নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে তলব

৫২ পণ্য প্রত্যাহার না হওয়ায় আদালতের অসন্তোষ

হাইকোর্টকে কি হাইকোর্ট দেখাচ্ছেন : ভদ্রতাকে দুর্বলতা ভাববেন না * প্রাণ, এসিআই’র মতো বড় কোম্পানিকে ভয় পেলে চেয়ার ছেড়ে বাড়িতে গিয়ে রান্না করুন

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৪ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

৫২ পণ্য প্রত্যাহার না হওয়ায় আদালতের অসন্তোষ

প্রাণের গুঁড়া হলুদ, কারি পাউডার, লাচ্ছা সেমাইসহ ৫২টি মানহীন পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার না করায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট।

সংস্থাটির চেয়াম্যান মোহাম্মদ মাহফুজুল হকের প্রতি আদালত অবমাননার রুল জারি হয়েছে। কেন তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার কার্যক্রম শুরু হবে না, এর ব্যাখ্যা দিতে ১৬ জুন সশরীরে হাজিরের নির্দেশ দেন।

তাদের আইনজীবীর উদ্দেশে আদালত বলেন, পণ্য জব্দ ও প্রত্যাহার করতে আদেশ দেয়া হয়েছিল। আপনারা একটি মসলার প্যাকেটও জব্দ করতে পারেননি। আমাদের ভদ্রতার একটি সীমা আছে। ভদ্রতাকে দুর্বলতা ভাববেন না। আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নেবেন না। আপনারা চিঠি দিয়েছেন, অনুরোধ করেছেন, কিন্তু পণ্য জব্দ বা প্রত্যাহারের ব্যবস্থা নেননি। আপনারা হাইকোর্টকে কি হাইকোর্ট দেখাচ্ছেন, এটা করবেন না।

বৃহস্পতিবার শুনানি শেষে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ অসন্তোষ প্রকাশ করেন। এদিন অপ্রকাশিত ৯৩টি পণ্যের মান পরীক্ষার ফল ১৬ জুন জমা দিতে বিএসটিআইকে নির্দেশ দেন। মোট ৪০৬টি পণ্যের মধ্যে ৩১৩টির মান পরীক্ষার ফল ২ মে প্রকাশ করে বিএসটিআই।

কিন্তু তারা এখনও বাকি ৯৩টি পণ্যের মান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করেনি। ওই রিপোর্টগুলোই আদালত জমা দিতে বলেছেন। বিভিন্ন পণ্যের পক্ষে আইনজীবীরা রায় সংশোধনের আবেদন করেন।

কিন্তু আদালত তাতে সাড়া দেননি। তবে ৫২ পণ্যের মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তাদের পণ্য বাজারজাত করতে চায় তবে ফের পরীক্ষা করে তার ফল ১৩ জুনের মধ্যে প্রকাশ করতে বিএসটিআইকে নির্দেশ দেন আদালত।

শুনানিতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইনজীবীর উদ্দেশে আদালত বলেন, আপনাদের ইস্কাটনের অফিসের পাশে কোনো দোকান থেকে ১৭ জন (মোট জনবল) ম্যাজিস্ট্রেট-পুলিশ মিলে একটি পণ্যও জব্দ করতে পারলেন না? আপনাদের অফিস রাখার দরকার কী? প্রাণ ও এসিআই’র মতো বড় বড় কোম্পানিকে ভয় পান? যদি সেটা হয়, তাহলে চেয়ার ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে গিয়ে রান্না করলেই হয়। নতুবা ব্যাংকে গিয়ে কেরানির চাকরি করতে পারেন। বসে বসে টাকা গুনবেন আর টাকার হিসাব রাখবেন।

বিএসটিআইয়ের মান পরীক্ষার প্রতিবেদন প্রকাশের পর ৫২টি পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার বা জব্দ চেয়ে কনসাস কনজুমার সোসাইটির (সিসিএস) পক্ষে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী শিহাব উদ্দিন খান জনস্বার্থে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করেন। ১২ মে হাইকোর্ট বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় নিুমান প্রমাণিত হওয়ায় বাজার থেকে প্রাণের গুঁড়া হলুদ, কারি পাউডার, লাচ্ছা সেমাইসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৫২ খাদ্যপণ্য দ্রুত অপসারণ করে ধ্বংসের আদেশ দেন।

একই সঙ্গে এসব খাদ্যপণ্য বিক্রি ও সরবরাহে জড়িতদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বলা হয়। পাশাপাশি এসব পণ্য মানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন বন্ধ রাখারও নির্দেশ দেন।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরকে নির্দেশগুলো বাস্তবায়ন করে ১০ দিনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। ওইদিন আদালত বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রত্যাশা- মাদকের বিরুদ্ধে যেমন যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, তেমনি খাদ্যে ভেজালের বিরুদ্ধে যেন যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এজন্য প্রয়োজনে জরুরি অবস্থা ঘোষণার অনুরোধ জানান হাইকোর্ট। আদালতের বেঁধে দেয়া ১০ দিন শেষ হয় বৃহস্পতিবার।

বৃহস্পতিবার ধার্য তারিখে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের পক্ষ থেকে আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন বিষয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পক্ষে আইনজীবী ফরিদুল ইসলাম ও ভোক্তা অধিকারের পক্ষে আইনজীবী কামরুজ্জামান কচি আলাদা প্রতিবেদন দাখিল করেন। এতে বলা হয়, আদালতের আদেশের পর নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ৫২টি পণ্যের বিরুদ্ধে আলাদা মামলা দায়ের করেছেন। পণ্যের নাম উল্লেখ করে গণমাধ্যমে বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। তাদের অভিযান অব্যাহত আছে।

আদালত নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের দাখিল করা প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হতে পারেননি। একপর্যায়ে তাদের আইনজীবীর উদ্দেশে বলেন, হাইকোর্টকে কি হাইকোর্ট দেখাচ্ছেন? আমরা এগুলো বুঝি। বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। সোজা না বলে বাঁকাভাবে বলছেন। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের আইনজীবী জানান, তিনি রাতে নির্দেশনা বাস্তবায়ন সংক্রান্ত প্রতিবেদন পেয়েছেন। এই আইনজীবীকে আদালত বলেন, আরেকটা অজুহাত দিলেন। প্রাণের গুঁড়া হলুদ, কারি পাউডার, লাচ্ছা সেমাই নিয়ে আদালত বলেন, এই কোম্পানিগুলো দেশের বড় কোম্পানির তালিকায় নাম রয়েছে। তাদের যদি এমন অবস্থা, তাহলে মানুষ কোথায় যাবে। মানুষকে যে কত রকম ঠকানো যায়, এসব ঘটনা তারই প্রমাণ। আদালত বলেন, ভোজাল বা নিুমানের পণ্যের মূল কথাই হচ্ছে মানুষ খেতে পারছে না। খেলে ক্যান্সার হবে।

এছাড়া ভোক্তা অধিকারের আইনজীবী দেশের বিভিন্ন জেলায় মানহীন ওইসব পণ্য জব্দ ও প্রত্যাহার এবং জরিমানা করার তথ্যাদি আদালতে তুলে ধরেন। এ সময় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কার্যক্রম সংক্রান্ত প্রতিবেদনে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে আদালত বলেন, আমরা আশা করব বছরজুড়ে প্রতিষ্ঠানটি এমন কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে।

শুনানিতে নমুনা সংগ্রহে যথাযথ নিয়ম মানা হয়নি উল্লেখ করেন এসিআই’র আইনজীবী ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ। তিনি পুনঃপরীক্ষার আর্জি জানান। এ সময় এসিআই লবণের প্যাকেট হাতে নিয়ে আদালত মোড়কে থাকা লেখাটি পড়েন। আদালত বলেন, এখানে ছোট করে লেখা আছে দুই বছর মেয়াদ। তার মানে কি আজীবন মেয়াদ।

পরে প্রাণ এগ্রো লিমিটেডের পক্ষে আইনজীবী এমকে রহমান বলেন, আমাদের অনেকগুলো প্রডাক্ট রয়েছে। আদেশের পর আমাদের ফ্যাক্টরি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। তাই আদেশটি সংশোধনের আবেদন জানাচ্ছি। আদালত বলেন, সিঙ্গাপুরের বাজারে গিয়ে প্রাণের পণ্য দেখে অবাক হয়ে গেছি, একই সঙ্গে গর্ববোধও করেছি। এখন পরীক্ষায় এসব কী দেখছি।

শুনানিকালে কনসাস কনজুমার্স সোসাইটির (সিসিএস) পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদের একটি আবেদন আদালতে দাখিল করা হয়। ওই আবেদনে বলা হয়, ৪০৬টি পণ্যের মধ্যে ৩১৩টির মান পরীক্ষার ফল ২ মে প্রকাশ করে বিএসটিআই। কিন্তু এখনও তারা বাকি ৯৩টি পণ্যের মান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করেনি। এরপর আদালত ওই ৯৩ পণ্যের পরীক্ষার ফল আগামী ১৬ জুন দাখিলের জন্য বিএসটিআই কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন।

এ বিষয়ে আইনজীবী শিহাব উদ্দিন খান যুগান্তরকে বলেন, বিএসটিআই ৪০৬টি পণ্যের মান পরীক্ষা করে ৩১৩টির ফল প্রকাশ করেছে। কিন্তু আরও ৯৩টি পণ্য পরীক্ষার ফল প্রকাশ না করায় আমরা ওই পণ্যগুলোর নাম বা মান সম্পর্কে জানতে পারছি না। যার কারণে এ বিষয়ে আদালতে আবেদন জানিয়েছিলাম। আদালত অপ্রকাশিত ৯৩টি পণ্যের মান পরীক্ষার ফল জমা দিতে বিএসটিআইকে নির্দেশ দিয়েছেন। আর ৫২ পণ্যের মধ্যে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি তাদের পণ্য বাজারজাত করতে চায় তাহলে পুনরায় পরীক্ষা করে উত্তীর্ণ হলে এ বিষয়ে ১৩ জুনের মধ্যে বিএসটিআইকে ফল প্রকাশ করতে বলা হয়েছে।

আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে ছিলেন ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোখলেছুর রহমান। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের পক্ষে ব্যারিস্টার মুহম্মদ ফরিদুল ইসলাম, বিএসটিআইয়ের পক্ষে ব্যারিস্টার এমআর হাসান, ভোক্তা অধিকারের পক্ষে কামরুজ্জামান কচি, প্রাণ এগ্রো লিমিটেডের পক্ষে অ্যাডভোকেট এমকে রহমান (খলিলুর রহমান) ও এসিআই’র পক্ষে ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ, সান চিপসের পক্ষে ব্যারিস্টার তানজীব উল আলম, বাঘাবাড়ী ঘি’র পক্ষে ছিলেন মোমতাজ উদ্দিন আহমদ মেহেদী।

প্রতিবেদন অনুসারে ৫২টি পণ্য হল- ১. সিটি অয়েলের সরিষার তেল (তীর), ২. গ্রিন ব্লিচিংয়ের সরিষার তেল (জিনি), ৩. শমনমের সরিষার তেল (পুষ্টি), ৪. বাংলাদেশ এডিবল অয়েলের সরিষার তেল (রূপচাঁদা), ৫. কাশেম ফুডের চিপস (সান), ৬. আররা ফুডের ড্রিংকিং ওয়াটার (আরা), ৭. আল সাফির ড্রিংকিং ওয়াটার (আল সাফি), ৮. মিজানের ড্রিংকিং ওয়াটার, ৯. মর্ন ডিউয়ের ড্রিংকিং ওয়াটার, ১০. ডানকানের ন্যাচারাল মিনারেল ওয়াটার, ১১.আরার ডিউ ড্রিংকিং ওয়াটার, ১২. দীঘির ড্রিংকিং ওয়াটার, ১৩. প্রাণের লাচ্ছা সেমাই, ১৪. ডুডলি নুডলস, ১৫.শান্ত ফুডের সফট ড্রিংক পাউডার (টেস্টি, তানি, তাসকিয়া), ১৬. জাহাঙ্গীর ফুড সফট ড্রিংক পাউডার, ১৭. ড্যানিশের হলুদের গুঁড়া, ১৮. প্রাণ এগ্রো লিমিটেডের হলুদের গুঁড়া (প্রাণ), ১৯.তানভির ফুড লিমিটেডের হলুদের গুঁড়া ফ্রেশ, ২০. এসিআইয়ের ধনিয়ার গুঁড়া, ২১.কারি পাউডার (প্রাণ), ২২ু. কারি পাউডার ড্যানিস, ২৩. বনলতার ঘি, পিওর হাটহাজারী মরিচ গুঁড়া, ২৪. মিষ্টিমেলার লাচ্ছা সেমাই, ২৫. মধুবনের লাচ্ছা সেমাই, ২৬. মিঠাইয়ের লাচ্ছা সেমাই, ২৭. ওয়েল ফুডের লাচ্ছা সেমাই, ২৮. এসিআইয়ের আয়োডিনযুক্ত লবণ, ২৯. কিংয়ের ময়দা, ৩০. রূপসার দই, ৩১. মক্কার চানাচুর, ৩২. মেহেদীর বিস্কুট, ৩৩. বাঘাবাড়ীর স্পেশাল ঘি, ৩৪. নিশিতা ফুডসের সুজি, ৩৫. মধুবনের লাচ্ছা সেমাই, ৩৬. মঞ্জিলের হলুদ গুঁড়া, ৩৭. মধুমতির আয়োডিনযুক্ত লবণ, ৩৮. সান ফুডের হলুদ গুঁড়া, ৩৯. গ্রিন লেনের মধু, ৪০. কিরণের লাচ্ছা সেমাই, ৪১. ডলফিনের মরিচের গুঁড়া, ৪২. ডলফিনের হলুদের গুঁড়া, ৪৩. সূর্যের মরিচের গুঁড়া, ৪৪. জেদ্দার লাচ্ছা সেমাই, ৪৫. অমৃতের লাচ্ছা সেমাই, ৪৭. দাদা সুপারের আয়োডিনযুক্ত লবণ, ৪৮. তিন তীরের আয়োডিনযুক্ত লবণ, ৪৯. মদিনা স্টারশিপ আয়োডিনযুক্ত লবণ, ৫০. তাজ অয়োডিনযুক্ত লবণ, ৫১. নুরের আয়োডিনযুক্ত লবণ ও ৫২. মোল্লা সল্ট।

ঘটনাপ্রবাহ : পণ্যে ভেজাল বিরোধী অভিযান

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×