মধ্যবিত্তের ওপর করের খড়্গ

৫ মৌলিক চাহিদার ৩টিতেই কর বেড়েছে * চাপে পড়বে প্রায় ৪ কোটি মানুষ * এ ধরনের পদক্ষেপ সাম্যনীতির পরিপন্থী -মন্তব্য অর্থনীতিবিদদের

  মনির হোসেন ও সাদ্দাম হোসেন ইমরান ১৬ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মধ্যবিত্ত

প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে রাজস্ব আয় বাড়ানোর জন্য যেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তাতে মধ্যবিত্তরা চাপে পড়বে। ৫টি মৌলিক চাহিদার ৩টির বিপরীতেই কোনো না কোনোভাবে কর বাড়ানো হয়েছে।

বরাদ্দের ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এতে প্রায় ৪ কোটি মানুষের জীবনযাত্রার খরচ অনেকাংশেই বাড়িয়ে দেবে।

সুনির্দিষ্টভাবে এবারের বাজেটের যেসব উদ্যোগ মধ্যবিত্তকে চাপে ফেলবে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- করমুক্ত আয়ের সীমা না বাড়ানো, টেলিফোনে কথা বলার ওপর সম্পূরক শুল্ক বৃদ্ধি, পোশাকে ভ্যাট বাড়ানো, সঞ্চয়পত্রের মুনাফায় উৎসে কর বাড়ানো এবং খাদ্যপণ্যে ট্যারিফ মূল্য বিলুপ্ত। এছাড়া পুরো বাজেটে প্রত্যক্ষ করের চেয়ে পরোক্ষ করে বেশি জোর দেয়া হয়েছে, যা ভোক্তা শ্রেণীর ব্যয় বাড়াবে। তবে তুলনামূলকভাবে উচ্চ ও নিম্ন আয়ের মানুষকে সুবিধা দেয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ অর্থনীতির সাম্যনীতির পরিপন্থী। অন্যদিকে ব্যয়ের ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তদের গুরুত্ব কম।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাজেটে সম্পদশালীদের সুবিধা দেয়া হয়েছে। গরিব মানুষের জন্য প্রান্তিকভাবে এক ধরনের ব্যবস্থা থাকছে। কিন্তু বাংলাদেশের বিকাশমান মধ্যবিত্তরা চাপে পড়বে। তিনি বলেন, চিন্তা-চেতনা, বুদ্ধিমত্তা এবং উপার্জনের বিবেচনায় বিকাশমান মধ্যবিত্ত অর্থনীতির চালিকাশক্তি। কিন্তু সেই চালিকাশক্তিকে পরিপালন না করা ইশতেহারের চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এছাড়া এটি রাজনৈতিক দলের আদর্শ এবং ভোটের ভিত্তির পরিপন্থী। নাগরিক হিসেবে আমাদের জন্য এটি অত্যন্ত দুশ্চিন্তার বিষয়। তিনি আরও বলেন, রাজনীতিবিদরা ভোটের কারণে নিম্নবিত্তদের গুরুত্ব দেন। আবার নির্বাচনের টাকা সংগ্রহের জন্য সম্পদশালীদের গুরুত্ব দেন। কিন্তু শিক্ষিত বিকাশমান মধ্যবিত্তের ভূমিকাকে এখনও মূল্যায়ন করেন না। এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে সুষ্ঠু অর্থনীতি বিকাশ এবং শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নসহ সমাজে কাঙ্ক্ষিত ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে না।

অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, যাদের দৈনিক আয় ১০ থেকে ৪০ ডলারের মধ্যেই, তারাই মধ্যবিত্ত। তবে আর্থিক সক্ষমতার পাশাপাশি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, সামাজিক মর্যাদা, মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক সুযোগ-সুবিধাকেও মানদণ্ডে আনতে হবে। ওই বিবেচনায় বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের সংখ্যা ৪ কোটির মতো।

স্বাভাবিক নিয়মে প্রতি বছর বাজেটেই আয় বাড়াতে হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আয় বাড়াতে সরকার মধ্যবিত্তকেই বেছে নিয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে সবচেয়ে বেশি জোর দেয়া হয়েছে পরোক্ষ করের ওপর। অর্থাৎ মোট জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে (এনবিআর) আদায় হওয়া ৩ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার করের মধ্যে ভ্যাট থেকে আসবে ১ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। আর তা নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের কাছ থেকে আদায় করা হবে। এ বছরও আয় বাড়ানোর ক্ষেত্রে মধ্যবিত্তদের টার্গেট করা হয়েছে।

১. ব্যক্তি শ্রেণীর ন্যূনতম করসীমা ২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির বার্ষিক আয় এই টাকার বেশি হলে তাকে কর দিতে হবে। এমনিতেই উচ্চ পণ্যমূল্যের কারণে মানুষের খরচ বাড়ছিল। এ অবস্থা মধ্যবিত্তদের স্বস্তি দিতে এই সীমা কিছুটা বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল অর্থনীতিবিদ এবং বিভিন্ন সংগঠন। কিন্তু সরকার সেটি আমলে নেয়নি।

২. মধ্যবিত্তের উল্লেখযোগ্য একটি অংশের আয়ের অন্যতম উৎস হল সঞ্চয়পত্র। প্রস্তাবিত বাজেটে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এটি মধ্যবিত্তের আয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।

৩. নিত্যব্যবহার্য পোশাকের ওপর ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে। কেউ পোশাক কিনলে চলতি অর্থবছরে মোট দামের ৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে তা আরও আড়াই শতাংশ বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। এছাড়া পোশাক তৈরির ক্ষেত্রে দর্জির দোকানের মূল্য পরিশোধের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে।

৪. মোবাইল ফোনে কথা বলার ওপর সম্পূরক শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এতে মোবাইল ফোনে কথা বলার খরচ বাড়বে। এছাড়া স্মার্টফোন আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হয়েছে।

৫. সিনেমা দেখার ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। যা আগে ছিল না, এতে সিনেমা দেখার টিকিটের মূল্য বাড়বে।

৬. গাড়ি নিবন্ধের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এটি আগে ছিল না।

৭. চলতি অর্থবছরে ল্যাপটপ কিনলে কর ছাড় পাওয়া যেত। প্রস্তাবিত বাজেটে এই কর অব্যাহতির সুযোগ তুলে দেয়া হয়েছে।

৮. চলতি অর্থবছরের বাজেটে ভোজ্যতেলে ভ্যাট অব্যাহতি ছিল। নতুন বাজেটে এই অব্যাহতির সুযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া শিশুখাদ্য গুঁড়োদুধ আমদানিতে শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এতে এই দুধের দাম বাড়তে পারে। আইসক্রিমের ওপর ৫ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বসানো হয়েছে। এতে বাড়বে আইসক্রিমের ওপরও।

৯. মানুষের খাদ্য তালিকার অন্যতম একটি পণ্য চিনি। বছরে চাহিদা প্রায় ১২ লাখ টন। এর সবচেয়ে বড় ভোক্তা মধ্যবিত্ত শ্রেণী। চলতি অর্থবছরের বাজেটে চিনি আমদানির ওপর ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটন ‘র’ চিনি আমদানির শুল্ক ২ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ হাজার এবং পরিশোধিত চিনির আমদানি শুল্ক ৪ হাজার ৫শ’ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। এতে খুচরা পর্যায়ে চিনির দাম বেড়েছে।

১০. মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্যতম খাত আবাসন বা বাড়ি। আর বাড়ি নির্মাণে মৌলিক পণ্য রড। চলতি অর্থবছরের বাজেটে প্রতি টন রডে ৯শ’ টাকা ভ্যাট রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে তা বাড়িয়ে ২ হাজার টাকা করা হয়েছে। এতে সামগ্রিকভাবে বাড়ি নির্মাণ ও ফ্ল্যাটের দাম বাড়বে।

১১. মধ্যবিত্তের যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যমে সিএনজিচালিত অটোরিকশা। প্রস্তাবিত বাজেটে সিএনজি, মোটরসাইকেল এবং বেবিট্যাক্সির টায়ার-টিউবের ওপর আমদানি শুল্ক ৩ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে।

এছাড়া বাজেটে ভ্যাট ও শুল্ক বাড়ানোর কারণে আরও যেসব পণ্যের দাম বাড়বে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- ফলের জুস, গুঁড়োদুধ, বডি স্প্রে, আইসক্রিম, চশমা ও সানগ্লাস, বিড়ি-সিগারেট, ঘরের অ্যালুমিনিয়াম পণ্য, লঞ্চের কেবিন, মধু, জলপাইয়ের তেল, এলপি গ্যাস, আচার, চাটনি, টমেটো কেচাপ, ফলের জুস, কাগজ, টয়লেট টিস্যু। কারণ এসব পণ্যে আগে ট্যারিফ মূল্য ছিল। এখন ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। অন্যদিকে এশিয়ার যে কোনো দেশ থেকে আমদানি করা এয়ারফ্রেশনার, টয়লেট সাবান, মশার কয়েল, এরোসল, সুপারি, চকোলেট, বিস্কুট, পটেটো চিপস, ফলের জুস, লিপস্টিক, আই শ্যাডো, আইলাইনার, আইব্রো, মাশকারা, পাউডার, ফেসক্রিম, শ্যাম্পু, কন্ডিশনার, টুথপেস্ট, শেভিং জেল, আফটার সেভ লোশন, স্যানিটারি ওয়্যার, টেবিল ওয়্যার, রেজার, মোটরসাইকেল ও দরজার তালা, সুইস সকেট, শেভার এবং শেভিং জেলের দাম বাড়বে। কারণ এশিয়া অঞ্চল থেকে আমদানি করা এসব পণ্যের ন্যূনতম মূল্য বাড়ানো হয়েছে।

জানতে চাইলে সিপিডির ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাজেটে প্রত্যক্ষ করের (আয়কর) তুলনায় পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীলতা বেশি। পরোক্ষ করের চাপ নিম্ন-মধ্যবিত্তের ওপর বেশি পড়ে। সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়ায়। ফলে সাম্যভিত্তিক করের দর্শনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

অন্যদিকে ব্যয়ের ক্ষেত্রেও মধ্যবিত্তদের গুরুত্ব দেয়া হয়নি। সিপিডির পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, মধ্যবিত্তদের ব্যয়ের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে। উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, দেশে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ালে সেই সুযোগ মধ্যবিত্তরা পায়। কারণ গরিবের সন্তানরা প্রাইমারি শিক্ষার পর ঝরে যায়। ধনীদের সন্তানরা দেশের বাইরে পড়াশোনা করে। ফলে দেশের শিক্ষার সুবিধা মধ্যবিত্তরাই পায়। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ ওইভাবে বাড়ানো হয়নি। এক্ষেত্রে শিক্ষার সঙ্গে প্রযুক্তি যোগ করে বাজেট বড় করে দেখানো হয়েছে। এছাড়া ধনীরা সব সময়ই দেশের বাইরে চিকিৎসা নেয়। ফলে স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের সুবিধা মধ্যবিত্তরাই পায়। কিন্তু এ খাতেও ওইভাবে বরাদ্দ বাড়ানো হয়নি।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×