নানা ছুতোয় বিদ্যুৎ বিভ্রাট, দায়িত্বশীলরা নির্বিকার

ষড়যন্ত্রের ফাঁদে ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ লাইন

হবিগঞ্জে বৈদ্যুতিক লাইন নিয়ে আরইবি-পিডিবির নানামুখী চক্রান্ত * বিদ্যুৎ গেলেই কেমিক্যাল-মেশিনারিজ নষ্ট, বাড়ছে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৭ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিদ্যুত

মহলবিশেষের ষড়যন্ত্রের ফাঁদে আটকা পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ ও সঞ্চালন খাত। বিশেষ করে যেসব এলাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, সেখানে চলছে নানামুখী চক্রান্ত। যাদের উদ্দেশ্য হল- যেনতেন ছুতোয় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটিয়ে দেশের অগ্রসরমান শিল্পের লাগাম টেনে ধরা।

ভুক্তভোগী ও বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে একটি চক্র দীর্ঘদিন থেকে দেশের স্বার্থবিরোধী এ ধরনের কাজে যুক্ত। যারা আগে বিদ্যুৎ ঘাটতির অজুহাতে নানা টালবাহানা করত, এখন প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জিত হলেও তারা নতুন করে এ সেক্টর নিয়ে ষড়যন্ত্রের ফাঁদ পেতেছে। ফলে বেসরকারি খাতে সরকারের বিনিয়োগ নীতি সহায়তা চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া শিল্পোদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীদের ক্ষতি তো সীমাহীন। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ না পেয়ে অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যা দেখা দিয়েছে সিলেট বিভাগের বেশির ভাগ জেলায়। বিশেষ করে হবিগঞ্জ, শাহজীবাজার, মাধবপুর, বেজুড়াজুড়ে ৩৩ কেভি লাইনে চরম বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। প্রতিদিনই গড়ে ২-৩ বার বিদ্যুৎ যাচ্ছে। গাছের ডালপালার আঘাত এমনকি ছোটখাটো পাখির ঝাপটায়ও ট্রিপ করছে (গ্রিড স্টেশনের সার্কিট পড়ে যাওয়া) গ্রিডলাইন। ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলে এমনকি ঝড় শুরুর আগেই রহস্যজনক কারণে সুইচ অফ করে দিচ্ছে লাইনের। আবার কিছুদিন পরপর মেনটেন্যান্সের কথা বলে ২-৩ ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখছে। স্থানীয়রা বলেছেন, ৩৩ কেভি লাইনের বেশির ভাগ গ্রাহকই হচ্ছে শিল্প-কলকারখানার। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা পেতে তারা এই লাইন থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়ে এখন পথে বসার উপক্রম হয়েছে। অথচ বিদ্যুৎ বিভাগের দুটি কোম্পানি পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এ নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই। তাদের এই অহেতুক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে শিল্প-কলকারখানার অত্যাধুনিক মেশিনারিজগুলোর সিস্টেম এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। দফায় দফায় বিদ্যুৎ ট্রিপ করায় অনেক প্রতিষ্ঠানে পুরো মেশিনারিজ সিস্টেম অকেজো হওয়ার পথে। নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান কেমিক্যাল।

গ্রাহকদের পক্ষ থেকে এ নিয়ে আরইবি ও পিডিবির শীর্ষ কর্মকর্তাদের অসংখ্যবার অভিযোগ জানানো হলেও তারা কোনো কর্ণপাত করছেন না। গ্রাহকদের অভিযোগ, এটা শিল্প-কারখানা ধ্বংসের গভীর ষড়যন্ত্র। দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। দেশি-বিদেশি একটি চক্র আরইবি ও পিডিবির কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এই ষড়যন্ত্র চলছে। খোঁজ নিয়ে ও ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভাগের যেখানেই শিল্প-কারখানা বেশি সেখানেই চলছে এই ষড়যন্ত্র।

বিভিন্ন ব্যবসায়িক সংগঠনের নেতা এবং এ সেক্টরের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সরকার ২০২১ সালের মধ্যে দেশকে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করতে চাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হল, কিভাবে মধ্যম আয়ের দেশ হবে? তারা মনে করেন, এজন্য সবার আগে দেশব্যাপী ব্যাপক হারে শিল্প-কারখানা গড়ে তুলতে হবে। এ সেক্টরে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। অন্যথায় কর্মসংস্থান হবে না। কর্মসংস্থান বাড়াতে না পারলে কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জন হবে না। আর শিল্পোৎপাদন বাড়াতে হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনিয়োগকারীদের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ-গ্যাস সুবিধা দিতে হবে। তারা বলছেন, সরকার একদিকে বলছে বিনিয়োগ বাড়াতে। অন্যদিকে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ থাকার পরও যারা শিল্প-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দিচ্ছে না তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

তাদের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রীর টার্গেট অকার্যকর করতে একটি শক্তিশালী চক্র অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করেছে। অনেকে মনে করেন, যারা বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে অনিয়ম করছে তারা শুধু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র নয়, খোদ প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধেই ষড়যন্ত্র করছে। কেননা প্রধানমন্ত্রীর এই টার্গেট বাস্তবায়ন করতে হলে দেশে শিল্প বিপ্লব ঘটাতে হবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের মধ্যে বড় বড় সফল শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠুক, তা চক্রান্তকারীরা চায় না। তারা চায়, বাংলাদেশ যেন শিল্পে কোনোদিন স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে না পারে। পরনির্ভরশীল করে রাখতে চায়।

তাদের মতে, শিল্প খাত হল অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এ খাতকে বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন আশা করা যায় না। অথচ শিল্প প্রতিষ্ঠানে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা দেয়া নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো উদ্যোগই নিচ্ছে না। দেশে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ থাকলেও এই বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য টেকসই বিতরণ ও সঞ্চালন লাইন নির্মাণ ও এক্সটেনশনের কোনো উদ্যোগ নেই। এখন প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও সে হারে সঞ্চালন ও বিতরণ লাইন নির্মাণ করা হয়নি।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশ যাতে শিল্প ও বিনিয়োগে এগোতে না পারে সেজন্য অনেক আগে থেকেই একটি চক্র ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। বস্তুত এরা সরকারকেও বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করছে।

অভিযোগ আছে, এ চক্রটি ইচ্ছাকৃতভাবে বারবার বিদ্যুতের লোডশেডিং করে, লাইন ট্রিপ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গতি মন্থর করে রেখেছে। যেখানে ৩৩ কেভি লাইনে বিদ্যুৎ যাওয়ারই কথা নয়, সেখানে প্রতিদিনই লাইন ট্রিপ হচ্ছে, সুইচ অফ করে দিয়ে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা পরিকল্পিত লোডশেডিং করা হচ্ছে। জানা গেছে, সিলেট বিভাগের কয়েকটি জেলায় যেসব শিল্প-কারখানা ১১ কেভি লাইন থেকে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েছে সেগুলোর অধিকাংশই বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কারণ ১১ কেভি লাইনে আরও বেশি বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে।

এমন অভিযোগও আছে, এ চক্রটির সঙ্গে একটি বিদেশি মহলের যোগসাজশ রয়েছে। দেশীয় শিল্পের বিকাশ ঠেকাতে ষড়যন্ত্রকারীরা নানাভাবেই তৎপর রয়েছে। দেশের শিল্প-কারখানা ধ্বংস করে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের পথ বন্ধ করে দিয়ে তারা দেশকে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে চায়। বিশেষজ্ঞরা দ্রুত এদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেটের বিভিন্ন জেলায় দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনের কারণে শিল্প-কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ১১ কেভি লাইনের পাশাপাশি ৩৩ কেভি লাইনেও হরহামেশা বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে। যেটি হওয়ার কথা নয়।

তবে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর অভিযোগ, তাদের হাতে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ থাকলেও দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ বিতরণ ও সঞ্চালন লাইনের কারণে উৎপাদিত বিদ্যুৎ লাইনে দিতে পারছে না।

শিল্প-কারখানা পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, বারবার বিদ্যুৎ গেলে অত্যাধুনিক মেশিনারিজগুলোর সিস্টেম এলোমেলো ও হ্যাং হয়ে যাচ্ছে। একপর্যায়ে ওই মেশিনারিজগুলো অকেজো ও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এছাড়া যতবার বিদ্যুৎ চলে যায় ততবারই কেমিক্যাল নষ্ট হয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়। এতে স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ছাড়াও নানামুখী ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি।

তারা জানান, বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদন বিঘ্ন ঘটে। এতে করে মান বজায় রেখে পণ্য উৎপাদন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। স্বনামধন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পণ্যের মান শতভাগ নিশ্চিত রাখতে বারবার কেমিক্যাল পরিবর্তন করতে হয়। এর ফলে বিপুল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে শিল্প মালিকদের।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×