প্রস্তুত হচ্ছে আমলাদের বহুল প্রত্যাশিত ক্যারিয়ার প্ল্যান

এ মাসেই সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার সম্ভাবনা * গঠিত সচিব কমিটির চতুর্থ বৈঠক শিগগির * প্রধান লক্ষ্য : যোগ্যতা অনুযায়ী পোস্টিং এবং সচিব ছাড়া অবশিষ্ট পদে স্বাভাবিক পদোন্নতির সময়কাল নিশ্চিত করা * সেবাপ্রার্থীদের গুণগত সেবা নিশ্চিত করতে ব্যক্তির (কর্মকর্তার) ক্ষমতা হ্রাস করে সিস্টেমকে প্রাধান্য দেয়া

  বিএম জাহাঙ্গীর ১৮ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। ছবি: যুগান্তর

অবশেষে জনপ্রশাসনে কর্মরত আমলাদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত ক্যারিয়ার প্ল্যান আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা প্রণয়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. সোহরাব হোসাইনকে প্রধান করে পৃথক সচিব কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কমিটি ইতিমধ্যে তিন দফা বৈঠক করেছে। আরও কয়েকটি বৈঠক করে খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ চূড়ান্ত করা হবে। এমনটিই জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির প্রধান সিনিয়র সচিব সোহরাব হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, জনপ্রশাসনের জন্য ক্যারিয়ার প্ল্যান খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একটি গতিশলী প্রশাসন গড়ে তুলতে এ ধরনের প্ল্যানিং নীতি থাকার কোনো বিকল্প নেই।

বেশির ভাগ উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশে এর বাস্তব চর্চা রয়েছে। তিনি জানান, কয়েকটি মিটিং তারা করেছেন। কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। শিগগির পরবর্তী বৈঠকে বসবেন। প্রচেষ্টা থাকবে যত দ্রুত এটি শেষ করা যায়।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এর মূল উদ্দেশ্য হল, সিভিল সার্ভিসের একজন সেবক চাকরিতে প্রবেশের পর তিনি ধাপে ধাপে তার কাজের পরিধি সম্পর্কে যেমন সচেতন হবেন, তেমনি সে অনুযায়ী কাজের টার্গেট পূরণ সাপেক্ষে যথাযথ ফলাফলও দেখতে পাবেন।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ক্যারিয়ার প্ল্যানিং বাস্তবায়ন হওয়ার পর একজন কর্মকর্তা অতিরিক্ত সচিব পর্যন্ত পদোন্নতির গতিপথ আগেই জানতে পারবেন। তবে তাদের কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত সবই এখন খসড়া প্রস্তাব। এছাড়া এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটিতে।

প্রসঙ্গত, প্রশাসনের পেশাদার আমলারা ক্যারিয়ার প্ল্যান চান। এটি তাদের দীর্ঘদিনের চাওয়া। নানা নামে কয়েক দফা উদ্যোগ নিয়েও তা বেশিদূর এগোতে পারেনি। মূলত অফিসিয়াল ক্যারিয়ার প্ল্যান প্রণয়নের মাধ্যমে কর্মকর্তারা তাদের বাস্তব দক্ষতা যোগ্যতার প্রমাণ দিতে চান।

ফলাফলের ভিত্তিতে গতি বাড়াতে চান নিজের ক্যারিয়ারের একজন চৌকস আমলা উপসচিব হওয়ার পর যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত ও সচিবের ধাপে কবে নাগাদ পৌঁছে যাবেন সেটিও যেন নিশ্চিত বুঝতে পারেন।

এজন্য অনেক উন্নত দেশ আমলাতন্ত্রকে ঢেলে সাজিয়েছে। এতে করে প্রথমদিকে মানিয়ে নিতে কিছুটা কষ্ট হলেও এক পর্যায়ে হাতে ধরা দিয়েছে ব্যাপক সাফল্য। যেখানে দ্রুততম সময়ে সেবার মান শতভাগ নিশ্চিত করাসহ বেশির ভাগ পদে ব্যক্তির পরিবর্তে সিস্টেমকে মূল মন্ত্র হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে।

অর্থাৎ সেবা দেয়ার ক্ষেত্রে ব্যক্তির ক্ষমতা প্রয়োগ একেবারে সীমিত করে ফেলা। বিপরীতে সিস্টেম বা প্রণীত বিধিবিধানের প্রয়োগ নিশ্চিত করা। এভাবে সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম, কোরিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফিনল্যান্ডের মতো দেশ অনেক এগিয়ে গেছে। এমনকি পাশের দেশ ভারতেও এটি করায়ত্ত করা হচ্ছে। এজন্য প্রশাসনের বেশির ভাগ কর্মকর্তা অনুমোদিত ক্যারিয়ার প্ল্যান প্রত্যাশা করে আসছিলেন।

ড. সা’দত হুসেইন মন্ত্রিপরিষদ সচিব থাকাবস্থায় প্রশাসন সংস্কারে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া হয়। ক্লাস্টারভিত্তিক কর্মকর্তাদের পুল গড়ে তোলার উদ্যোগও নেয়া হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে দুই বছরের বেশি সময় কাজ করে তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের সিপিটি উইং। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি। ক্লাস্টারভিত্তিক কর্মকর্তাদের পুল বলতে কোনো কর্মকর্তা কর্মজীবনে যে বিষয়ে পারদর্শিতা বেশি দেখাতে সক্ষম, তাকে সেই কাজ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে রেখে দেয়া। এভাবে বিষয়ভিত্তিক বিষেশায়িত কর্মকর্তা পুল গড়ে তোলার কথা ছিল।

পরবর্তীকালে তৎকালীন সংস্থাপন মন্ত্রণালয় কর্মকর্তাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণের ধরন বিবেচনায় নিয়ে পদায়ন নীতিমালা করার উদ্যোগ নেয়। এজন্য সিপিটি উইং থেকে কর্মকর্তাদের এ সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে একটি ডিজিটাল অনলাইন ডাটাবেজ তৈরি করা হয়।

এ প্রক্রিয়ায় কিছু পোস্টিংও দেয়া হয়েছিল। কিন্তু নানামুখী তদবিরের চাপে শেষ পর্যন্ত যাকে যেখানে পোস্টিং দেয়া প্রয়োজন, তাকে সেখানে পদায়ন করা সম্ভব হয়নি। সূত্র জানায়, এ রকম নানান অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে প্রশাসনিক উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি একটি গণমুখী, দক্ষ ও জবাবদিহি সিভিল সার্ভিস গড়ে তুলতে যুগোপযোগী ক্যারিয়ার প্ল্যানিং প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়।

সেখানে প্রাথমিক আলোচনা শেষে পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ প্রণয়নের জন্য সিনিয়র সচিব সোহরাব হোসাইনকে প্রধান করে কয়েক মাস আগে পৃথক সচিব কমিটি গঠন করা হয়। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত ক্যারিয়ার প্ল্যানিংয়ের কয়েকটি মৌলিক লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, অবশ্যই আমলারা কোনো না কোনো রাজনৈতিক সরকারের অধীনে চাকরি করবে। কিন্তু তাদের আচরণ কখনও দলীয় কর্মীর মতো যেন মনে না হয়।

পেশাদারিত্ব হবে মূল মন্ত্র। তবে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ধারণ করার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়া হবে। এছাড়া প্রত্যেক কর্মকর্তা যেন তার কাজের বিপরীতে যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় সেটি হবে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। সেজন্য সিস্টেম বা পদ্ধতির প্রয়োগকে গুরুত্ব দেয়া হবে। অনেকে আছেন শিক্ষাজীবনে বেশি ভালো করতে পারেননি। কিন্তু বাস্তব কর্মজীবনে তার ভূমিকা লেটার মার্ককে ছাড়িয়ে গেছে।

সেক্ষেত্রে ক্যারিয়ার প্ল্যানের মূল নীতি এমন হবে- কে কার লোক সেটি মোটেই বিবেচিত হবে না। তিনি বাস্তবে কতটা দক্ষ কর্মকর্তা তার ওপর নির্ভর করবে তার কর্মজীবনের রোডম্যাপ।

কর্মজীবনে সফল না হলে তাকে একটি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। একজন কর্মকর্তা কাজের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সাপেক্ষে তার ‘বেটার ফিউচার’ দেখতে পারবেন। কবে সিনিয়র সহকারী সচিব, উপসচিব, যুগ্মসচিব ও অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পাবেন সেটির জন্য এক রকম দিনক্ষণও নির্ধারিত থাকবে। পোস্টিং কিংবা পদোন্নতির জন্য কোথাও তদবির বা ধরনা দেয়ার বিদ্যমান মানসিক চাপের পরিবেশ রাখা হবে না।

কর্মকর্তারা শুধু তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলেই তিনি সময়মতো সবকিছু হাতের নাগালে পেয়ে যাবেন। ভবিষ্যৎ প্ল্যান হিসেবে এমনও টার্গেট থাকবে যে, একজন কর্মকর্তা চাকরিতে যোগ দেয়ার প্রথমদিন নিজের ফ্ল্যাট ও গাড়ির চাবি হাতে পেয়ে যাবেন।

যাতে চাকরিতে যোগ দেয়ার পর তার এসব নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা করতে না হয়। এছাড়া চাকরি থেকে অবসর নেয়ার পরও আমৃত্যু প্রায় বেতনের কাছাকাছি সুবিধা ভোগ করার ব্যবস্থা থাকবে।

এ ধরনের ব্যবস্থা রাতারাতি করা সম্ভব না হলেও অদূর ভবিষ্যতে এমন স্বপ্নের বাস্তব রূপ দেখতে চান আমলারা। ফলে একজন মেধাবী আমলা দেশের সুপিরিয়র সিভিল সার্ভিসের গর্বিত সদস্য হওয়ার গৌরব অর্জন করতে পারবেন।

হয়ে উঠবেন সত্যিকারের সেবক। এছাড়া ক্রিয়েটিভ কাজের জন্য নানাভাবে আমলাদের উৎসাহিত করতে ক্যারিয়ার প্ল্যানিংয়ে বেশকিছু দিকনির্দেশনা থাকবে। জনগণের চাহিদার ভিত্তিতে দ্রুত ও যথাযথ সেবার মান নিশ্চিত করতে কোনো সরকারি কর্মকর্তা নিজস্ব উদ্যোগে কোনো বিশেষ ফর্মুলা, গবেষণাপত্র কিংবা বাস্তবে প্রয়োগ করে সফলতা অর্জন করলে তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা জানানো হবে।

শুধু বছরে একবার জনপ্রশাসন পদক দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ক্যারিয়ার প্ল্যানিং প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা প্রতিবেদককে বলেন, বর্তমানে বিদ্যুৎ খাতের আজ যে বড় সাফল্য তার পেছনে একজন সচিবের ব্যাপক অবদান রয়েছে। যার নাম আবুল কালাম আজাদ। তিনি বিদ্যুৎ বিভাগে সচিব কর্মরত থাকাবস্থায় নিজস্ব ক্যারিশমায় অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছেন।

১৯৮২ ব্যাচের এই চৌকস কর্মকর্তা বর্তমানে চাকরি থেকে অবসরে গেলেও সরকার তার সেবা নেয়ার জন্য এসডিজি’র প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে। এর আগে তিনি প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ছিলেন।

সিটিজেন চার্টারের রূপকারও তিনি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এপিডি (যুগ্মসচিব) হিসেবে কর্মরত থাকাবস্থায় আবুল কালাম আজাদ সিটিজেন চার্টারের ধারণাপত্র প্রস্তুত করেন। এই কর্মকর্তা প্রশাসনে সবার কাছে একজন ক্রিয়েটিভ ও শতভাগ দক্ষ আমলা হিসেবে পরিচিত।

সবার আগে অফিসে আসা এবং হাতের সব কাজ শেষ করে বাসায় ফেরার সুখ্যাতি অর্জন করেছেন সাবেক সিনিয়র সচিব ইকবাল মাহমুদ। ১৯৮১ ব্যাচের এই কর্মকর্তা বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত।

তার বর্ণাঢ্য কর্মজীবনজুড়ে রয়েছে ব্যাপক অর্জন। কর্মস্থল দুর্নীতিমুক্ত করা ছাড়াও আকস্মিক পরিদর্শনের জন্য তার নাম সবার আগে আসবে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে কর্মরত থাকাবস্থায় তিনি সংস্কারমূলক অনেক কাজ করেন।

এছাড়া ৮২ ব্যাচের কর্মকর্তা আবু আলম শহিদ খানের মতো ক্রিয়েটিভ আমলার এখন বড় সংকট। তারা বলেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাকে দীর্ঘদিন ওএসডি থাকতে হয়েছে।

যে কারণে প্রশাসনে কাজ করার সুযোগ খুবই কম পেয়েছেন। তা সত্ত্বেও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেন।

কর্মকর্তারা জানান, সাবেক ও বর্তমানে কর্মরত এ রকম অনেক পদস্থ কর্মকর্তা আছেন যাদের সেভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা জানানো হয়নি। তারা মনে করেন, জনপ্রশাসনে এ ধরনের সিনিয়র কর্মকর্তারা তাদের জন্য মাইলফলক।

তাই সাধারণ কর্মকর্তারা মনে করেন, ক্যারিয়ার প্ল্যানিংয়ের নীতিমালায় একটি উপদেষ্টা প্যানেল থাকা দরকার। যেখানে সাবেক এসব সফল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে সম্পৃক্ত করা হলে প্রশাসন আরও শক্ত ভিত পাবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×