এসএসসি পরীক্ষার ফল পুনঃনিরীক্ষা

ফেল থেকে জিপিএ-৫

অবহেলা পরীক্ষকের, মাশুল গুনছে শিক্ষার্থীরা * খাতা দেখায় নানা গলদ : স্বল্পসময়ে দ্বিগুণ খাতা দেখতে হয় * নয় বোর্ডে ২৩১৯ জন শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হয়েছে * নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪১৫ জন, এর মধ্যে ফেল থেকে পেয়েছে ৬ জন

  মুসতাক আহমদ ০২ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পরীক্ষা

রাজধানীর কিংস কলেজ থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল মো. ওয়ালি-উল-করিম। ৬ মে ফল প্রকাশের পর দেখা গেল সে ফেল করেছে। এই ফলাফলে শুধু ওয়ালি-উল-করিমই নয়, তার বাবা-মা এবং শিক্ষকরা বিস্মিত।

ফল প্রকাশের পর ভীষণভাবে ভেঙে পড়ে ওয়ালি-উল-করিম। ছেলেকে নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন বাবা রেজাউল করিম ও মা সায়মা সুলতানা। তারা সার্বক্ষণিকভাবে সন্তানকে নজরে রাখেন। এ অবস্থায় ফল চ্যালেঞ্জের আবেদন করা হয়। শনিবার সেই ফল প্রকাশের পর দেখা গেল, ওয়ালি-উল-করিম জিপিএ-৫ পেয়েছে।

শুধু ওয়ালি-উল-করিমই নয়, যশোর বোর্ডের জান্নাতুল তাসনিম, চট্টগ্রাম বোর্ডের নাওফাত মেইন নাওয়ারসহ আরও বেশ কয়েকজন এসএসসি পরীক্ষার মূল ফলে প্রথমে ফেল করেছে বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু শনিবার পুনঃনিরীক্ষার ফলে দেখা যাচ্ছে তারা জিপিএ-৫ পেয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এভাবে শিক্ষা বোর্ডের অবহেলা এবং শিক্ষকদের উদাসীনতার শিকার হচ্ছে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের অনেক পরীক্ষার্থী। এদের কারণে প্রতি বছরই হাজার হাজার শিক্ষার্থী ভুল ফল মূল্যায়নের শিকার হচ্ছে। প্রথম দফায় অনেকে ফেল বা কম জিপিএ পাচ্ছে। পরে ফল পুনঃনিরীক্ষায় ফেল থেকে পাস করছে, জিপিএ-৫ পাচ্ছে এমন নজির আছে।

শনিবার প্রকাশিত এবারের এসএসসি পরীক্ষার পুনঃনিরীক্ষার ফলে দেখা গেছে, ৯টি শিক্ষা বোর্ডে ২ হাজার ৩১৯ জন শিক্ষার্থীর রেজাল্ট পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪১৫ জন। বাকিদের জিপিএ বেড়েছে। ফেল থেকে পাস করেছে ঢাকা বোর্ডে ১৪২ জন, কুমিল্লা বোর্ডে ৯৪ জন, বরিশালে ৪২ জন, সিলেটে ৩৩ জন, যশোরে ১৩১ জন, চট্টগ্রামে ৮০, দিনাজপুরে ৫৫ জন এবং মাদ্রাসা বোর্ডে ৪৪ জন। এর মধ্যে শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ঢাকা বোর্ডে ফেল থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে একজন। যশোর বোর্ডে একজন। এছাড়া চট্টগ্রামে ২ জন ও দিনাজপুরে ২ জন নতুন করে জিপিএ-৫ পেয়েছে। প্রথম রেজাল্টে এরা ফেল করেছিল।

অভিযোগ উঠেছে, এ ধরনের প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে শিক্ষা বোর্ডের অসাধু কর্মকর্তা এবং কিছু শিক্ষক জড়িত। পরীক্ষা শেষে খাতা বণ্টনের সময় অনেক ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নিয়ে থাকেন বোর্ডের অসাধু কর্মকর্তারা। কম যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষককে অধিক পরিমাণে খাতা দেয়া হয়। যোগ্য শিক্ষকদের অনেকেই বোর্ডের পরীক্ষক হতে পারেন না। উত্তরপত্র (পরীক্ষার খাতা) মূল্যায়নের জন্য সময় দেয়া হয় মাত্র ২ সপ্তাহ। এ সময়ের মধ্যে তিনশ’ খাতা ভালোভাবে দেখা সম্ভব। কিন্তু দেয়া হয় ছয়শ’ থেকে সাতশ’ খাতা। অভিযোগ আছে, সময় স্বল্পতার অজুহাতে পরীক্ষকরা ছাত্র বা পরিবারের সদস্যদের দিয়ে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করিয়ে থাকেন। নম্বর যোগ করার সময় মনোযোগ দেয়া হয় না। এতে পরিসংখ্যানগত ভুল বাড়ছে। ফলে পাল্টে যাচ্ছে রেজাল্ট। অমনোযোগিতার কারণে কোনো বিষয়ে প্রাপ্ত ৮৬ নম্বর, ৬৮ হিসেবে রেজাল্ট শিটে উঠছে। এতে অনেক শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আবার ৮২ পাওয়া শিক্ষার্থীর নম্বর রেজাল্ট শিটে ওঠে ২৮। ফলে এ ধরনের শিক্ষার্থীর রেজাল্ট আসে ফেল। ফল পুনঃনিরীক্ষায় গিয়ে এসব ভুল ধরা পড়ছে। উল্লিখিত ওয়ালি-উল-করিমকে প্রথম ফলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে ফেল দেখানো হয়েছিল। পুনঃনিরীক্ষায় দেখা যায়, এ বিষয়ে সে জিপিএ-৫ পেয়েছে। এভাবেই চ্যালেঞ্জের পর পাল্টে যাচ্ছে ফলাফল। কিন্তু যারা আবেদন করে না, তারা সুবিচার বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে।

পরীক্ষা ও ফলকেন্দ্রিক এসব ঘটনার কারণে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার মতো ঘটনাও ঘটছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। ভুক্তভোগী ছাত্রছাত্রী ও তাদের অভিভাবকদের মধ্যে এসব নিয়ে ক্ষোভ আছে। কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক কোনো পদক্ষেপ নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

ওয়ালি-উল-করিমের প্রতিষ্ঠান কিংস কলেজের চেয়ারম্যান লায়ন এমকে বাশার যুগান্তরকে বলেন, এসএসসিসহ পাবলিক পরীক্ষার উত্তরপত্র যারা মূল্যায়ন করেন তারা মার্কিং (নম্বর দেয়া) থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভুল-ত্রুটি করে থাকেন। অনেকে নিজেরা খাতা দেখেন না। কেউ কেউ ছাত্রছাত্রীদের দিয়ে খাতা মূল্যায়ন করান। এভাবে দায়িত্বহীনতার কারণে অনেকের জীবন নষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, যে ছাত্র ফেল করবে, সে কিন্তু আত্মহত্যা করবে না। কিন্তু যাদের জিপিএ-৫ পাওয়ার কথা তাদের কেউ যখন ফেল রেজাল্ট পাবে তখন কেউ কেউ আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটাতে পারে।

ভুল মূল্যায়নের শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়ার একটি ঘটনা ঘটে ২০১৬ সালে। ওই বছরের ১১ মে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়। এরপর বরিশাল ও চট্টগ্রাম বোর্ডের ফলে ভুল ধরা পড়ে। বোর্ড দুটির ফল দু’বার প্রকাশ করতে হয়। ১১ মে ফল প্রকাশের পর দেখা যায়, বরিশাল বোর্ডের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী হিন্দুধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ে খারাপ করেছে। এ কারণে তারা ফেল করে। এ ফল প্রকাশের এক ঘণ্টার মধ্যে বরিশাল শহরের উদয়ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের হৃদয় ঘোষ নামে এক ছাত্র বহুতল ভবন থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে। এরপর বোর্ড কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের আবেদন ছাড়াই ফল পুনঃনিরীক্ষা শেষে নতুনভাবে (রেজাল্ট) ঘোষণা করেন। এতে বদলে যায় ওই বিষয়ে মোট এক হাজার ৯৯৪ শিক্ষার্থীর ভাগ্য। এদের মধ্যে হিন্দুধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ে ফেল থেকে পাস করে এক হাজার ১৪১ জন। ফেল থেকে জিপিএ-৫ পায় ৭৯ জন। আত্মহত্যা করা হৃদয় ঘোষের পরিবর্তিত ফল হয়েছিল জিপিএ-৪.৬৭।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আবু বকর সিদ্দিক শনিবার যুগান্তরকে বলেন, পরীক্ষার সঙ্গে একজন শিক্ষার্থীর সারাজীবনের সুখ-দুঃখ জড়িত। অবহেলা বা উদাসীনতার সঙ্গে পরীক্ষা সংশ্লিষ্টদের কাজ করা ঘোরতর অন্যায়। অনেক ভুলকে ‘মানবিক’ হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু কিছু ভুল ক্ষমার অযোগ্য। আমরা কঠিন ভুলের ক্ষেত্রে কঠোর হয়ে থাকি। এ নিয়ে একটি কমিটি আছে, যারা ভুলগুলো পর্যালোচনা করে থাকে। এবারের পুনঃনিরীক্ষায় যেসব শিক্ষার্থীর ফল উন্নয়ন হয়েছে, তাদের কেস পর্যালোচনা করে দায়-দায়িত্ব নিরূপণ শেষে উপযুক্ত শাস্তির জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠাব। তিনি স্বীকার করেন, কিছু পরীক্ষক আছে যারা সন্তানকে দিয়ে ওএমআর (মেশিন পাঠযোগ্য) ফরমে প্রাপ্ত নম্বরের বৃত্ত ভরাট করান। এ ক্ষেত্রে কোনো ছাত্র ৮৫ পেলে বৃত্ত হয়তো ভরাট হয়ে থাকে ০৫। তখনই সমস্যা হয়। এ ধরনের মানুষ দায়িত্বশীল নন। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়নে ভুলভ্রান্তির অন্যতম কারণ হচ্ছে তাড়াহুড়ো করে খাতা দেখা। কয়েক বছর ধরে যথাসময়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ফল ঘোষণা করে সরকারি মহল থেকে কৃতিত্ব নেয়ার চেষ্টা চলে। এটা করতে গিয়ে একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। নাম প্রকাশ না করে একাধিক পরীক্ষক জানিয়েছেন, খাতা মূল্যায়ন করতে খুব কম সময় দেয়া হয়। রাজধানীর একটি স্কুলের শিক্ষক বলেন, বোর্ড থেকে দেয়া খাতা ১৪ দিনের মধ্যে জমা দিতে হয়। এই সময়ে সর্বোচ্চ ৩০০ খাতা ঠিকমতো মূল্যায়ন সম্ভব। কিন্তু ৫০০ থেকে ৭০০ খাতা দেয়া হয়। এতেই ভুলের ঘটনা ঘটে থাকে, অনেক ক্ষেত্রে সঠিক মূল্যায়নও হয় না। এর খেসারত দিতে হয় শিক্ষার্থীদের।

তবে এ ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্রও আছে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে দীর্ঘদিন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব পালন করা এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে যুগান্তরকে বলেন, পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে শিক্ষকদের যে সময় দেয়া হয় তা পর্যাপ্ত। কিন্তু তারা খাতা নিয়ে ফেলে রাখেন। এমনকি অনেকেই বোর্ড থেকে তাগিদ দেয়ার পর খাতা মূল্যায়নে বসেন। সুতরাং ভুলের দায় পরীক্ষকদের।

আরও পড়ুন

'কোভিড-১৯' সর্বশেষ আপডেট

# আক্রান্ত সুস্থ মৃত
বাংলাদেশ ৫৬ ২৬
বিশ্ব ১০,০০,১৬৮২,১০,১৯১৫১,৩৫৪
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

 
×