সুখবর নেই কর্পোরেট করে

প্রতিষ্ঠানকে আগের হারেই কর দিতে হবে * রাজস্ব আদায়ে প্রাধান্য দিচ্ছে এনবিআর

  সাদ্দাম হোসেন ইমরান ০২ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কর্পোরেট

সরকারের বিনিয়োগ সম্পর্কিত দুই সংস্থা- বিডা ও বেজাসহ ব্যবসায়ী মহলের জোর দাবি সত্ত্বেও আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে কর্পোরেট কর কমানো হচ্ছে না। আগের হারে প্রতিষ্ঠানকে কর্পোরেট কর দিতে হবে। এক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিনিয়োগের চেয়ে রাজস্ব আদায়কে প্রাধান্য দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এ তথ্য।

সূত্র জানায়, এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কর্পোরেট কর না কমানোর বিষয়ে একমত হয়েছে। এর পেছনে দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টকে (আরজেএসসি) নিবন্ধিত যেসব প্রতিষ্ঠান রিটার্ন জমা দেয়, তার বেশির ভাগই লোকসান দেখিয়ে কর ফাঁকি দেয়ার চেষ্টা করে। অর্থাৎ কর বেশি না কম- এতে তাদের মাথাব্যথা নেই। দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়ীরা বলে থাকেন- পার্শ^বর্তী দেশের তুলনায় বাংলাদেশে কর্পোরেট কর বেশি, এটা সঠিক নয়। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর্পোরেট করহার ২৫ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। বাংলাদেশের কর্পোরেট করহার বৈশ্বিক গড় হারের (২৪ দশমিক ২৯ শতাংশ) সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

সূত্র আরও জানায়, কর্পোরেট কর না কমানোর ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। সেটা হচ্ছে- কর্পোরেট করহার কমালে তার সুফল অর্থনীতি ভোগ করতে পারে না। যেমন- ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকিং খাতের কর্পোরেট কর কমানো হলেও বিনিয়োগকারীরা উপকৃত হননি। শুধু ব্যাংকের পরিচালকরা লাভবান হয়েছেন। তাই আগামী বাজেটে রাজস্ব আদায়কেই প্রাধান্য দিচ্ছে এনবিআর।

২ মে এনবিআরের সঙ্গে অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ইআরএফের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, আগামী বাজেটে কর্পোরেট করহার কমবে না। এ ছাড়াও ব্যবসায়ী সমিতি ও খাতভিত্তিক অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় এনবিআর চেয়ারম্যান ট্যাক্স না কমানোর বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন।

এনবিআরের তথ্যমতে, প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় কর্পোরেট কর আদায়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে। ভারতে যেখানে কর্পোরেট ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত ৩ দশমিক ৬২ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে ২ দশমিক ৩৩ শতাংশ। এছাড়া থাইল্যান্ডে ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং ইন্দোনেশিয়ায় ৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ।

৩০ মে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এনবিআর-এফবিসিসিআই’র পরামর্শ কমিটি সভায় ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই কর্পোরেট কর আড়াই শতাংশ কমানোর ব্যাপারে জোর দাবি জানায়। এর যৌক্তিকতায় বলা হয়, বাংলাদেশে কর্পোরেট করহার বেশি, যা অনেক কোম্পানি করদাতা বিশেষত পুঁজিবাজারে তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির ক্ষেত্রে সঠিক আয় প্রদর্শনে নিরুৎসাহিত করে।

এ হার সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে এলে তালিকাবহির্ভূত সঠিত আয় প্রদর্শনে উৎসাহিত হবে। এতে নতুন কোম্পানি গঠন ও অধিক রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্র তৈরি হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে কর্পোরেট কর ৩০ শতাংশ থেকে পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছে। শ্রীলংকা ও পাকিস্তানে কর্পোরেট কর বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে কর্পোরেট কর কমানোর প্রস্তাব করে সংগঠনটি।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, কর্পোরেট ট্যাক্স কমানো হলে সেটা দেশের অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক হবে। এতে রাজস্ব আদায় সাময়িকভাবে কমলেও দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে একবারে কর্পোরেট ট্যাক্স না কমিয়ে পর্যায়ক্রমে কমাতে। এতে রাজস্ব আদায়ে খুব একটা প্রভাব পড়বে না। অন্যদিকে বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে।

ডিসিসিআই’র সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান যুগান্তরকে বলেন, অর্থনীতির স্বার্থেই কর্পোরেট কর কমানো উচিত। রাজস্ব আদায়ে ব্যাঘাত না ঘটিয়ে পর্যায়ক্রমে কর্পোরেট কর কমানো যায়। প্রয়োজনে নতুন টেকনোলজি গ্রহণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও গবেষণায় ব্যয় করার শর্তে কর ছাড় দেয়া যেতে পারে। এতে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত হবেন। প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বৃদ্ধি পেলে অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকের ওপর চাপ কমবে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে।

একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাজস্ব আয়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রার কথা বিবেচনায় নিয়ে কর্পোরেট কর হ্রাসের পরিকল্পনা থেকে সরে আসে এনবিআর। উৎসে কর থেকে আয়কর সিংহভাগ আদায় হয়। এর পরই রয়েছে কর্পোরেট কর। আয়কর খাতে ব্যক্তিশ্রেণীর দেয়া করের পরিমাণ একেবারেই নগণ্য। এ অবস্থায় কর্পোরেট করহার হ্রাস করলে আয়কর আদায় কার্যক্রম ঝুঁকিতে পড়বে- এ বিবেচনায় কর্পোরেট কর কমানো হচ্ছে না।

এ বিষয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, কর্পোরেট কর কমালে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উৎসাহ সৃষ্টি হবে। তবে শুধু কর কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো যাবে না। এর সঙ্গে অন্যান্য উপকরণের ক্ষেত্রেও বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করতে হবে।

এদিকে আগামী বাজেটে কর্পোরেট কমানোর ব্যাপারে বিনিয়োগ সংক্রান্ত সরকারি দুই সংস্থা- বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) জোর দাবি জানিয়েছে। ১৫ মে এনবিআরের সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, কয়েক বছর ধরে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের প্রথম ৫ বছর পর্যন্ত কর অবকাশ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এরপরও কিছু কোম্পানি বিদেশে চলে যাচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশে ব্যবসা করত এরকম একটি কোম্পানি কর্পোরেট করহার বেশি হওয়ায় বিদেশে পুঁজি নিয়ে গেছে। ওই কোম্পানি এখন অন্য দেশে বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছে। ওই কোম্পানি নিশ্চয় বাংলাদেশের চেয়ে বেশি সুযোগ পাবে, ওই রকম কোনো দেশে বিনিয়োগ করবে। অনেকে অভিযোগ করেছেন, আমাদের কর্পোরেট করহার অন্য দেশের তুলনায় বেশি। তাই এনবিআরকে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য কর্পোরেট করহার যৌক্তিক পর্যায়ে সমন্বয় করতে হবে।

বর্তমান কর্পোরেট কর কাঠামো : ৭ স্তরে কর্পোরেট কর আদায় হয়। পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির ক্ষেত্রে পৃথক হার রয়েছে। তালিকাভুক্ত কোম্পানি ২৫ শতাংশ, তালিকাবহির্ভূত কোম্পানি ৩৫ শতাংশ, তালিকাভুক্ত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ, তালিকাবহির্ভূত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ৪০ শতাংশ, মার্চেন্ট ব্যাংক ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ, সিগারেট কোম্পানি ৪৫ শতাংশ, মোবাইল অপারেটরে যথাক্রমে ৪০ ও ৪৫ শতাংশ কর্পোরেট কর বিদ্যমান রয়েছে।

গত ৫ অর্থবছরের করহার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সর্বশেষ ২০১৪-১৫ অর্থবছরের বাজেটে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার কমানো হয়। ২৭ দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়। এরপর থেকে সে ধারা অব্যাহত আছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে তালিকাভুক্ত ও তালিকাবহির্ভূত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করহার যথাক্রমে আড়াই শতাংশ কমিয়ে ৩৭ দশমিক ৫০ শতাংশ ও ৪০ শতাংশ করা হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে তালিকাভুক্ত সিগারেট কোম্পানির করহার ৪০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪৫ শতাংশ করা হয়। এছাড়া অন্য খাতে করহারে পরিবর্তন আনা হয়নি। আগামী অর্থবছরে বর্তমান এই করহার বহাল থাকছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×