আত্মসমর্পণ করতে চায় শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাত

সবুজ সঙ্কেত পেলে আইনি প্রক্রিয়ায় স্বাভাবিক জীবনে ফেরার আশা * সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে ইতি ঘটবে দেড় যুগের ফেরারি জীবনের

  তোহুর আহমদ ২৫ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শাহাদাত হোসেন
শাহাদাত হোসেন

শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে খেতাব পাওয়া শাহাদাত হোসেন আর পলাতক জীবনে থাকতে চায় না। ফিরতে চায় নিজ দেশে। এজন্য তিনি প্রাথমিক সব প্রস্তুতি গুছিয়ে নিচ্ছে। সবুজ সঙ্কেত পেলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করবে। আর এ প্রক্রিয়া সফল হলে তার দেড় যুগের বেশি ফেরারি জীবনের অবসান ঘটবে।

দেশে আসার এমন খবর যুগান্তরকে জানিয়েছেন শাহাদাত নিজেই। ফেরার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রতিবেদককে মুঠোফোনে জানায়, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য সরকার এখন অনেককেই সুযোগ দিচ্ছে। তাই শাহাদাতও সে সুযোগ নিতে চায়। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন জানিয়েছে এক সময়ের ছাত্রলীগ নেতা শাহাদাত হোসেন।

প্রসঙ্গত, শাহাদাত যখন নিজের নামেই সর্বত্র বিশেষ পরিচিতি পান, তখন রাজধানীর মিরপুর এলাকায় তিনি ছিলেন সবার কাছে মূর্তিমান এক আতঙ্কের নাম। ওই সময় তিনি মিরপুর থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। যদিও আওয়ামী লীগ শাহাদাতের এমন পরিচিতি ভালোভাবে নেয়নি। এক পর্যায়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

সময়টা ছিল ২০০২ সালের প্রথমদিকে। বিএনপি তখন সবে ক্ষমতায় এসেছে। এরপর থেকে দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে তিনি বিদেশে পলাতক। ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়েছে।

রাজধানীর মিরপুরের স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা মনির উদ্দিন মনু হত্যা মামলার অন্যতম আসামি তিনি। এ মামলায় শাহাদাতসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড এবং একজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। মূলত ২০০২ সালের ১০ মে কমিশনার সাইদুর রহমান নিউটন হত্যাকাণ্ডের পর দেশ ছাড়েন শাহাদাত।

এছাড়া তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ দেড় ডজন মামলা রয়েছে। পুলিশের খাতায় শাহাদাত মোস্ট ওয়ানটেড হিসেবে তালিকাভুক্ত। যে ক’জন পলাতক আসামিকে গ্রেফতারে বাংলাদেশ সরকার পুরস্কার ঘোষণা করে শাহাদাত তাদের মধ্যে প্রথম সারির একজন।

বিভিন্ন গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য মতে, বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে শাহাদাত প্রথমে ভারতে আশ্রয় নেন। ভারতে তার স্থায়ী বসবাসের খবর পাওয়া গেলেও তিনি দুবাই, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশেও নিয়মিত যাতায়াত করেন বলে জানা যায়। তার কাছে বিশ্বের একাধিক দেশের পাসপোর্টও রয়েছে।

সূত্র জানায়, বেশ কয়েক বছর ধরেই শাহাদাত দেশে ফেরার চেষ্টা করছেন। এজন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করছেন তিনি। কিন্তু তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকায় এবং বেশ কয়েকটি মামলায় ইতিমধ্যে চূড়ান্ত রায় হওয়ায় তার দেশে ফেরার বিষয়ে ‘গ্রিন সিগন্যাল’ মেলেনি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইয়াবা ব্যবসায়ীসহ চরমপন্থীদেরও আত্মসমর্পণের বিশেষ সুযোগ দেয়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে শাহাদাত নতুন করে যোগাযোগ শুরু করেন।

সূত্র বলছে, তার এবারের যোগাযোগ অনেকটাই ফলপ্রসূ হওয়ার পথে।

এদিকে বিশেষ সূত্রের সহায়তায় বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের সঙ্গে কথা বলতে সক্ষম হয় যুগান্তরের অনুসন্ধান টিম। এ সময় শাহাদাত দেশে ফেরার ইচ্ছার কথা বলেন। তার সঙ্গে কথোপকথনের সারসংক্ষেপ ছিল নিুরূপ :

যুগান্তর : আপনার দেশে ফেরার খবর শুনতে পাচ্ছি, এটি কতখানি সত্য?

শাহাদাত : সঠিক শুনেছেন, আমি আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছি।

যুগান্তর : আপনার বিরুদ্ধে তো হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডের আদেশসহ অনেকগুলো মামলা রয়েছে।

শাহাদাত : দেশে ফিরে প্রচলিত আইনের মুখোমুখি হতে এখন আমার আপত্তি নেই।

যুগান্তর : পলাতক জীবনের এত বছর পর এখন আত্মসমর্পণের ইচ্ছা কেন?

শাহাদাত : যদি কেউ অতীতে অপরাধ করে থাকে এবং এখন ভুল বুঝতে পারে তবে তাকে সমাজের মূল ধারায় ফেরার সুযোগ দেয়ার কথা বলছে বর্তমান সরকার। আমি আত্মসমর্পণ করে সেই সুযোগটি নিতে চাই। এজন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দরখাস্ত দিয়েছি। তিনি বলেন, বিদেশে ফেরারি জীবন অনেক কষ্টদায়ক। তার চেয়ে দেশে জেলে বন্দি থাকা ভালো। এছাড়া দেশে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আত্মসমর্পণের সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এমনকি সুন্দরবনের ডাকাত বা চরমপন্থীরাও আত্মসমর্পণের সুযোগ পাচ্ছে। এদের ক্ষেত্রে সরকার যে ব্যবস্থা নিয়েছে আমার ক্ষেত্রেও সে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছি।

যুগান্তর : আত্মসমর্পণ করলেও আপনার বিরুদ্ধে যেসব মামলা আছে সেগুলো কী হবে?

শাহাদাত : আমি সাধারণ ক্ষমার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করব। যদি ক্ষমা না পাই তবে মামলাগুলো আদালতেই মোকাবেলা করার সিদ্ধান্ত আমার। কারণ অনেক মামলা আমার বিরুদ্ধে হয়েছে যখন আমি দেশে ছিলাম না। অনেক মামলাতেই আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে। দেশে না এলে এসব পরিষ্কার করা যাচ্ছে না।

যুগান্তর : দেশে ফিরে কি আপনি ফের রাজনীতি করবেন?

শাহাদাত : আরে ভাই সেটা পরে দেখা যাবে। আগে তো আমাকে মামলা ফেস করতে হবে। যখন আমি আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্ত হব তখন নিশ্চয় এ বিষয়টি ভাবব। কেননা আমি তো দীর্ঘদিন ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। কোনোদিনই তো রাজনীতি ছেড়ে দিইনি। আমি যেখানেই থাকি না কেন, দেশের রাজনীতির খবর আমি সব সময়ই রাখি। অনেকের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ হয়। আমার শুভাকাক্সক্ষীরা দেশে ফেরার পরামর্শও দিয়েছেন।

যুগান্তর : আপনি কি আত্মসমর্পণের সুযোগ পাওয়ার কোনো সবুজ সঙ্কেত পেয়েছেন?

শাহাদাত : না এখনও পাইনি। তবে আমি চেষ্টা করছি। সব মহলেই কথাবার্তা বলছি। এ সময় তিনি তার নষ্ট জীবনের জন্য কিছুটা অনুশোচনা প্রকাশ করে বলেন, মরতে হলে দেশেই মরব। এমনকি মৃত্যুদণ্ডও যদি কার্যকর হয় তাতেও আমি ভয় পাই না। এক সময় সন্ত্রাসী কাজের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিলাম। সেজন্য এখন প্রায়শ্চিত্ত করতেও রাজি আছি।

যুগান্তর : আপনি এখন কোথায় আছেন? শুনেছি ভারতের শেয়ারবাজারে আপনার বিপুল পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ আছে?

শাহাদাত : নিরাপত্তার কারণে আমি কোথায় আছি তা এখন বলতে পারছি না। বলতে পারেন বিদেশে অনেকটাই মানবেতর জীবনযাপন করছি। আমি দীর্ঘদিন পলাতক। ভারতের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের টাকা কোথায় পাব। এগুলো সবই গুজব।

গোয়েন্দা সূত্রগুলো বলছে, শাহাদাত দেশে ফেরার জন্য বিচ্ছিন্নভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সঙ্গে টেলিফোনে কথাবার্তা বলেন। গত কয়েক বছরে তিনি বিদেশে বিশেষ করে ভারতে পলাতক বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী ও দাগি অপরাধীকে গ্রেফতারে সহায়তাও করেছেন। শাহাদাতের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে চালানো বেশকিছু অভিযান সফল হয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×