বাংলাদেশ ব্যাংকে জরুরি বৈঠক

খেলাপি ঋণ কমাতে কড়াবার্তা

বিশেষ কমিটি গঠিত * খেলাপি ঋণ সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার নির্দেশ * মাত্রাতিরিক্ত খেলাপি ঋণ থাকায় ৭ ব্যাংকের এমডিকে জরুরি তলব

  হামিদ বিশ্বাস ১২ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খেলাপি ঋণ কমাতে কড়াবার্তা

অস্বাভাবিক হারে বাড়তে থাকা খেলাপি ঋণ কমাতে এবার বিশেষ কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের একজন প্রতিনিধির নেতৃত্বে এ কমিটি গঠন করা হয়েছে।

খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণ ও তা কমানোর জন্য সুপারিশসহ দ্রুততম সময়ে এ কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অনুষ্ঠিত এক জরুরি বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাত বিভাগের প্রতিনিধিকে কমিটির সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে বলে বৈঠক সূত্র জানায়। বৈঠকে যেসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ডাবল ডিজিটে রয়েছে, তাদেরকে অনতিবিলম্বে সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনার নির্দেশ দেয়া হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব মো. আসাদুল ইসলাম, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামান ও আহমেদ জামাল, তিনজন নির্বাহী পরিচালক, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের এমডি-ডিএমডিসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন- এখন থেকে খেলাপি ঋণ এক টাকাও আর বাড়বে না। খেলাপি ঋণ যাতে আর না বাড়ে সে বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু গত মার্চের খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশ হওয়ার পর দেখা যায় খেলাপি ঋণ বেড়ে এই প্রথমবারের মতো লাখ কোটি টাকা ছাড়াল। এখন তা বেড়ে ১ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

গত বছরের ডিসেম্বরে ছিল ৯৩ হাজার ৯১১ কোটি টাকা। গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত এই তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। গণমাধ্যমে মঙ্গলবার এসব তথ্য পেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ও খেলাপি ঋণ বাড়ার বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জানতে চায়। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ বিষয়ে জরুরি বৈঠক আহ্বান করে। ওই বৈঠকে অংশ নিতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঠানো হয়। উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে তিনি ওই বৈঠকে অংশ নেন। সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্ষদ সভা ছাড়া নিয়মিত কোনো বৈঠকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা অংশ নেন না।

মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈঠক সূত্র জানায়, খেলাপি ঋণ বাড়ার কারণ ও এই প্রবণতা কীভাবে কমানো যায় সে বিষয়গুলো নিয়েই বৈঠকে বেশি আলোচনা হয়েছে। খেলাপি ঋণ বেশি বেড়েছে- এমন ৭টি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের জরুরি ভিত্তিতে এ বৈঠকে ডাকা হয়। এর মধ্যে সরকারি চারটি ও বেসরকারি তিনটি ব্যাংক রয়েছে।

বৈঠকে ব্যাংকগুলোর কাছে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণ এবং কমানোর উপায় নিয়ে জানতে চাওয়া হয়। জবাবে ব্যাংক নির্বাহীরা বলেছেন, বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে সব সময়ই খেলাপি ঋণ বাড়ে। শেষ প্রান্তিকে তা কমে যায়।

বছরের শুরুতেই খেলাপি ঋণের বিধিবিধানগুলো ব্যাংক কঠোরভাবে প্রয়োগ করেছে। ফলে নতুন করে অনেকে খেলাপি হয়েছেন। এসব কারণেই এটি বেড়েছে। তারা আরও জানান, খেলাপি ঋণের নতুন নীতিমালা আগামী এপ্রিল-জুন প্রান্তিক থেকে কার্যকর হবে। এর ফলে জুনে এর পরিমাণ কমে যাবে। কেননা, নতুন নীতিমালায় কোনো ঋণ খেলাপি হওয়ার ক্ষেত্রে ৩ থেকে ৯ মাস অতিরিক্ত সময় লাগবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, সব সময় বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) খেলাপি ঋণ কিছুটা বেড়ে যায়। এ ছাড়া অনেক ব্যাংকের বিভিন্ন ঋণের ওপর স্থগিতাদেশের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ওই সব ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে। আবার দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) খেলাপি ঋণ যথেষ্ট পরিমাণে কমে আসবে। তবুও খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যাংকগুলোকে তাগিদ দিয়েছেন গভর্নর।

জানা গেছে, খেলাপি ঋণ কমাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগসহ, ডিপার্টমেন্ট অব অফসাইট সুপারভিশন, ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ কাজ করবে। তারা এ ব্যাপারে অচিরেই একটি নীতিমালা তৈরি করে কাজ শুরু করবে।

সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ যুগান্তরকে বলেন, বছরের প্রথম প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ সব সময় বাড়ত। এটা নতুন কিছু নয়। আবার দ্বিতীয় প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কিছুটা কমে যায়।

এখন বাজেট ঘোষণার আগে এমন চিত্র প্রকাশ পাওয়ায় সবাই একটু বিব্রত। সে কারণে খেলাপি ঋণ কীভাবে আরও কমিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে গভর্নর কয়েকজন এমডির সঙ্গে বসে আলাপ-আলোচনা করেছেন। খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার বিষয়ে গভর্নরের সঙ্গে আমরাও ঐকমত্য পোষণ করেছি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ব্যাপক অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতাসহ নানা কারণে ধারাবাহিকভাবে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। এর আগে বিশেষ সুবিধায় ঋণ পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন করা হলেও সেসব ঋণের বেশিরভাগই আবার খেলাপি হয়ে পড়ছে। এ রকম পরিস্থিতে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। তবে তা না করে ঋণখেলাপিদের একের পর এক সুবিধার মাধ্যমে নতুন করে ঋণ নেয়ার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। এ রকম পরিস্থিতিতে বাজারে একদিকে তারল্য সংকট, অন্যদিকে হুহু করে বাড়ছে সুদের হার।

এ বিষয়ে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবদুছ ছালাম আজাদ যুগান্তরকে বলেন, খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় বেশ কয়েকটি ব্যাংকের এমডিকে ডাকা হয়েছে। এটি কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, সে বিষয়ে বিশেষ তাগিদ দেয়া হয়েছে।

অপর একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় সতর্ক করা হয়েছে। কীভাবে এটি আরও কমিয়ে আনা যায়, সে ব্যাপারে সবাইকে সজাগ এবং সচেতনভাবে কার্যকরী উদ্যোগ গ্রহণ করতে বলা হয়েছে।

ব্যাংক খাতের উচ্চ খেলাপি ঋণ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা করছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা। তাদের সমালোচনার মুখে খেলাপি ঋণ কমানোর একটা উপায় বের করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। গত ১৬ মে ঋণ পুনঃতফসিল ও এককালীন জমার শর্ত শিথিল করে বিশেষ নীতিমালা জারি করা হয়। ওই নীতিমালা অনুযায়ী, মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ৯ শতাংশ সুদে ১০ বছরে (এক বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ) ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধা দেয়া হয়।

২০১৮ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক মন্দমানের শ্রেণীকৃত ঋণ এ সুবিধা পাবে। তবে সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশন গত ২১ মে ওই সার্কুলারের কার্যকারিতার ওপর আগামী ২৪ জুন পর্যন্ত স্থিতাবস্থা জারি করায় আপাতত সে সুবিধা নিতে পারেননি খেলাপিরা। এই সুবিধা নিতেও অনেকে ইচ্ছে করে খেলাপি হয়েছেন বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×