যুগান্তরকে ড. জাহিদ হোসেন

বাজেট হতে হবে সংস্কারভিত্তিক

  হামিদ-উজ-জামান ২২ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের লিড ইকনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন
ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের লিড ইকনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন

আওয়ামী লীগ টানা তৃতীয় বার সরকার গঠনের পর বর্তমান মেয়াদের প্রথম বাজেট আসছে ২০১৯-২০ অর্থবছরে। সেই সঙ্গে নতুন অর্থমন্ত্রীর দেয়া প্রথম বাজেটও এটি। তাই নানা কারণে এ বাজেটটি অন্য বারের মতো গতানুগতিক হলে হবে না বলে মন্তব্য করছেন ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের লিড ইকনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন।

তিনি বলেছেন, আগামী বাজেট হতে হবে সংস্কারভিত্তিক বাজেট। অর্থাৎ টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে রাজস্ব আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনা এবং বাজেটের অর্থায়নের ক্ষেত্রে সংস্কারের চলমান ও আগামীর উদ্যোগের বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকতে হবে বাজেট বক্তৃতায়। সম্প্রতি ঢাকার বিশ্বব্যাংক কার্যালয়ে যুগান্তরকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ড. জাহিদ হোসেন এসব কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন-

যুগান্তর : আগামী বাজেটে আপনার প্রত্যাশা কি?

ড. জাহিদ হোসেন : নতুন সরকার, নতুন অর্থমন্ত্রী, তাই নতুন কিছু প্রত্যাশা তো থাকবেই। তবে সরকারের একটা নির্বাচনী ইশতেহার রয়েছে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি), ২০৩০ সালে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালে উচ্চ আয়ের দেশ হওয়ার আকাক্সক্ষা রয়েছে। এসব লক্ষ্য অর্জনে আগামী অর্থবছরের বাজেট যেন হয় সংস্কার ভিত্তিক বাজেট।

যুগান্তর : কি পরিহার করা উচিত বলে মনে করেন।

ড. জাহিদ হোসেন : বাজেটের আকার নিয়ে কথাবার্তা পরিহার করতে হবে। কেননা কত টাকার বাজেট হল সেটি বড় কথা নয়। চলতি অর্থবছরের তুলনায় আগামী অর্থবছর ৩০-৪০ শতাংশ বাজেট বাড়ানো হয়েছে। এরকম আকার যেন বড় ব্যাপার না হয়। আকারের ওপর খুব বেশি মনোযোগ কোনো কাজে আসে না। দেখা উচিত বাজেটের পেছনের অর্থনৈতিক কর্মসূচি কি, ব্যয়ের লক্ষ্য, সার্বিক ও খাতভিত্তিক ব্যয় সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা ইত্যাদি। এগুলো নির্ভর করবে সংস্কার কার্যক্রমের ওপর।

যুগান্তর : কোন ধরনের সংস্কারে গুরুত্ব দিচ্ছেন?

ড. জাহিদ হোসেন : ইতিমধ্যেই যেসব সংস্কার চলমান রয়েছে যেমন দারিদ্র্য নিরসন, বৈষম্য হ্রাস, বিনিয়োগ ঘাটতি, ব্যক্তি বিনিয়োগ ঘাটতি ইত্যাদি বিষয়গুলো থেকে কিভাবে বেরিয়ে আসা যায়। এসব নিয়ে অলরেডি যেসব সংস্কারের উদ্যোগ রয়েছে সেগুলো হালনাগাদ তথ্য দেয়া। এছাড়া উদ্যোগগুলো কোন অবস্থায় রয়েছে, আরও এগিয়ে নিতে গেলে সামনে কি ধরনের প্রতিবন্ধকতা আছে এবং সেগুলো কিভাবে মোকাবেলা করা হবে ইত্যাদি বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট করতে হবে।

যুগান্তর : কর্মসংস্থান ও প্রবৃদ্ধি নিয়ে কিছু বলুন।

ড. জাহিদ হোসেন : প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান যদি একই তালে না এগোয় তাহলে সামষ্টিক উন্নয়নের লক্ষ্য অর্জন হবে না। কর্মসংস্থানের চাহিদা সৃষ্টির জন্য ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অর্থাৎ ব্যক্তি খাতে কলকারখানা ও ক্ষেত-খামারে কি ধরনের বিনিয়োগ হতে পারে, সেসব বিষয় বাজেটে থাকতে হবে। অন্যদিকে ডুয়িং বিজনেস সমস্যা।

অর্থাৎ ব্যবসার পরিবেশের ক্ষেত্রে অবকাঠামো এবং নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত বাধা রয়েছে অনেক। তবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) প্রচেষ্টা চালাচ্ছে ডুয়িং বিজনেস রিপোর্টে বর্তমান ১৭৬তম অবস্থান থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ১০০ এর নিচে নমিয়ে আনার। কিন্তু সেটি করতে গেলে তো ডুয়িং বিজনেসের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে উন্নতি করতে হবে।

ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে সম্পত্তি নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স ও বিদ্যুৎ সংযোগসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে এসব সেবা যাতে একজন বিনিয়োগকারী এক স্থান থেকেই পেতে পারেন সেজন্য ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস সেন্টার’ স্থাপন করতে হবে। ইতিমধ্যেই বিডা কাজও শুরু করেছে। তবে আন্তঃসংস্থার সমন্বয় থাকতে হবে। বাজেট বক্তৃতায় যদি বলা থাকে আমরা কবে ওয়ানস্টপ সার্ভিস দেখতে পাব, তাহলে একজন বিনিয়োগকারী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন কখন তিনি ঘরে বসেই সব কাজ করতে পারবেন অনলাইনে।

যুগান্তর : অবকাঠামোর ক্ষেত্রে করণীয় কি?

ড. জাহিদ হোসেন : অবকাঠামো ক্ষেত্রে অন্যতম বিষয় হল জমি। এ জমি জটিলতার সমাধান হিসেবে অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিছু অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ চলছে। কোনোটিতে বিনিয়োগ আসতে শুরু করেছে। তবে বড় মাপের অর্থনৈতিক অঞ্চল এখনও হয়নি। কিছু ক্ষেত্রে গুরুত্ব নির্ধারণ করে একটা টাইমলাইন থাকা উচিত। অর্থাৎ বড় মাপের সরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো কোথায়, অগ্রগতির কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং কবে নাগাদ শেষ হবে এরকম সুনিদিষ্ট কিছু কথাবার্তা বাজেট বক্তৃতায় থাকলে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা যেমন ফিরে আসবে, তেমনি জবাবদিহিতার জায়গাও তৈরি হবে।

যুগান্তর : আগামী বাজেটের চ্যালেঞ্জ কি?

ড. জাহিদ হোসেন : রাজস্ব আদায় অন্য যে কোনো বছরের তুলনায় এখনও অনেক কম হয়েছে। এটি বাড়ানোর জন্য বাজেটে কিছু নতুন ‘মেজারস’ থাকতে হবে। এর মধ্যে আলোচিত বিষয় হচ্ছে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন। তবে এটি বাস্তবায়নের পথে যাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, কি ধরনের সংশোধনের পর তা বাস্তবায়ন হবে। কেননা নানা ধরনের বিষয়ে পুরনো ভ্যাট আইনে ফাঁকফোকর ছিল। সেগুলো যদি এবারও থাকে তাহলে তো হবে না।

বাস্তবতার প্রেক্ষিতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কিছুটা আপস করতে হবে। কিন্তু কতটা আপস করবেন। যদি ভ্যাট আইন কার্যকরের পর ভোক্তাদের ওপর চাপ কমিয়ে ভ্যাট আদায় বাড়ানোর যে উদ্দেশ্য, সেটিই যদি ব্যাহত হয়, তাহলে এ আইন করে কি লাভ। ভ্যাট আইনকে অত্যন্ত সাধারণ করতে হবে, যাতে মানুষ সহজেই বুঝতে পারেন। তা না হলে, এরজন্য আবার আইনজীবীর কাছে যেতে হবে।

অন্যদিকে কর প্রশাসনকে আধুনিকায়নের চলমান উদ্যোগগুলোর কি অবস্থা- সে বিষয় বাজেট বক্তৃতায় থাকা উচিত। আরও চ্যালেঞ্জ হচ্ছে রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বাজেট বরাদ্দ এবং তার সঠিক ব্যবহার করা। সরকারি যেসব অবকাঠামো হচ্ছে সেগুলো অল্প সময়েই নষ্ট হচ্ছে। সংস্কার করে হয়তো অনেকদিন ব্যবহার করা যায়। কিন্তু বাজেট বরাদ্দের সমস্যার কারণে অবকাঠামোগুলো আবার নতুন করে করতে হয়। এজন্য বাজেট বরাদ্দ যেমন রাখতে হবে, তেমনি কার্যকর ব্যয়ও নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, চলতি ব্যয়ের একটি বড় খাত হচ্ছে ভর্তুকি। এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হলেও এ অর্থ সঠিকভাবে কাজে লাগছে কিনা অর্থাৎ লক্ষ্য পূরণ হচ্ছে কিনা, বাজেটে সেটির বিশ্লেষণ থাকতে হবে। ভর্তুকি রিভিউ করে তারপরই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত। তাছাড়া সুদের বোঝা বেড়ে গেছে।

যদিও ঋণ এখনও ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে, তারপরও এভাবে যদি সুদের বোঝা বাড়ে অন্যদিকে রাজস্ব আদায় না বাড়ে, তাহলে অন্যান্য ক্ষেত্রে খরচ সংকুচিত হবে। টাকা যাবে সুদ পরিশোধে। এছাড়া সঞ্চয়পত্রের ওপর অতি নির্ভরতা কমাতে হবে। সুদ নিয়ন্ত্রণে কি ধরনের পলিসি থাকবে সেটি বাজেটে থাকতে হবে। সুদ নিয়ন্ত্রণ একটি অন্যতম চ্যালেঞ্জ।

যুগান্তর : বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) নিয়ে কি বলবেন।

ড. জাহিদ হোসেন : এডিপিতে বরাদ্দ ও প্রকল্প সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু ‘টাইম অ্যান্ড কস্ট ওভাররান’ এখন বিষফোড়া হয়ে গেছে। আগামী বাজেটে ফাস্ট ট্র্যাকের যেসব মেগা প্রকল্প দৃশ্যমান সেগুলোর বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য টাইমলাইন দিতে হবে। নতুন করে হিসাব করে বলতে হবে এ সময়ের মধ্যে শেষ হবে এবং আরও এত টাকা প্রয়োজন হবে।

তাহলে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। প্রকল্প সংখ্যা ও এডিপির আকার বড় কথা নয়, জিডিপি প্রবৃদ্ধি যাতে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়, সেরকম প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় বাড়িয়ে দিয়ে কার্যকর ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×