পিডিবির ভেলকিবাজি: বিপুল ক্ষতির মুখে হবিগঞ্জের শিল্প-কারখানা

স্বাভাবিক আবহাওয়াতেই দিনে ২-৩ বার বিদ্যুৎ বিভ্রাট * শুধু মে মাসেই ৬০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না * ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি- পল্লী বিদ্যুৎ ও পিডিবির এহেন আচরণ উন্নয়নের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র

  মাহবুবুর রহমান রিপন, সিলেট ব্যুরো ১৮ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পিডিবি
পিডিবি। ফাইল ছবি

৩৩ কেভি বৈদ্যুতিক লাইন নিয়ে হবিগঞ্জে পল্লী বিদ্যুৎ ও পিডিবির (বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড) ভেলকিবাজিতে বিপুল ক্ষতির মুখে পড়ছে জেলার বেশির ভাগ শিল্প-কলকারখানা। স্বাভাবিক আবহাওয়াতেও দিনে দুই থেকে তিনবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটছে।

আর দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া হলে তো কথাই নেই। হবিগঞ্জের পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন বিভিন্ন শিল্প-কারখানা ঘুরে জানা যায়, শুধু মে মাসেই প্রায় ৬০ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন ছিল শিল্প-কারখানাগুলো। অর্থাৎ দিনে গড়ে ২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না শিল্প-কারখানায়।

প্রতিবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটলে (যদি সেটি ১ মিনিটের জন্যও হয়) কারখানার মেশিনে উৎপাদনের জন্য অপেক্ষায় থাকা পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। পরবর্তীকালে বিদ্যুৎ এলে সবকিছু ঠিক করে আবার কারখানা চালু করতে সময় লাগে প্রায় ১ ঘণ্টা। এতে উৎপাদন ঘাটতিতে পড়ছে শিল্প-কারখানাগুলো।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিল্প-কারখানার জন্য ৩৩ কেভি লাইন ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এমন লাইনে স্বাভাবিক আবহাওয়ায় সাধারণত বিদ্যুৎ বিভ্রাট হওয়ার কথা নয়। তারপরও কেন ঘটছে তা খতিয়ে দেখা উচিত। চাহিদামতো বিদ্যুৎ থাকা সত্ত্বেও বিভ্রাট দেখা দেয়াকে সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন ব্যবসায়ী নেতারা।

অন্যদিকে শিল্প-কারখানার কর্তাদের কাছে যথেষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তারা বলছেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ছাড়া নাকি বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে না। রোববার মাধবপুরে বাংলাদেশ হার্ডলাইন (বিএইচএল) সিরামিকে গিয়ে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে প্রতি ঘণ্টায় ১০২৫০ বর্গফুট টাইলস উৎপাদন হয়; যার দাম ৫ লাখ ৭৪ হাজার। কিন্তু সেখানে বড় সমস্যা বিদ্যুৎ বিভ্রাট।

প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম জানান, দেশে তো এখন বিদ্যুৎ ঘাটতি নেই। হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি চাহিদামতো বিদ্যুৎ পাচ্ছে জাতীয় গ্রিডলাইন থেকে। কিন্তু আমরা যারা এখানে শিল্প-কারখানা তৈরি করেছি তারা চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের আশায় আলাদাভাবে ৩৩ কেভি লাইন দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েছি। কিন্তু তাতে লাভ নেই। সাধারণ আবহাওয়াতেই দিনে দুই থেকে তিনবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে।

তার মতে, একবার ১ মিনিটের জন্য বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলেই মেশিনে থাকা উৎপাদনে অপেক্ষমাণ পণ্যের মান এ গ্রেড থেকে বি গ্রেডে নেমে যায়। এতে প্রতি বর্গফুটে ক্ষতি হয় ৮ টাকা। সেই হিসেবে প্রায় ১ লাখ টাকা এবং দিনে দু-তিনবার হলে দুই থেকে তিন লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া এমন বিভ্রাটে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে যন্ত্রপাতিও। তিনি বলেন, এ তো গেল বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ক্ষতির পরিমাণ। আর বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদনের ক্ষতি আরও ব্যাপক।

গত মে মাসে ৬০ ঘণ্টার মতো বিদ্যুৎ পাইনি। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে সাড়ে তিন কোটি টাকার। তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের ব্যাপক সাফল্য রয়েছে। কিন্তু গুণগত মানের বিদ্যুৎ কেন নিশ্চিত করা যাচ্ছে না তা খতিয়ে দেখা উচিত।’

একই অবস্থা পাশের ফারইস্ট স্পিনিং ইন্ডাস্ট্রিজের। গত মাসে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। প্রতিষ্ঠানটির সহকারী মহাব্যবস্থাপাক (ইউটিলিটি) মো. রফিকুল ইসলাম জানান, গত মাসে ৬০ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এক কোটি ১১ লাখ টাকার। আর ১০ লাখ টাকার যন্ত্রপাতির ক্ষতি হয়েছে।

বিদ্যুতের এমন ভেলকিবাজির বিষয়ে জানতে চাইলে হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাট যেটা হচ্ছে সেটা শুধু দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে। তবে শিল্প-কারখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ছাড়াই দিনে দুই থেকে তিনবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে।

আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাভাবিক আবহাওয়াতে ৩৩ কেভি লাইনে বিদ্যুৎ বিভ্রাট সাধারণত হয় না। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আরিফ আহমেদ জানান, স্বাভাবিক আবহাওয়ায় ৩৩ কেভি লাইনে কেন বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট হচ্ছে তা ভালো করে খতিয়ে দেখা দরকার।

হবিগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মোতাচ্ছিরুল ইসলাম বলেন, লোডশেডিং না থাকলেও শিল্প-কারখানাগুলো কেন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে কেউ হয়তো ষড়যন্ত্র করে এসব ঘটাচ্ছে। এদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×