রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কেনাকাটায় দুর্নীতি

মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় দুদক

পূর্ত মন্ত্রণালয় গঠিত কমিটি দরপত্র থেকে শুরু করে কেনাকাটার সব বিষয় খতিয়ে দেখছে * দুর্নীতি খতিয়ে দেখবে আইএমইডি -পরিকল্পনামন্ত্রী

  যুগান্তর রিপোর্ট ২২ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় দুদক

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কেনাকাটায় দুর্নীতির বিষয়টিতে নজর রাখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ।

দুদক কার্যালয়ের সামনে মঙ্গলবার বিকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, উই আর ওয়েটিং ফর দ্য রিপোর্ট। যেহেতু মিনিস্ট্রি কাজ করছে, আমরা তাদের রিপোর্ট চাইব, রিপোর্ট দেখব। তারপর যদি দেখি ইনগ্রেডিয়েন্ট আছে সেখানে, ডেফিনিটলি আমরা সেখানে আইনি পদক্ষেপ নেব।

এর আগে দুদকের একাধিক সূত্র যুগান্তরকে জানিয়েছিল, বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নামছে তারা। তবে দুদক চেয়ারম্যানের বক্তব্যে পাওয়া গেল কিছুটা ভিন্ন সুর। অপেক্ষা করতে চান তারা।

ইকবাল মাহমুদ বলেন, গণমাধ্যমের প্রতিবেদন দুদকের নজরে এসেছে। দুদক তার নিজস্ব পদ্ধতিতে এগোবে। তিনি বলেন, কথা হল দুর্নীতি হয়েছে বা হয়নি। গণমাধ্যমের যে তথ্য সেখানে আমি দেখেছি বালিশ, কেটলি এসব বিষয়। দেখেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের কিছু প্রসিডিউর আছে। একটা রিপোর্ট পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা তো জাম্প দিতে পারি না। সেটা দেখতে হয়, বুঝতে হয়, চারদিক দেখতে হয়।

মন্ত্রণালয়ের দুটি কমিটি এ বিষয়ে কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, সব দেখে আমি একটা অর্ডার করেছি। সেটি হল- সেই তদন্ত রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা। সবাই যদি একই জিনিস নিয়ে কাজ করতে থাকি তাহলে জিনিসটা ভালো দেখায় না। তারা কী রিপোর্ট দেয়, সেই রিপোর্ট দেখে তখন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করব। দুদক চেয়ারম্যান আরও বলেন, মন্ত্রণালয়ের কনক্লুশন কী হয়, কারণ, এটা সত্য নাও হতে পারে। সব রিপোর্ট যে সত্য, তাও তো না।

অতীতে অন্যান্য বিভাগ বা সংস্থার পাশাপাশি দুদককেও অনুসন্ধানে নামতে দেখা গেছে। এই দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে ভিন্ন কৌশল কেন জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, আমাদের কতগুলো প্রজেক্ট আছে যেগুলো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে হঠাৎ করে আপনি জাম্প করবেন, সেখানে চিন্তা-ভাবনা করতে হয়।

এটা জাতীয় বিষয়, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্প বহুদিন ধরে চলছে। কিন্তু এটার বাস্তবায়নের কাজ মাত্র শুরু হয়েছে। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত গর্বের ও গুরুত্বপূর্ণ। সো জাস্ট ওয়েট। টেলিভিশনে দেখলাম একজন মন্ত্রী বলছেন, বেতন-ভাতা এগুলো সঠিক নয়। বালিশের ক্ষেত্রে এ রকম একটা পরিস্থিতি তো হতেও পারে।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের আবাসন পল্লীতে আসবাবপত্র কেনাসহ অন্য আনুষঙ্গিক কাজে দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। এ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এ

রই পরিপ্রেক্ষিতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে একজন অতিরিক্ত সচিব এবং গণপূর্ত অধিদফতর থেকে একজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর নেতৃত্বে আলাদা দুটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সব ধরনের বিল পরিশোধ না করতে ইতিমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়।

এদিকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটি ওই প্রকল্পের অনিয়ম খতিয়ে দেখতে দরপত্র, কার্যাদেশ, কেনাকাটা এবং বিল পরিশোধ সংক্রান্ত সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখছে বলে জানিয়েছেন গণপূর্ত অধিদফতরের সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও গ্রিন সিটি সম্পর্কিত দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখবে বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)।

সরকারের একমাত্র প্রকল্প তদারকি সংস্থা হিসেবে প্রকল্পটি পরিদর্শন করা হবে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠক শেষে মঙ্গলবার ব্রিফিংয়ে প্রকল্প পরিদর্শনের বিষয়টি জানান পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান।

টিআইবি নিয়ে দুদকের সঙ্গে সিপিডি-সিএমআইয়ের বৈঠক : এদিন দুপুরে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন ও নরওয়ের প্রতিষ্ঠান সিএমআইয়ের জ্যেষ্ঠ গবেষক ইনজি অ্যামুন্ডসন দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। দেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বেসরকারি খাতের দুর্নীতি নিয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল অব বাংলাদেশের (টিআইবি) ভূমিকা নিয়ে এ মতবিনিময় হয়।

বৈঠকে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, সার্বিকভাবে টিআইবি ভালো কাজ করছে। তারা তাদের গবেষণার মাধ্যমে দুর্নীতির উৎস শনাক্তকরণসহ তা নিরসনে কিছু কাজ করছে। তিনি বলেন, টিআইবির সঙ্গে দুদকের সম্পর্ক রয়েছে। তাদের সঙ্গে কমিশনের সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে এবং এর ভিত্তিতে বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান।

ইকবাল মাহমুদ বলেন, টিআইবি শিক্ষা বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় যেসব মেগা কর্মসূচি রয়েছে সেগুলোর প্রান্তিক পর্যায়ের কার্যক্রমের ওপর গবেষণা করতে পারে। এতে শিক্ষার ক্ষেত্রে বিদ্যমান দুর্নীতি-অনিয়ম সম্পর্কে সরকারের নীতিনির্ধারকরা যেমন সচেতন হবেন, তেমনি তৃণমূল পর্যায়েও দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা বাড়বে।

স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও টিআইবি গবেষণা করতে পারে উল্লেখ করে ইকবাল মাহমুদ বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকারি পরিষেবা দেয়ার ত্রুটি-বিচ্যুতি যেমন চিহ্নিত করতে সহজ হবে, তেমনি সমাধানের গবেষণালব্ধ সুপারিশও পাওয়া যেতে পারে। সার্বিকভাবে এ ক্ষেত্রে কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে টিআইবির। টিআইবিকে নির্মোহ থেকে এসব গবেষণা করতে হবে।

বেসরকারি খাতে টিআইবির ভূমিকা কেমন হবে, তা জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশে সুশাসনের জন্য অনেক আইন রয়েছে। তবে এসব আইনের প্রয়োগের সমস্যা রয়েছে। তিনি বলেন, ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট কেন হচ্ছে না- এর মূলে রয়েছে এসব আইনের সঠিক বাস্তবায়ন না হওয়া এবং দুর্নীতি। এ ক্ষেত্রে টিআইবি ও সিপিডির মতো প্রতিষ্ঠান গবেষণার মাধ্যমে দুর্নীতি-অনিয়মের কারণ, ধরন, ব্যাপকতা শনাক্ত করে তা প্রতিরোধে সুপারিশ প্রণয়ন করতে পারে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, কমিশনের সক্ষমতায় কিছুটা ঘাটতি হয়তো রয়েছে, তা অতিক্রমের জন্য কমিশন বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে দুর্নীতি করলে তাকে আইনের আওতায় আসতেই হবে- এই বার্তা দিতে দুদক সফল হয়েছে বলে মনে করেন ইকবাল মাহমুদ।

তিনি বলেন, দুর্নীতির অভিযোগে অনেক প্রভাবশালীকে আইনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পদ-পদবি কিংবা অন্য কোনো পরিচয়ে কাজ হচ্ছে না। আজ হোক কাল হোক দুর্নীতিবাজদের জবাবদিহি করতেই হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×