জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড

ঠিকাদারের টাকায় চীন যাচ্ছেন তিন কর্মকর্তা

  মুসতাক আহমদ ০৩ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কাগজের মিল পরিদর্শনের নামে ঠিকাদারের টাকায় চীন ভ্রমণে যাচ্ছেন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) তিন কর্মকর্তা। আগামী ১২ জুন চার দিনের জন্য এই ভ্রমণ শুরু হবে। দরদাতা প্রতিষ্ঠানের অর্থে এভাবে ভ্রমণে যাওয়ার ঘটনায় নানা কানাঘুষা চলছে।

চার কর্মকর্তা হলেন- এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক নারায়ণ চন্দ্র সাহা, অপর সদস্য (অর্থ) মির্জা তারিক হিকমত এবং ঊর্ধ্বতন ভাণ্ডার কর্মকর্তা আবু হেনা মাশুকুর রহমান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে ভারতের বিভিন্ন মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের ঘটনা আছে। যদিও এনসিটিবির এক শীর্ষ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি এনসিটিবি থেকে ভ্রমণ বাবদ অর্থ নেয়ার পরও অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ভ্রমণ ব্যয় নিয়েছেন। কিন্তু সাধারণ নিয়ম হচ্ছে- এ ধরনের ভ্রমণের ব্যয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নয়, সরকারই বহন করবে। সেই হিসাবে দরদাতা প্রতিষ্ঠানের অর্থে মিল পরিদর্শনের ঘটনা এই প্রথম।

এ প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান নারায়ণ চন্দ্র সাহা রোববার যুগান্তরকে বলেন, যা হচ্ছে টেন্ডার সিডিউলে বর্ণিত নির্দেশনামতোই হচ্ছে। মিল এবং সাপ্লাইয়ার অফার করেছে। সে কারণে আমরা যাচ্ছি। ব্যয় কে দিচ্ছে এ প্রশ্নের জবাব তিনি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, সেটা টেন্ডারে উল্লেখ আছে। কী আছে আমি তা দেখিনি।

এ ভ্রমণে যাওয়ার কথা ছিল প্রতিষ্ঠানটির সদস্য (বদলির আদেশপ্রাপ্ত) অধ্যাপক ড. মিয়া ইনামুল হক সিদ্দিকীরও। কিন্তু বদলির আদেশ হওয়ায় তিনি যাচ্ছেন না। এ বিষয়ে তিনি বলেন, সাধারণত এ ধরনের পরিদর্শনে এনসিটিবিই ব্যয় বহন করে। এক্ষেত্রেও সেটাই হওয়ার কথা। তবে যেহেতু আমি যাচ্ছি না তাই আমি খোঁজ নেইনি।

সরকার বর্তমানে ২০২০ সালের পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ করছে। এবারও মোট চারটি টেন্ডারে ছাপা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রাক-প্রাথমিকের বই ছাপানো হয় একটি টেন্ডারে। ৯৮ লটে ছাপানো হচ্ছে প্রাথমিকের পাঠ্যবই। আন্তর্জাতিক এই টেন্ডারের কাজ যেসব বিদেশি প্রতিষ্ঠান পেয়ে থাকে সেগুলো পরিদর্শন এনসিটিবির অর্থে পরিচালিত হয়ে থাকে। মাধ্যমিকের বই এবারও দুটি আলাদা টেন্ডারে ছাপানো হচ্ছে। এর মধ্যে ৩২০ প্যাকেজের টেন্ডারে কাগজ মুদ্রাকরই দিয়ে থাকে। আর ৩৪০ প্যাকেজের বই ছাপানোর কাগজ এবং মলাট দেয়ার আর্ট কার্ড দিয়ে থাকে এনসিটিবি। এবার এই প্যাকেজের জন্য ২ হাজার ৪০০ টন আর্ট কার্ড কেনা হচ্ছে। এর টেন্ডার পেয়েছে মাস্টার সিমেক্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ৬শ’ টন করে মোট ৪টি প্যাকেজেরই সরবরাহের কাজ দেয়া হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানকে। এই আর্ট কার্ড কেনার টেন্ডারদাতা বা সাপ্লাইয়ারের মিল পরিদর্শনেই যাচ্ছেন উল্লিখিত তিন কর্মকর্তা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মাস্টার সিমেক্সের স্বত্বাধিকারী দেওয়ান আলী কবির রোববার যুগান্তরকে বলেন, টেন্ডার সিডিউলে শর্ত ছিল কাগজ সরবরাহের আগে এনসিটিবির কর্মকর্তাদের মিল পরিদর্শন করাতে হবে। সে অনুযায়ী কাগজ উৎপাদক হিসেবে মিল অফার করেছে। এখন এনসিটিবি কর্মকর্তা যাবেন। মিল যাতায়াত, থাকা-খাওয়া বহন করবে। এখানে এনসিটিবির কোনো খরচ নেই।

এটা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন এনসিটিবি সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, সরকারি কোনো কোনো কেনাকাটায় ‘প্রি-ইন্সপেকশন’ (পূর্ব পরিদর্শন) আছে। যদিও এনসিটিবিতে ইতিপূর্বে এ ধরনের ঘটনা নেই। কিন্তু এবার দরদাতার কাছ থেকে সুবিধা নেয়া ও কেবল প্রমোদ ভ্রমণের লক্ষ্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই এই শর্ত টেন্ডার সিডিউলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এরপরও যদি কাগজ মিল পরিদর্শনে যেতেই হয়, তাহলে কমিটিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ থাকা দরকার। কিন্তু তিন সদস্যের কেউই এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন।

অপরদিকে চীনের সংশ্লিষ্ট মিলটি এই কাজের ঠিকাদার নয়। বাংলাদেশের একজন ঠিকাদার সাপ্লাইয়ার হিসেবে এই কাজ নিয়েছে। এক্ষেত্রে ওই মিল কেবল অথরাইজেশন (ঠিকাদার কাজ পেলে কাগজ সরবরাহ করবে মর্মে চিঠি) দিয়েছে। সেই হিসাবে মিলের পক্ষ থেকে পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানানোর সুযোগ নেই। এসব কারণে এই ভ্রমণ এবং এর ব্যয় বহনসহ গোটা বিষয়টিই ঘোলাটে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, পরিদর্শনে এভাবে ঠিকাদারের কাছ থেকে টাকা নেয়া অনৈতিক। উৎপাদকের অর্থেও ভ্রমণে যাওয়ার সুযোগ নেই। এতে ঠিকাদারের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়া এবং কাগজের মানের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

এ ব্যাপারে কমিটির সদস্য আবু হেনা মাশুকুর রহমান দাবি করছেন, ভ্রমণের ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ে চিঠি লেখা হয়েছে। তাতে টেন্ডারের শর্ত উল্লেখ আছে। এ ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন আছে। অনৈতিক ও অন্যায় হলে মন্ত্রণালয় অনুমতি দিত না। সিডিউলের শর্তের বাইরে কিছু হচ্ছে না।

তবে বিষয়টি এমন নয় বলে জানিয়েছেন এনসিটিবির এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, টেন্ডার সিডিউলে উল্লেখ আছে যে, পারচেজার (ক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান) চাইলে মিল পরিদর্শন করাতে হবে। সেখানে উল্লেখ নেই এর অর্থ কে দেবে। স্বাভাবিকভাবেই বিক্রয়কারী এ অর্থ দেবে না। বিদেশে বই মুদ্রণের কাজ পরিদর্শনের ব্যয় বহন করে এনসিটিবি। এ ক্ষেত্রেও সেটা থাকতে হবে। বিষয়টি মন্ত্রণালয় সঠিকভাবে অবগত কিনা সেটা তদন্তের বিষয়।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×