ করবের নুই, দু’বেলা খাওন দিয়ে কামলাক দেয়া লাগে ৭শ’ টিহা’।

টাঙ্গাইল ও কালিহাতী : কালিহাতী উপজেলার পাইকড়া ইউনিয়নের আবদুল মালেক সিকদারের আগুন দেয়া ক্ষেতের ধান কেটে দিয়েছে বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। বুধবার দুপুরে জেলার সরকারি সা’দত কলেজ, মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজ, লায়ন নজরুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজসহ বেশ কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থীরা আবদুল মালেকের ক্ষেতের ধান কেটে দেন। শ্রমিকের মূল্য বৃদ্ধি ও ধানের দাম কম হওয়ায় আবদুল মালেক নিজের ক্ষেতের পাকা ধানে আগুন দিয়ে প্রতিবাদ জানান। লায়ন নজরুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজের শিক্ষার্থী মো. রাফি বলেন, সংবাদ মাধ্যমে জানতে পারি শ্রমিকের মূল্য বেশি হওয়ায় ধান ক্ষেতে আগুন ধরিয়ে প্রতিবাদ করেছেন আবদুল মালেক। মানবিক বিবেচনায় আমরা মালেক কাকার ক্ষেতের ধান কেটে দিয়েছি। মাওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের শিক্ষার্থী মো. আল আমিন বলেন, ধানের দামের তুলনায় ধান কাটা শ্রমিকের মূল্য অনেক বেশি। প্রায় দেড় মণ ধানের দাম দিয়ে একজন ধান কাটা শ্রমিকের মজুরি হয়। সেদিক বিবেচনা করে আমরা ধান কেটে দিয়েছি।

রাজশাহী : কৃষি বাঁচাও, কৃষক বাঁচাও, ফসলের ন্যায্য দাম দাও, লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে কয়েক হাজার কৃষক, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ বুধবার সকালে সমবেত হয়েছিলেন রাজশাহীর সাহেব বাজার জিরো পয়েন্টে। সড়কে ধান ছিটিয়ে তারা প্রতিবাদ করেন। কৃষকরা বলছেন, এ বছরে প্রতি মণ বোরো ধানে তাদের ক্ষতি হচ্ছে ২০০ টাকা করে। প্রতি বিঘায় ক্ষতি হচ্ছে ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। কারণ উত্তরাঞ্চলের হাট-বাজারে ক্রেতাও কম আবার ধানের দামও কম।

কুষ্টিয়া : প্রকার ভেদে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৬শ’ টাকা থেকে ৭শ’ টাকা। তাতে বিঘা প্রতি লোকসান গুনতে হচ্ছে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। তবে কৃষক ন্যায্যমূল্য না পেলেও কৃষকের উৎপাদিত ধানে লাভবান হচ্ছেন চালকল মালিক কিংবা মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা। চলতি বোরো মৌসুমে আবারও মিলারদের কাছ থেকেই আপদকালীন বিপুল পরিমাণ চাল কেনার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এতে প্রতি কেজি চালে ৪-৫ টাকা মুনাফা লুটছে চালকল মালিকরা।

বড়াইগ্রাম (নাটোর) : কোনে কোনো জমিতে শ্রমিক থাকলেও দু-তিনজনের বেশি শ্রমিক নেই। শ্রমিক না থাকায় জমি থেকে মাথায় বা বাইসাইকেলে ধান বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন অনেক কৃষক।

মৌলভীবাজার : বিভিন্ন উপজেলা থেকে পাইকাররা প্রতি মণ ধান ৫শ’ থেকে ৫৫০ টাকা ধরে কৃষকদের কাছ থেকে কিনছেন। এদিকে থাকা-খাওয়াসহ একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি দিতে হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। কৃষকরা বলছেন, জমি প্রস্তুত, বীজ, চারা রোপণ, সার, পানি, পরিচর্যা ও অন্যান্য খাতে প্রতি মণে খরচ হয়েছে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। বর্তমান বাজার মূল্যে প্রতি মণে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া : চলতি ইরি-বোরো মৌসুমের হাজার হাজার মণ নতুন ধান ইতিমধ্যেই আশুগঞ্জ মোকামে আসতে শুরু করেছে। তবে শিলাবৃষ্টি ও সেচের অভাবে এবার জমিতে ফলন কম হয়েছে। পাশাপাশি ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় আশুগঞ্জ মোকামে ধান আসছে অনেক কম। জমিতে চাষাবাদ করে যে টাকা খরচ হয়েছে সে টাকার ধানও জমিতে হয়নি।

নেত্রকোনা : একাধিক কৃষক জানান, এক কাঠা জমিতে ৪ থেকে ৫ মণ ধান আবাদ হয়েছে। তাদের প্রতি মণ ধান বিক্রি করতে হচ্ছে ৪৫০ থেকে ৪৮০ টাকা। অথচ এক কাঠা জমিতে ধানের আবাদ, কাটা ও মাড়াই পর্যন্ত তাদের খরচ ১৮শ’ টাকা থেকে ১৯শ’ টাকা।

আগৈলঝাড়া : বরিশালের আগৈলঝাড়ায় দেড় মণ ধান বিক্রি করে একজন শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করতে হচ্ছে। উৎপাদন খরচের অর্ধেক টাকায় এক মণ ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।

বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ-মানববন্ধন : বুধবার দুপুরে জয়পুরহাট জেলা শহরে বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন এবং সড়কের ওপর কিছু ধান ও ধানের আঁটি ছড়িয়ে তাতে প্রতীকী আগুন দিয়ে অবিলম্বে ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন জেলা কৃষক ও ক্ষেতমজুর সংগ্রাম পরিষদসহ বিক্ষুব্ধ সাধারণ কৃষকরা। দিনাজপুরে সব কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন জেলার বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×