ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া

আগাম কর প্রত্যাহার না হলে বন্ধ হবে শিল্পপ্রতিষ্ঠান

বিষয়টি নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন, শিল্পকে উৎসাহ তো দেয়া হচ্ছেই না, উল্টো পদে পদে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে -ড. রুবানা হক

প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

পোশাক শিল্প। ফাইল ছবি

প্রস্তাবিত বাজেটে মূলধনী যন্ত্রপাতির ওপর আরোপিত আগাম করকে (এটি) শিল্পের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের মতে, উদ্যোক্তাদের যেখানে শিল্প স্থাপনে প্রণোদনা দেয়া উচিত, সেখানে জোর করে শিল্প খাতে আগাম করের অযৌক্তিক বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।

এটা দেশের অর্থনীতির জন্য শুভ ফল বয়ে আনবে না। তারা মনে করেন, বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। একটি কুচক্রী মহল নিজস্ব ফায়দা লোটার জন্য সরকার ও ব্যবসায়ীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানা প্রতিকূলতার মাঝে শিল্পে বিনিয়োগ করে অনেক কষ্ট করে উদ্যোক্তারা শিল্প টিকিয়ে রেখেছেন। স্থানীয় শিল্পকে সর্বপ্রথম কালোবাজারের মুখোমুখি হতে হয়। এ অসম প্রতিযোগিতার সঙ্গে লড়াই করে ৫ শতাংশ মুনাফা করা যায় না। বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসানে ব্যবসা করছে, কেউ আছে ব্রেক ইভেনে। এ অবস্থায় মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর আগাম কর আরোপ করা হলে উদ্যোক্তারা শিল্প বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবেন।

তারা বলছেন, ব্যবসায়ীদের যৌক্তিক দাবির ন্যায্যতা অনুধাবন করে হয়তো সরকার মূলধনী যন্ত্রপাতি ও শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর আগাম কর প্রত্যাহার করে নেবে। কিন্তু এই করের কারণে বাজেট ঘোষণার পর থেকেই ব্যবসায়ীদের হয়রানি হতে হচ্ছে, যা শিল্পের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে ব্যবসাবান্ধব হিসেবে দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে সুনাম কুড়ানো বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

এ বিষয়ে এফবিসিসিআই’র সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থবিলের মাধ্যমে কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর আইনে আনা পরিবর্তনগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ব্যবসাকে বাধাগ্রস্ত করে, এমন সব বিষয় নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। ইতিমধ্যেই ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর তরফ থেকে বেশকিছু বিষয় নজরে আনা হয়েছে। আগামী ২০ জুনের পর অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনায় বসবে এফবিসিসিআই।

এফবিসিসিআই’র সহসভাপতি ও বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের ওপর আগাম কর আরোপ কোনোভাবেই কাম্য নয়। এই কর পরবর্তীকালে দাখিলপত্রের সঙ্গে সমন্বয় করার কথা বলা হয়েছে। যেই কর আদায়ের পর ফেরত দেয়া হবে, সেটা আদায়ের দরকার কী? এটা নতুন ঝামেলার সৃষ্টি করবে। এসব হিসাব পরিচালনার জন্য লোক নিয়োগ করতে হবে। এতে শিল্পের ব্যয় বাড়বে।

বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক বলেন, আগাম করের বিষয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। শিল্পকে উৎসাহ তো দেয়া হচ্ছেই না, উল্টো পদে পদে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। দেশে উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে না, প্রতিদিন বিনিয়োগ কমছে। উদ্যোক্তাদের যেখানে শিল্প স্থাপনে প্রণোদনা দেয়া উচিত, সেখানে জোর করে শিল্প খাতকে আগাম কর নামক বোঝা চাপিয়ে কমপ্লায়েন্সে আনার যৌক্তিকতা নেই। বিদেশি কমপ্লায়েন্স শেষ করে এখন অভ্যন্তরীণ কমপ্লায়েন্স চাপ সামলানো শিল্পের জন্য ক্ষতির কারণ হবে।

বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, সাধারণত দেশে যেই পণ্য উৎপাদন হয়, সেই পণ্যকে সুরক্ষা দিতে আমদানি পর্যায়ে কর আরোপ করা হয়। শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি দেশে উৎপাদন হয় না, তারপরও এতে করের বোঝা চাপানো হয়েছে। এতে শিল্প স্থাপনের খরচ বহুগুণ বাড়বে। দেশের শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হবে।

রফতানিকারক সমিতির (ইএবি) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, দেশে এমনিতে বিনিয়োগ হচ্ছে না। বিগত দিনে মূলধনী যন্ত্রপাতির ওপর শুধু ১ শতাংশ আমদানি শুল্ক দিয়ে শিল্প উদ্যোক্তারা যন্ত্রপাতি আমদানি করত। প্রস্তাবিত বাজেটে আগাম কর বসিয়ে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। কোন যুক্তিতে মূলধনী যন্ত্রপাতিতে আগাম কর বসানো হল, সেটা বোধগম্য নয়। এটা দেশের অর্থনীতির জন্য শুভ ফল বয়ে আনবে না। বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। মনে রাখতে হবে, বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থান বাড়বে, সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়বে।

তিনি আরও বলেন, আগাম কর পরবর্তীকালে ভ্যাট রিটার্নের সঙ্গে সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু যারা রিটার্ন জমা দেন না, তারা কিভাবে ওই টাকা ফেরত পাবে। দীর্ঘদিন যাবৎ রফতানিমুখী শিল্পে গ্যাস-বিদ্যুৎ বিলের ওপর ভ্যাট অব্যাহতি আছে। নানা হয়রানির কারণে শিল্প উদ্যোক্তারা সেই টাকা ফেরত আনতেও যান না। তাই মূলধনী যন্ত্রপাতিতে আগাম কর প্রত্যাহার করা উচিত।

প্রসঙ্গত, প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থ আইনের মাধ্যমে নতুন ভ্যাট আইনের ৩১ সংশোধন করে সব ধরনের আমদানি পণ্যের ওপর ৫ শতাংশ হারে আগাম কর আরোপ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, করযোগ্য আমদানির ওপর ৫ শতাংশ আগাম কর আদায় করতে হবে। প্রত্যেক নিবন্ধিত আমদানিকারক নির্ধারিত পদ্ধতিতে সংশ্লিষ্ট কর মেয়াদে মূসক দাখিলপত্রে পরিশোধিত আগাম করের সমপরিমাণ অর্থ সমন্বয় করতে পারবেন। যারা নিবন্ধিত নয়, তারা কমিশনারের কাছে আগাম কর ফেরত পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবেন। ইতিমধ্যে এই হারে কর আদায়ও শুরু হয়েছে।