গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিশেষ নজর থাকবে: একান্ত সাক্ষাৎকারে পরিকল্পনামন্ত্রী

সরকার ন্যায় ও সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এজন্য নির্বাচনী ইশতেহারে গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এটি আসন্ন বাজেটেও (২০১৯-২০ অর্থবছর) বিশেষ গুরুত্ব পাবে। বিশেষ করে যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পর্যটনের বিকাশে জোর দেয়া হয়েছে। যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান এ কথা বলেন। তার মতে, দারিদ্র্যবিমোচন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন এবং মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়াতে কাজ করছে সরকার। আর এসবের উদ্দেশ্য হল ২০২৪ সালের মধ্যে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ২ অঙ্কে (ডাবল ডিজিটে) নিয়ে যাওয়া। এসব বিষয়সহ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং বৈদেশিক সহায়তা ব্যবহার নিয়ে নানা উদ্যোগের কথা বলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন-

  হামিদ-উজ-জামান ১১ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পরিকল্পনামন্ত্রী
পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান। ছবি: যুগান্তর

যুগান্তর : এবারের বাজেট কেমন হবে?

এমএ মান্নান : ন্যায্যতাভিত্তিক বাজেট হবে। আর এই বাজেটের সুফল দেশের বেশির ভাগ মানুষের কল্যাণে যাবে। বেশির ভাগ মানুষ বলতে আমি তাদেরই বুঝি, যেসব নাগরিক প্রান্তিক থেকে আস্তে আস্তে উপরের দিকে উঠে আসছে। আমাদের দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ নিম্ন আয়ের। ২০ শতাংশ মানুষ এখনও বৈষয়িক বিচারে দরিদ্র। এর মধ্যে ১০ শতাংশ অতিদরিদ্র। আগামী বাজেটে এসব মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে নতুন বার্তা থাকবে।

বিশেষ করে আয় বাড়ানোর মতো কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে নিম্ন আয়ের মানুষকে উপরের আয়ে নিয়ে আসা, অতি দরিদ্র মানুষকে দরিদ্র মানুষের কাতারে নিয়ে আসা, বৈষয়িক বিচারে যারা এখনও দরিদ্র তাদের নিম্ন মধ্যম আয়ের মানুষের পর্যায়ে উন্নীত করার লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। সেটি মাথায় রেখেই এডিপি প্রণয়ন করা হয়েছে। এ ব্যাপারে বাজেটের অর্থ বরাদ্দেও বিশেষ নজর রাখা হয়েছে।

যুগান্তর : প্রতিবছরই বাজেট বাস্তবায়ন কমে যাচ্ছে। এটি বাড়াতে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

এমএ মান্নান : বাজেট বাস্তবায়ন সরকারের অনেক মেশিনারিজের ওপর নির্ভর করবে। বাজেটের দুটি অংশ- একটি উন্নয়ন এবং অপরটি রাজস্ব বাজেট। রাজস্ব আয়ের বেশির ভাগই ব্যয় হয়ে যায়। কিন্তু উন্নয়ন ব্যয় ঠিকমতো হয় না। এসব বিষয় নির্ভর করে সরকারের মেশিনারিজগুলো ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তার ওপর। কাজে সমস্যা হলেই বাজেট বাস্তবায়নে সমস্যা হয়।

উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে আবহাওয়াও একটি বিষয়। প্রকল্প কাঠামো তৈরি, একনেকে অনুমোদন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ, অর্থ বরাদ্দ, বৈদেশিক সহায়তা থাকলে সেগুলো ছাড় করা- এমন হাজারও বিষয় আসে। সব সমন্বয় করতে বেশ সময় লাগে। এ কারণে এডিপি বাস্তবায়নে একটু সমস্যা হয়। তারপরও আমাদের এডিপি বাস্তবায়নের হার সন্তোষজনক।

যুগান্তর : জনগণের মধ্যে এবারের বাজেটের কী ধরনের প্রভাব পড়বে?

এমএ মান্নান : এবারের বাজেটে গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও চাঙ্গা করতে বিশেষ নজর দেয়া হয়েছে। শহরের সুবিধা গ্রামে পৌঁছে দেয়ার জন্য থাকবে বিশেষ পদক্ষেপ। এজন্য গ্রামের অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার থাকবে যোগাযোগ খাতে। সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি রেল যোগাযোগও বাড়ানো হবে। ইতিমধ্যে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে প্রতিটি জেলাকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনার।

পর্যটন এলাকাগুলোকেও রেল যোগাযোগের আওতায় আনা হচ্ছে। এসব অবকাঠামো নির্মিত হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ হবে। তখন গ্রামের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়ে যাবে। গ্রামে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মিত হবে। ইউনিয়নকে গ্রামের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফলে প্রতিটি ইউনিয়নের সদর এলাকা পরিণত হবে একটি ‘অর্থনৈতিক পাওয়ার হাউস’ হিসেবে। এতে সবচেয়ে বেশি উপকার হবে কৃষির। কৃষক তার পণ্য সহজেই নিকটস্থ বাজারে নিয়ে আসতে পারবে।

ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার ফলে মানুষ সেগুলো কিনবে। মানুষের চলাচলের পথ সহজ ও সুন্দর হয়। গ্রামের মা-বোনেরা ঘরের কাছেই অল্প করে হলেও যেন স্বাস্থ্যসেবা পান, সেদিকেও নজর রাখা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে স্থাস্থ্য কেন্দ্র গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে সার্বক্ষণিক ডাক্তার ও নার্স থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও গড়ে তোলা হবে। গ্রামের শেষ বাড়িটি পর্যন্ত যেন বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে যায়, সে ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে।

গ্রামে সুপেয় পানির সমস্যা রয়েছে। মানুষ যেন সুপেয় পানি পায়, সেদিকেও কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। স্যানিটেশনে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। অনেক দেশের চেয়ে ভালো করেছি। এ খাতে আরও ভালো যাতে হয়, সেজন্য চলমান প্রকল্পগুলো অব্যাহত রাখা হবে। কোনো মানুষ যেন খারাপ পানি না পান করে, যাথাযথ সেনিটেশন ব্যবস্থা পায়, সে বিষয়গুলো বাজেটে নিশ্চিত করা হবে।

যুগান্তর : সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে বাজেটে কী থাকছে?

এমএ মান্নান : দেশের অর্থনীতিকে আমরা দ্রুত এগিয়ে নিতে চাচ্ছি। এজন্য অনেক মেগা প্রকল্প (অগ্রাধিকার) বাস্তবায়নে একসঙ্গে হাত দেয়া হয়েছে। এগুলো দ্রুত এগিয়েও নেয়া হচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সেজন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি কমিটি রয়েছে।

তার নির্দেশনা ও বিশেষ তত্ত্বাবধানে ফাস্টট্র্যাকভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের আইএমইডি (বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ) এবং প্রকল্প পরিচালকরা তো আছেন। এভাবে সব পক্ষের তত্ত্বাবধানে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে।

মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সেজন্য এসব প্রকল্পে অর্থছাড় দ্রুত করা হচ্ছে। প্রচলিত বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। বৈদেশিক ঋণের ব্যাপারে সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। প্রয়োজনে বিশেষ বৈঠক করা হচ্ছে।

তবে মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে পদ্মা সেতুর বাস্তবায়ন কিছুটা পিছিয়েছে। বিদ্যমান সমস্যা সমাধান করে এখন দ্রুত বাস্তবায়ন কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। আগামী বছর এ সেতুর ওপর দিয়ে গাড়ি চলতে পারবে। সে লক্ষ্যে কাজ করা হচ্ছে। এবারের বাজেটেও পদ্ধা সেতুর ওপর বিশেষ বরাদ্দ থাকছে। শুধু পদ্ধা সেতু বাস্তবায়ন হলেই দেশের দক্ষিণাঞ্চলে যে কর্মচাঞ্চল্য দেখা দেবে, তাতে জিডিপি ১ থেকে দেড় শতাংশ বেড়ে যাবে।

অন্য মেগা প্রকল্পগুলোও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। সেগুলো বাস্তবায়ন হলে জিডিপিতে আরও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ফলে জিডিপির আকার দুই অঙ্কে নিয়ে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার। আমাদের লক্ষ্য আছে ২০২৪ সালের মধ্যে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার দুই অঙ্কে নিয়ে যাওয়ার। দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যেভাবে এগোচ্ছে, সে ধারাবাহিকতা এবারের বাজেটেও অব্যাহত রাখা হবে।

যুগান্তর : মেগা প্রকল্পে অর্থছাড়ে কোনো সমস্যা থাকবে কি?

এমএ মান্নান : না, বাজেটে মেগা প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দের সমস্যা নেই, ছাড়েও কোনো সমস্যা নেই। তবে কথা হচ্ছে, শুধু বরাদ্দ দিলেই তো হবে না। সেটি ব্যয়ের সক্ষমতাও তো থাকতে হবে। আমরা সক্ষমতা বিবেচনা করেই প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা যা চেয়েছে, তা-ই বরাদ্দ দিচ্ছি। বেশি বরাদ্দ দিলেও সে অর্থ খরচ হয় না। এ কারণে এবার প্রকল্পের চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে।

এতে বরাদ্দ কম মনে হতে পারে। বাকি অর্থ অন্য প্রকল্পে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ফলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে বৈচিত্র্যময় প্রভাব পড়ছে। যে কারণে কোনো একটি খাতে বিপর্যয় দেখা দিলেও সার্বিক অর্থনীতিতে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না। যুগান্তর : এডিপির আকারের তুলনায় বাস্তবায়নের সক্ষমতা বাড়ছে না। এজন্য কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

এমএ মান্নান : এডিপির আকার খুব বেশি যে বেড়েছে তা নয়। তবে কিছুটা বেড়েছে। বাজেটের আকারের তুলনায় সমন্বয় রেখেই এডিপির আকার বাড়ানো হয়েছে। সেই সঙ্গে এডিপি বাস্তবায়নে আমাদের সক্ষমতাও আগের চেয়ে বহুগুণে বেড়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বাড়ার কারণে কাজেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। ফলে ধীরে ধীরে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ছে।

আগে কোনো প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে শেষ হতো না। এখন নির্ধারিত সময়ের আগেই অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। এটি একটি ইতিবাচক দিক। যেসব প্রকল্প নির্ধারিত সময়ের আগে শেষ হচ্ছে, সেগুলোর কারণ বিশ্লেষণ করে এসব অভিজ্ঞতা অন্য প্রকল্পের ক্ষেত্রে কাজে লাগানো হচ্ছে। ফলে অন্য প্রকল্পেও বাস্তবায়নের গতি এসেছে।

তাছাড়া আমরা প্রকল্পের বাস্তবায়ন বড়াতে নানা উদ্যোগ নিয়েছি। বিভাগীয় পর্যায়ে বৈঠক করার মধ্য দিয়ে প্রকল্প পরিচালকদের সঙ্গে একটি নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন করছি। সুতরাং আশা করছি আগামী অর্থবছরের বাজেটে এডিপিতে যা বরাদ্দ থাকছে, তার ব্যয়ও আশানুরূপ হবে।

যুগান্তর : বাজেটের ব্যয়ের মান বাড়াতে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?

এমএ মান্নান : এবারের বাজেটে এ ব্যাপারে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। প্রকল্পের প্রথম পর্যায়েই ব্যয়ের মান তদারকি করা হচ্ছে। এতে এখন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। অ্যাপের মাধ্যমেও প্রকল্প তদারকি করা হবে। ফলে প্রকল্পের কোথায় কত খরচ হচ্ছে, এর মান কেমন- এসব সহজেই জানা যাবে। কোনো সমস্যা হলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে শুরুতেই। ব্যয়ের মান নিয়ে তদারকি বাড়ানো হলে এ খাতে স্বচ্ছতা ফিরে আসবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×