আগামী বাজেটে ঘাটতি পূরণ

বাড়বে ব্যাংক ঋণ, কমবে সঞ্চয়পত্রনির্ভরতা

ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি বিনিয়োগে বিরূপ প্রভাব পড়বে- এমকে মুজেরি

  মিজান চৌধুরী ২৬ মে ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাংক ঋণ

আগামী অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি পূরণে বাড়ানো হচ্ছে ব্যাংক ঋণ। অন্যদিকে কমিয়ে আনা হচ্ছে সঞ্চয়পত্রের ওপর নির্ভরতা। এতে বাজেটে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ সরকারকে ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ অপেক্ষাকৃত কম টাকা গুনতে হবে।

তবে বেসরকারি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে শঙ্কা অর্থনীতিবিদদের। তাদের মতে, সরকার ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে যাবে।

পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সঞ্চয়পত্রের সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে আর্থিক খাতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়। যে কারণে ঋণ ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে এ খাত থেকে টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা কমানো হচ্ছে। তবে অন্য বছরের মতো জিডিপি’র ৫ শতাংশের মধ্যেই রাখা হয়েছে নতুন ঘাটতি বাজেট। সেই হিসেবে এটি নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।

বাজেট ঘাটতি পূরণ করা হয় দু’ভাবে। এর একটি হচ্ছে বৈদেশিক সহায়তা, অপরটি অভ্যন্তরীণ উৎস। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস হিসেবে ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র খাত থেকে ঋণ নেয়া হয়।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী বাজেটের সম্ভাব্য আকার হচ্ছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। আর মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এতে ঘাটতি থাকছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। যা আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা আইএমএফ’র শর্ত অনুযায়ী জিডিপি’র ৫ শতাংশের মধ্যেই রাখা হয়েছে। আগামী ১৩ জুন বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এটি হচ্ছে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদের ক্ষমতায় আসার পর প্রথম বাজেট।

এই ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে সংগ্রহ করা হবে ৬০ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৮৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। অভ্যন্তীরণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে নেয়া হবে ৫৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। যা চলতি বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি বছরের তুলনায় ১২ হাজার ৭৭১ কোটি টাকা বেশি ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া হবে।

তবে সূত্র জানায়, সর্বশেষ হিসাবে চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার ১৪ শতাংশ ঋণ ব্যাংক থেকে নেয়া হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অস্বাভাবিক কম ব্যাংক ঋণ নেয়ার পেছনের অন্যতম কারণ হচ্ছে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট থাকা ও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের স্বাভাবিক গতি অব্যাহত রাখা।

অভ্যন্তরীণ অংশের আরেক খাত- সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়া হবে ৩০ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি বাজেটে ধরা হয়েছে ৪২ হাজার ২৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি বাজেটের তুলনায় আগামী বাজেটে এই খাত থেকে ১২ হাজার ২৯ কোটি টাকা কম নেয়া হবে। সর্বশেষ হিসাবে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩৫ হাজার ৬০২ কোটি টাকা সঞ্চয়পত্র খাত থেকে নেয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, বছর শেষে এটি লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করবে।

আরও জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে ঘাটতি বাজেট পূরণের জন্য বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের পরিমাণ চলতি বছরের তুলনায় খুব বেশি বাড়ানো হয়নি। কারণ বাংলাদেশ স্বল্প আয়ের দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে আগের তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান ভালো। যে কারণে ঋণ ও অনুদান দেয়ার পরিমাণও কমছে। পাশাপাশি বাংলাদেশও ঋণনির্ভরতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। এজন্য আগামী বাজেটে এর প্রতিফলন দেখা যাবে। চলতি বাজেটে এ খাত থেকে অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৫৪ হাজার ৬৭ কোটি টাকা। যা আগামী বাজেটে ৬ হাজার ৫১৩ কোটি টাকা কম ঋণ ও অনুদান গ্রহণ করা হবে।

সম্প্রতি অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত প্রাক-বাজেট বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, বাজেট হবে এক বছরের আয় ও ব্যয়ের হিসাব। কিন্তু এর মধ্যে আগামী ৫ বছরের দর্শন থাকবে। চলতি বাজেট থেকে আগামী বাজেটের আকার বড় হবে। তবে সঞ্চয়পত্র খাতে কিছু সংস্কার করা হবে। সঞ্চয়পত্র বিক্রি করা হবে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে। এজন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হবে।

ঘাটতি বাজেট প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বিআইডিএস’র সাবেক মহাপরিচালক এমকে মুজেরি যুগান্তরকে বলেন, সাধারণত সঞ্চয়পত্রের সুদ হার বেশি ও ব্যাংকের কম। ঘাটতি মেটাতে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে বেশি ঋণ নিলে সুদ বেশি গুনতে হবে। যে কারণে সরকার এ খাত থেকে ঋণ নেয়া কমিয়েছে। তবে ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নেয়া হলে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে বেসরকারি ঋণে। এতে বেসরকারি বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ বেসরকারি উদ্যোক্তারা পর্যাপ্ত ঋণ না পেলে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে। তিনি আরও বলেন, ঋণ গ্রহণ করলে সেটি যেন উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহার হয় সেদিকে সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে। তাহলে ঋণ নেয়ার বিরূপ প্রভাব কাটাতে পারবে।

তিনি আরও বলেন, রাজস্ব আহরণ কম বিধায় ঋণ নিয়ে সরকারকে চলতে হচ্ছে। এটি স্বাভাবিক। তবে ঋণের অর্থ ব্যয় যেন যুক্তিযুক্ত হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

ঘাটতির বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, আগামী বছর ঘাটতির পরিমাণ জিডিপি’র ৫ শতাংশের ওপরে যাবে না। পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রতি বছর ঘাটতি বাজেট জিডিপি’র ৩ থেকে ৪ শতাংশের বেশি হয় না। এরপরও ৫ শতাংশ হিসাব ধরেই ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে। জানা গেছে, সঞ্চয়পত্র খাতে ব্যাংক সংস্কার কার্যক্রম চলছে। কারণ বিগত সময়ে অধিকাংশ সঞ্চয়পত্রের মালিক হয়েছেন ধনী শ্রেণী। অথচ সমাজের পেনশনকারী, নিু ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকজন এর প্রকৃত উপকারভোগী হওয়ার কথা। যে কারণে সঞ্চয়পত্র খাতে সংস্কারের মাধ্যমে প্রকৃতদের হাতে এটি তুলে দেয়া হবে। এজন্য এ খাত সংকুচিত করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×