বেচাকেনা হবে খেলাপি ঋণ

শক্তিশালী সেকেন্ডারি মার্কেট গড়ে তুলতে আইন প্রণয়নে প্রাথমিক কাজ শুরু * বাস্তবায়ন হলে খেলাপি ঋণ কমে আসবে

  দেলোয়ার হুসেন ১৮ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খেলাপি ঋণ
খেলাপি ঋণ। প্রতীকী ছবি

ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ বেচাকেনা করার আইনি কাঠামো প্রস্তুত করতে প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ঋণ কেনাবেচা করে ব্যাংক ও ক্রেতা উভয়পক্ষ লাভবান হয়েছে। সেখানে এ পদ্ধতি প্রয়োগ করায় খেলাপি ঋণ অনেক কমে গেছে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকাররা বাংলাদেশ ব্যাংককে বিষয়টি বিবেচনা করার প্রস্তাব দেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শক্ত আইনি কাঠামো দিয়ে এ পথে এগুলো ভালো ফল দেবে। তারা জানান, এ প্রক্রিয়ায় উন্মুক্ত দরপত্রে অংশ নিয়ে লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান খেলাপি ঋণ কিনবে। এরপর ওই ঋণের জামানত বাবদ গচ্ছিত সম্পদ নিজের জিম্মীয় জব্দ করে ভোগদখল কিংবা বিক্রি করে দেয়ার আইনি ক্ষমতা লাভ করবে ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। এর আগে দেশে কিছু ঋণ এভাবে কেনাবেচা হয়েছে। কিন্তু শক্ত আইনি কাঠামো না থাকায় তা সেভাবে সফল হতে পারেনি।

এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ড. খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ‘আমি পূবালী ব্যাংকের এমডি থাকার সময় খেলাপি ঋণ আদায়ে এজেন্ট নিয়োগ করেছিলাম। তাদের অতি পুরনো কিছু খেলাপি ঋণ ছিল, যেগুলো আদায় হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই, সেগুলো আদায়ের দায়িত্ব দিয়েছিলাম। তারা বেশকিছু ঋণ আদায়ও করেছিল। পরে এটি আর বেশিদূর এগোতে পারেনি। কেননা তাদের কার্যক্রমের ব্যাপারে কোনো আইনি কাঠামো ছিল না।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এ ধরনের মার্কেট গড়ে তোলা হলে ঋণখেলাপিরা ভয় পাবেন। ঋণ আদায় বাড়বে। নতুন করে ঋণখেলাপি হওয়ার প্রবণতাও কমে যাবে। সার্বিকভাবে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ সংস্কৃতির দুর্নাম ঘুচতে শুরু করবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, এ বিষয়ে ভারতসহ কয়েকটি দেশের আইন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একটি কাঠামোও তৈরি করা হয়েছে। এটি আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

সূত্র জানায়, খেলাপি ঋণ বেচাকেনার জন্য ইউরোপ-আমেরিকাসহ প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এমন সেকেন্ডারি মার্কেট গড়ে উঠেছে। সেগুলোতে খেলাপি ঋণ নিয়মিত বেচাকেনা হচ্ছে। এজেন্টরা খেলাপি ঋণ কিনে নিয়ে আদায়ও করছে। এভাবে খেলাপি ঋণ কেনাবেচা একটি লাভজনক ব্যবসা হিসেবে গড়ে উঠেছে। এগুলোতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগও হচ্ছে। একে কেন্দ্র করে কর্মসংস্থানের একটি বাজারও গড়ে উঠেছে।

অনেকে ঋণখেলাপি কোম্পানি সস্তায় কিনে নিয়ে সেগুলো পরিচালনা করে লাভজনকভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে। এতে ওইসব দেশে খেলাপি ঋণের হার যেমন কম, তেমনি ব্যাংকের ঋণ উৎপাদনমুখী কাজে থাকায় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

আইনের কঠোর প্রয়োগের ফলে ওইসব দেশে প্রভাবশালী ঋণখেলাপির সংখ্যা নেই বললেই চলে। যেটি বাংলাদেশে আছে। এ কারণে খেলাপি ঋণ বেচাকেনার কার্যক্রম চালাতে আগে আইনি কাঠামো করতে হবে। তাদের যথেষ্ট ক্ষমতা দিতে হবে। তাহলে সুফল পাওয়া যাবে।

সূত্র জানায়, এই মার্কেট চালু হলে ব্যাংকগুলো তাদের খেলাপি ঋণ বিক্রি করতে পারবে। এই মার্কেটটি হবে অনেকটা শেয়ারবাজারের লেনদেনের মতো। মার্কেট পরিচালনার জন্য একটি কোম্পানি থাকবে। ব্যাংকগুলো যেসব খেলাপি ঋণ বিক্রি করতে চায় সেগুলো এই কোম্পানির বিস্তারিতভাবে তুলে ধরবে। এতে খেলাপির নাম, ঠিকানা, মূল ঋণের পরিমাণ, সুদসহ ঋণের পরিমাণ, খেলাপির জামানতের বিস্তারিত তথ্য, কত টাকায় ঋণটি বিক্রি করবে এসব তথ্যের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরবে।

কোম্পানির একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে এসব তথ্য তুলে ধরবে ক্রেতাদের কাছে। এগুলো কেনার জন্য খেলাপি ঋণ আদায়কারী বিভিন্ন এজেন্টের লাইসেন্স দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারা প্রতিযোগিতামূলক দরে এসব খেলাপি ঋণ কেনে নেয়। কেনার আগে এজেন্টগুলো ঋণখেলাপির সম্পদ, জামানত এসব বিষয়ে বিস্তারিত খোঁজখবর নিতে পারবে।

সে বিষয়ে তাদের আইনি সুযোগ দেয়া হবে। পরে তারা এগুলো আদায়ের উদ্যোগ নেবে। এর মধ্যে ক্রেতা ঋণখেলাপির বন্ধকি সম্পত্তি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে আইনি সুবিধা পাবে। ক্রেতা এ সম্পত্তির উন্নয়ন করে নিজে ভোগ করতে পারবে বা বিক্রি করতে পারবে। ঋণখেলাপি এগিয়ে এসে ক্রেতার সঙ্গে সমঝোতাও করতে পারে। তখন সবকিছু নির্ভর করবে ক্রেতার ওপর।

খেলাপি ঋণ বেচাকেনা করতে ভারতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে অ্যাসেট রিকনস্ট্রাকশন কোম্পানি (এআরসি) রয়েছে। তারা ঋণখেলাপিদের সম্পত্তি কিনে নিয়ে ব্যবসা করছে। এই প্রক্রিয়ায় কোনো কোম্পানি অনিয়ম করলে তাদের লাইসেন্স বাতিল করে দিতে পারে। বাংলাদেশেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আওতায় এ ধরনের কোম্পানি গঠন করার সুপারিশ করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশেও সীমিত আকারে এ ধরনের হাতেগোনা কয়েকটি কোম্পানি গড়ে উঠেছে। তারা পূবালী ও ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে কিছু খেলাপি ঋণ কিনে নিয়ে আদায়ও করেছে। কিন্তু এদের আইনি কোনো ভিত্তি না থাকায় তারা এ ব্যবসাকে বেশিদূর এগিয়ে নিতে পারছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোও তাদের আদালতের নির্দেশ ছাড়া পারছে না আলাদাভাবে কোনো সহায়তা করতে। এছাড়া তাদের চেয়ে ঋণখেলাপিরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তারা এসব খেলাপি সম্পত্তির ওপর হাত দিতে পারছে না। ফলে ব্যাংকগুলো থেকেও তাদের কাছে খেলাপি ঋণ বিক্রির ব্যবস্থা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

ব্যাংকাররা মনে করেন, খেলাপি ঋণ কেনাবেচা বাংলাদেশে একটি লাভজনক ব্যবসা হতে পারে। কেননা এদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি। আবার ঋণখেলাপিরা অনেক সম্পদশালী। ঋণখেলাপির একটি কোম্পানি বন্ধ থাকলেও আরও অনেক কোম্পানি সচল রয়েছে। তবে অস্তিত্বহীন কিছু খেলাপি ঋণ রয়েছে যেগুলো কিনে এজেন্টগুলো লাভবান হতে পারবে না। এসব ঋণের সঙ্গে জড়িত ব্যাংকারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণাধীন অ্যাসেট রিকনস্ট্রাকশন কোম্পানি গঠন করে খেলাপি ঋণের শক্তিশালী মার্কেট গড়ে তোলা সম্ভব। এজন্য বিদ্যমান অর্থঋণ আদালত আইন সংশোধন করতে হবে। সে কারণে অতিদ্রুত দেশের খেলাপি ঋণের সামগ্রিক অবস্থা ও ব্যাপকতা বিবেচনায় নিয়ে ভারতের মতো আইনি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে সিকিউরিটাইজেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন অব ফিন্যান্সিয়াল অ্যাসেট অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট অব সিকিউরিটি ইন্টারেস্ট নামে একটি আইন রয়েছে। এই আইনে খেলাপি ঋণ বেচাকেনা ও আদায় প্রক্রিয়া চলে। এর আদলে বাংলাদেশেও একটি নতুন আইন করতে হবে। খুবই জরুরি ভিত্তিতে এ উদ্যোগ নিলে খেলাপি ঋণের ঊর্ধ্বগতি ঠেকানো সম্ভব হবে।

ভারতের এই আইনটির মাধ্যমে সে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়াকে (আরবিআই) অ্যাসেট রিকনস্ট্রাকশন কোম্পানি গঠনের লাইসেন্স প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করা হয়। ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে এআরসি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। যেমন- এআরসি কোম্পানিগুলো ব্যাংকের কাছ থেকে বিশেষ ছাড়ের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কিনতে পারে। ফলে ব্যাংকগুলো অনাদায়ী ঋণের একটা অংশ সমন্বয় করতে পারে।

রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া এআরসি কোম্পানিগুলোর সব কাজকর্ম অর্থাৎ নীতিনির্ধারণ, অডিট, পরিদর্শন, কোম্পানির চেয়ারম্যান, ডাইরেক্টর নিয়োগ অনুমোদন ও অপসারণ করতে পারে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যাংকগুলোকে পাওনা পরিশোধ না করলে সংশ্লিষ্ট এআরসিকে জরিমানাসহ সব ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। আইন অনুযায়ী এআরসি কোম্পানির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর ন্যস্ত।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×