আসছে সংস্কারমুখী বাজেট

আজ প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন

ব্যাংক ও ভ্যাটে হবে সংস্কার * পুঁজিবাজারে থাকবে প্রণোদনা * কমানো হবে কর্পোরেট কর * নতুন ভ্যাট ও করের চাপ বাড়বে না * এমপিওভুক্তির ঘোষণাও মিলবে

  মিজান চৌধুরী ২০ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আসন্ন ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট হবে সংস্কারমুখী। ব্যাংক ও ভ্যাট খাতে থাকছে ব্যাপক সংস্কার। অর্থবছরের শুরুতেই নতুন ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন (২০১২)’ কার্যকরের ঘোষণা থাকছে। সংস্কারের আওতায় থাকবে ব্যাংকসহ পুঁজিবাজার, সঞ্চয়পত্র ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসুচি খাতও। তবে জনগণকে রাখা হবে ভ্যাট ও করের চাপ মুক্ত। খুব বেশি কর চাপানো হবে না। কর্পোরেটসহ ক্ষেত্র বিশেষে কর হার কমানো হবে। ঘোষণা থাকবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির।

১৩ জুন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল প্রথমবারের মতো বাজেট উপস্থাপন করবেন। ইতিমধ্যে বাজেটের সব ধরনের কার্যক্রম শেষ। চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে খসড়া বাজেট তুলে ধরবেন অর্থমন্ত্রী। এরপর প্রধানমন্ত্রীর সর্বশেষ দিকনির্দেশনা নিয়েই এটি চূড়ান্ত করা হবে। আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর চলতি মেয়াদের প্রথম বাজেটে প্রাথমিকভাবে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। যা জিডিপির ১৮ দশমিক ১ শতাংশ। চলতি বাজেটের আকার ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। আসন্ন বাজেটে ব্যয়ের পরিমাণ বাড়ছে ৫৮ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা।

এবারের বাজেটে বড় আকারের ব্যয় মেটাতে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এটি জিডিপির ১৩ দশমিক ১ শতাংশের সমান। চলতি বছর রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য হচ্ছে ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। আগামী বাজেটে রাজস্ব আয়ের পরিমাণ ৩৮ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বেশি ধরা হয়েছে।

এছাড়া প্রতি বছরের মতো এবারও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশের মধ্যেই বাজেটের ঘাটতি রাখা হয়েছে। নতুন বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। চলতি বাজেটের ঘাটতি হচ্ছে ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৩ কোটি টাকা।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, আসন্ন বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এসব প্রকল্প দ্রুত শেষ করতে বাজেটে বরাদ্দ বেশি রাখা হবে। তিনি আরও বলেন, ব্যাংক ও ভ্যাট খাতে সংস্কার করা হবে। করের হার নতুন করে বাড়ানো হবে না। তবে পহেলা জুলাই থেকে নতুন ভ্যাট আইন কার্যকরে ঘোষণা থাকবে।

জানা গেছে, নতুন বাজেটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী পালনের প্রতিফলন থাকবে। এছাড়া বেশি মনোযোগ থাকবে নির্বাচনী ইশতেহার অনুসারে ‘আমার গ্রাম আমার শহর’ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে। দেশের প্রতিটা গ্রামকে শহরে রূপান্তর করার ঘোষণা থাকছে। পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা হবে গ্রামকে। যেখানে ইন্টারন্টে, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সব ধরনের নাগরিক সুবিধা পৌঁছে দেয়া হবে। এ সংক্রান্ত ঘোষণা থাকবে বাজেটে। তবে আমার গ্রাম আমার শহর এ কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য দায়িত্ব থাকবে স্থানী সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের। তবে প্রত্যেক মন্ত্রণালয়কে এ কাজে সম্পৃক্ত করা হবে।

আসন্ন বাজেটে ৮ দশমিক ২০ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য ধরা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ অর্জন হবে এমন প্রত্যাশা থেকেই আগামী অর্থবছরের এ লক্ষ্য স্থির করা হয়। সার্বিকভাবে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার পাশাপাশি রফতানি ও রাজস্ব আয়ের গতিশীলতার কারণে এ প্রবৃদ্ধি অর্জন সহায়ক হবে। এছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা হলে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। যা প্রবৃদ্ধি অর্জনের নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে।

২০১৯-২০ অর্থবছরে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের দাম কম থাকবে। অন্যান্য পণ্যের দাম কিছুটা নিুমুখী থাকবে। ফলে দেশের ভেতর জিনিসপত্রের দাম বাড়বে না এমন আশা থেকেই নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

নতুন বাজেটে ভ্যাট খাতে বড় সংস্কার হবে। এটা করতে পহেলা জুলাই থেকে বহুল আলোচিত ভ্যাট আইন কার্যকর করা হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে এটি কার্যকর হলে আগামী বছরে রাজস্ব আয়ে গতি আসবে। তবে নতুন আইনে কোনো পণ্যের ওপর ভ্যাট ও কর হার বাড়বে না। বরং কমতে পারে। আইনটি বাস্তবায়নে কাউকে হয়রানি ও কষ্ট দেয়া হবে না এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী নিজেই। তিনি বলেছেন, এ মুহূর্তে ভ্যাট আইন পুরোপুরি বাস্তবায়নে আমরা প্রস্তুত নই। তবে এটি বাস্তবায়ন করতে অনেক সময় লাগবে। এটি চলমান থাকবে। একদিনে শেষ করা যাবে না। আইনটি কার্যকর করতে একটি কমিটি গঠন করা হচ্ছে। অবশ্য ব্যবসায়ীরাও শেষ পর্যন্ত এটি মেনে নিয়েছেন।

এবার ব্যাংক খাতেও বেশ কিছু সংস্কারের ঘোষণা থাকবে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণ আদায়ে গঠন করা হবে এসেস ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি। সংশোধন করা হবে বেশ কিছু আইন। সুদের হার কমানো হবে। এসব ঘোষণা থাকবে বাজেটে।

আসন্ন বাজেটে ব্যক্তি আয়কর সীমা কমানো হবে না। তবে কর্পোরেট কর হার কিছুটা কমানো হবে। নতুন করে কোনো পণ্য বা সেবার ওপর কর চাপানো হবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমপিওভুক্তির ঘোষণা থাকবে। এটি একসঙ্গে ঘোষণা না দিয়ে পর্যায়ক্রমে এমপিওভুক্তি করা হবে। এজন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে।

বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ২ লাখ ৭ হাজার ২১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় মুদ্রার পরিমাণ ১ লাখ ৩০ হাজার ৯২১ কোটি টাকা। আর প্রকল্প সাহায্য হচ্ছে ৭১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত ১০টি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় প্রথম স্থানে রয়েছে। যার বরাদ্দের পরিমাণ প্রায় ২৯ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকা। এরপরই বিদ্যুৎ বিভাগে ২৬ হাজার ১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। তৃতীয় পর্যায়ে আছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। বরাদ্দের পরিমাণ ২৫ হাজার ১৬৩ কোটি ৩৬ লাখ টাকা।

সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত খাতের মধ্যে রয়েছে- যোগাযোগ। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন। তাই পদ্মা সেতুসহ পদ্মা রেল সংযোগের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা হয়েছে। সে অনুযায়ী এ খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ৫২ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ মূল এডিপির ২৬ দশমিক ৫ শতাংশ এ খাতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে। অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিদ্যুৎকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ২৬ হাজার ১৭ কোটি ১৩ লাখ টাকা। ভৌত পরিকল্পনা, পানি সরবরাহ ও গৃহায়নের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ ২৪ হাজার ৩২৪ কোটি ২৩ লাখ টাকা। শিক্ষার প্রসার আর গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২১ হাজার ৩৭৯ কোটি ১২ লাখ টাকা। গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনতে ও বেশি করে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য এ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ১৫ হাজার ১৫৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা। নদীভাঙন রোধসহ নদী ব্যবস্থাপনায় বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫ হাজার ৬৫২ কোটি ৯০ লাখ টাকা। স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নের জন্য এ খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ১৩ হাজার ৫৫ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য বরাদ্দের পরিমাণ ৫ হাজার ২৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। কৃষি খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ৭ হাজার ৬১৫ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।

এদিকে উন্নয়নের পাশাপাশি ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে বেশ কিছু খাতকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে দক্ষতা উন্নয়ন। সার্বিক মানবসম্পদ উন্নয়নে নানা ধরনের পরিকল্পনাও নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন, কর্মসৃজনও অগ্রাধিকার খাতে থাকছে। অগ্রাধিকার তালিকায় আরও রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় সক্ষমতা অর্জন, সরকারি সেবাদানে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো ও ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন। এছাড়া বহির্বিশ্বের অর্থনৈতিক সুযোগ অধিক ব্যবহার, প্রবাসী আয় বৃদ্ধি ও নতুন রফতানির বাজার অনুসন্ধানের বিষয়ও এর অন্তর্ভুক্ত।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×