ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন

শিল্পে আগাম কর কেন

বাড়বে উৎপাদন ব্যয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যও বাড়বে * যে কর আদায়ের পর ফেরত দেয়া হবে, সেটা আদায়ের দরকার কী? -সিদ্দিকুর রহমান

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

প্রস্তাবিত ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পদক্ষেপ তো নেই, উল্টো শিল্প উদ্যোক্তাদের ঘাড়ে আগাম করের (এটি) বোঝা চাপানো হয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর ৫ শতাংশ আগাম কর পরিশোধের বিধান চালু করায় শিল্প স্থাপন ও উৎপাদন ব্যয় দুটোই বহুলাংশে বাড়বে। যা সরকারের ব্যবসা সহজ করার (ইজ অব ডুয়িং বিজনেস) নীতির পরিপন্থী। শুধু তাই নয়, খাদ্যদ্রব্য যেমন ডাল, গম, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল, সার-বীজ আমদানিতেও আগাম কর আরোপ করা হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও এনবিআর বলছে, আমদানির সময় পরিশোধিত আগাম কর পরবর্তী মাসের ভ্যাট রিটার্নের সঙ্গে সমন্বয় করার বিধান রাখা হয়েছে।

তবে ভুক্তভোগীদের অনেকে যুগান্তরকে জানিয়েছেন, এভাবে আগাম কর নেয়া হয়রানি ছাড়া আর কিছু নয়। এছাড়া যদি ফেরতই দেয়া হবে, তাহলে আগাম নেয়া হবে কেন? এতে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প প্রতিষ্ঠান আরও পিছিয়ে পড়বে। তারা এর প্রত্যাহার চান। সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে দেশের কাস্টম হাউসগুলোতে এই আগাম কর আদায় শুরু হয়েছে। আছে নানান বিভ্রান্তিও। তবে ব্যবসায়ীরা এ নিয়ে চরম ক্ষোভ-অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। অবিলম্বে তারা এর প্রত্যাহার চান।

প্রসঙ্গত, প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থ আইনের মাধ্যমে নতুন ভ্যাট আইনের ৩১ ধারা সংশোধন করে সব ধরনের আমদানি পণ্যের ওপর ৫ শতাংশ হারে আগাম কর আরোপ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, করযোগ্য আমদানির ওপর ৫ শতাংশ আগাম কর আদায় করতে হবে। প্রত্যেক নিবন্ধিত আমদানিকারক নির্ধারিত পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট কর মেয়াদে মূসক দাখিলপত্রে পরিশোধিত আগাম করের সমপরিমাণ অর্থ সমন্বয় করতে পারবেন। যারা নিবন্ধিত নন, তারা কমিশনারের কাছে আগাম কর ফেরত পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন।

জানা গেছে, পুরনো ভ্যাট আইনের আওতায় শুধু বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আমদানিকৃত ৬ হাজার ৫৪২টি পণ্যের ওপর ৫ শতাংশ অগ্রিম ট্রেড ভ্যাট (এটিভি) আরোপিত ছিল। মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শূন্য শুল্ক আরোপিত পণ্যে এটিভি দিতে হতো না। নতুন আইনের আওতায় অগ্রিম ট্রেড ভ্যাটের (এটিভি) পরিবর্তে একই হারে আমদানি পর্যায়ে অগ্রিম কর (এটি) আরোপ করা হয়। কিন্তু নতুন আইনে আগাম করের আওতা ব্যাপকভাবে বিস্তৃত করে মূলধনী যন্ত্রপাতি, ভোগ্যপণ্যের ওপরও ৫ শতাংশ আগাম কর আরোপ করা হয়েছে। রোববার চট্টগ্রাম কাস্টমস ও বেনাপোল কাস্টমসে মূলধনী যন্ত্রপাতিসহ ভোগ্যপণ্য খালাসে আগাম কর দিতে হয়েছে।

মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি সংক্রান্ত কাস্টমসের একটি প্রজ্ঞাপনে দেয়া এইচএস কোডের তালিকা অনুযায়ী স্থানীয় উদ্যোক্তারা ১ শতাংশ শুল্ক দিয়ে ৬৫৯ ধরনের যন্ত্রপাতি আমদানি করতে পারতেন। এর বাইরে অন্য কোনো কর দিতে হতো না। কিন্তু এখন আমদানি পর্যায়ে সব আইটেমের ওপর আগাম কর আরোপ করায় স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মূলধনী যন্ত্রপাতি আনতে বিদ্যমান ১ শতাংশ শুল্কের সঙ্গে বাড়তি ৫ শতাংশ ভ্যাট (আগাম কর) দিতে হবে। এছাড়া শিল্পে ব্যবহৃত শূন্য শুল্কে আমদানিকৃত কাঁচামাল যেমন কাঁচা তুলা, ভিসকস ফাইবার, পলিয়েস্টার আমদানিতে ৫ শতাংশ আগাম কর আরোপ করা হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আগে ১ কোটি টাকার মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি করতে একজন শিল্প উদ্যোক্তাকে ১ লাখ টাকার শুল্ক দিতে হতো। বাজেটে আগাম কর আরোপ করায় ১ শতাংশ আমদানি শুল্কের সঙ্গে আরও অতিরিক্ত ৫ শতাংশ আগাম করসহ মোট ৬ শতাংশ শুল্ককর দিতে হবে। ফলে ১ কোটি টাকার মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে তার খরচ পড়বে ৬ লাখ টাকা।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআইর সহসভাপতি ও বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের ওপর আগাম কর আরোপ কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই কর পরবর্তীকালে দাখিলপত্রের সঙ্গে সমন্বয় করার কথা বলা হয়েছে। যেই কর আদায়ের পর ফেরত দেয়া হবে, সেটা আদায়ের দরকার কী? এটা (আগাম কর) নতুন ঝামেলার সৃষ্টি করবে। এসব হিসাব পরিচালনার জন্য লোক নিয়োগ করতে হবে। এতে শিল্পের ব্যয় বাড়বে।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান বলেন, শিল্পের জন্য আগাম কর সরকারের ইজ অব ডুয়িং বিজনেস নীতির পরিপন্থী। এতে নতুন করে জটিলতা দেখা দেবে। এর প্রয়োজন ছিল না। উদ্যোক্তাদের আগের নিয়মেই মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয়া উচিত বলে মনে করি।

যদিও এনবিআরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যুগান্তরকে জানিয়েছেন, আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট পরিশোধ করলেও পরবর্তী সময় রিটার্ন জমা দেয়ার সময় তা সমন্বয় করা যাবে। ফলে করের চাপ বাড়বে না। এমনকি অনিবন্ধিতদেরও আগাম কর ফেরত দেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেক্ষেত্রে নির্ধারিত পদ্ধতিতে কমিশনারের কাছে আবেদন করতে হবে।

ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের অসন্তোষ : এদিকে চট্টগ্রাম ও বেনাপোল কাস্টমস বাজেট ঘোষণার পরপরই খাদ্যপণ্য ও শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি খালাসের সময় আগাম কর আদায় শুরু করেছে। এতে ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানির ক্ষেত্রে ‘অ্যাডভাঞ্চ ট্যাক্স’ আরোপের বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখছেন না। তিনি বলেছেন, এটি যদি হয়ে থাকে তবে তা শিল্পায়নের পথে অন্তরায় হবে বলে মনে করি। তবে এখনও আমরা এ বিষয়টি নিয়ে অস্পষ্টতার মধ্যে রয়েছি। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বলছে, প্রস্তাবিত বাজেটের কোনো কোনো অংশে কারেকশন হচ্ছে। ঘোষিত বাজেট চূড়ান্ত হওয়ার পরই মন্তব্য করা যাবে।’

খাতুনগঞ্জের ভোগ্যপণ্য ব্যবসায়ী ও বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, যেসব ভোগ্যপণ্য শূন্য শুল্কে আমদানি করা হয় সেসব পণ্যের ওপর যদি নতুন করে শুল্ক আরোপ করা হয় তবে তা হবে আত্মঘাতী। উপস্থাপিত বাজেটে ভোগ্যপণ্যের ওপর ৫ শতাংশ আগাম করের কথা বলা হলেও বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে, শূন্য শুল্কে যেসব ভোগ্যপণ্য আমদানি হয় সেসব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে নতুন করে কোনো কর দিতে হবে না। আমরা এ নিয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে রয়েছি।’

চট্টগ্রাম সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসেন বাচ্চু রোববার যুগান্তরকে বলেন, ক্যাপিটাল মেশিনারিজ ও ভোগ্যপণ্যসহ যেসব পণ্যের ওপর আগাম কর প্রস্তাব করা হয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস ইতিমধ্যে সেসব পণ্যের ওপর প্রস্তাবিত কর নেয়া শুরু করে দিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেনাপোল সিএন্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান স্বজন যুগান্তরকে বলেন, রোববার সব ধরনের ভোগ্যপণ্যের ওপর কাস্টমস ৫ শতাংশ আগাম কর আদায় করেছে।