দুর্বার বাংলাদেশের স্বপ্ন ছোঁয়ার ছক

সাকিব-লিটনে উজ্জীবিত টাইগাররা

  স্পোর্টস রিপোর্টার ১৯ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্বার বাংলাদেশের স্বপ্ন ছোঁয়ার ছক

মঙ্গলবারের সকাল সবুজ শ্যামলিমা বঙ্গদেশে নিয়ে এলো সুখের পরশ। আগের রাতে ইংল্যান্ডের টন্টনে সুখস্নাত মদির ও মধুর জয়ে রাঙানো সাকিবময় লগ্ন তখনও চোখে লেগে আছে। বাংলাদেশের পথে-প্রান্তরে, আবালবৃদ্ধবনিতার আবেগের রংও লাল-সবুজ।

ক্যারিবীয় অহমিকা চূর্ণ করে, ৩২১-এর পাহাড় ডিঙিয়ে সাকিব-লিটনের উদ্ধত ব্যাটে সাত উইকেটের অনায়াসলব্ধ জয় রংধনুর রঙে রাঙিয়ে দিল সেমি-স্বপ্ন। কাল সারাবেলা ধন্য ধন্য রব উঠল টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া। প্রত্যাশিত জয়ে স্বপ্ন আরও বাক্সময়, বাস্তবতার ছোঁয়া পেতে ব্যাকুল।

যারা এই উপলক্ষ এনে দিলেন সেই টাইগাররা আগের রাতে ঘুমাতেই পারেননি। সারা রাত কেটেছে আড্ডা-গল্পে। সেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে মধুমাখা জয়ের আনন্দ ছিল, তার চেয়ে বেশি ছিল সেমিফাইনালে যাওয়ার ছক কষার আলোচনা। আগামীকাল নটিংহামের ট্রেন্টব্রিজে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ যে পয়েন্ট টেবিলের দুয়ে থাকা অস্ট্রেলিয়া।

সেমিফাইনালে যাওয়ার জন্য পরের চার ম্যাচেই লক্ষ্য জয়। অন্যতম ফেভারিট অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়েই সেই জয়ের শুরুটা করতে চায় বাংলাদেশ। পেছন থেকে আত্মবিশ্বাসের রসদ দিচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বিশাল জয়।

মঙ্গলবার টন্টনের সুখস্মৃতি নিয়ে বাংলাদেশ দল যখন নটিংহামের বাস ধরে তখনও সবার চোখে প্রায় ঘুম লেগে ছিল। সে চোখে স্বপ্নগুলোও জ্বলজ্বল করছিল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়টা প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু যেভাবে দাপট দেখিয়ে জিতেছে বাংলাদেশ সেটি আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশ্বকাপে কঠিনতম ম্যাচের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একটি হতে যাচ্ছে। তবে দলের আত্মবিশ্বাস তুঙ্গে, সঙ্গে রয়েছে সেমিফাইনালে খেলার ক্ষুধা। দেশসেরা ওপেনার তামিম ইকবালের অন্যতম পছন্দের দেশ ইংল্যান্ড। আলাদা করে বললে নটিংহাম শহরটা তার দারুণ পছন্দ।

সেখানে অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারলে তার চেয়ে তৃপ্তিদায়ক তামিমের কাছে আর কি-ই বা হতে পারে। টন্টন ছাড়ার সময় এই বাঁ-হাতি ওপেনার বলেন, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানোর তুলনায় অস্ট্রেলিয়াকে হারানো অনেক কঠিন। তবে অসম্ভব নয়। আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে।

এরপর মাঠে দেখা যাবে।’ এই বিশ্বকাপে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব নতুন করে ব্যাটিং ঝলক দেখিয়ে চলেছেন। বিশ্বকাপে প্রথম চার ইনিংসে পঞ্চাশোর্ধ্ব রান পার করা চতুর্থ ক্রিকেটার সাকিব। দ্রুততম সময়ে আড়াইশ’ উইকেট ও ছয় হাজার রানের মাইলফলকও স্পর্শ করেছেন তিনি।

বিশ্বকাপে নিজেদের দু’শতম ম্যাচ খেলেছেন। বিশ্বকাপে এরই মধ্যে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও তিনি (৩৮৪)। ওডিআইতে ২০তমবার হয়েছেন ম্যাচসেরা। বাংলাদেশের হয়ে যা সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ তামিম ইকবাল (১৪)। ক্যারিবীয়দের বিপক্ষে মুগ্ধতা ছড়ানো ম্যাচসেরা ইনিংস খেলার পর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শক্তিশালী পেস বোলিং আক্রমণও বড় কিছু মনে হচ্ছে না সাকিবের কাছে।

অসি চ্যালেঞ্জের জন্য প্রস্তুত বাংলাদেশ। সাকিব বলেন, ‘গত চার ম্যাচেই আমরা সেরাদের কাতারে থাকা পেস বোলারদের খেলেছি। সব ম্যাচেই আমাদের প্রতিপক্ষে অন্তত এমন দু’জন বোলার ছিল, যারা ১৪০ কিলোমিটার ছাড়ানো গতিতে বল করে। আমরা যথেষ্টই ভালো মানিয়ে নিয়েছি।

আমাদের দুর্ভাবনা নেই। ইংল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজকে খেলেছি। ১৪০-১৫০ কিলোমিটার গতিতে বল করা পেসার ছিল দু’দলেই। আমাদের এখন মৌলিক বিষয়গুলো ঠিক রাখতে হবে। দল হিসেবে আমরা সব চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে প্রস্তুত আছি।’ রানটা আরও বেশি হবে ভেবেছিলেন মাশরাফিরা।

ওয়েস্ট ইন্ডিজ ৩২১ রান করার পর বাংলাদেশ ড্রেসিংরুমে তাই স্বস্তি নেমে আসে। অনেকে তখনই জয় দেখতে শুরু করেন। সাকিব বলেন, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজের ইনিংস শেষে ড্রেসিংরুমে আমাদের কেউ ভাবেনি যে কাজটা কঠিন হবে। সবাই স্বস্তিতেই ছিল, মজা করছিল। রান তাড়ার বিশ্বাস প্রবলভাবেই ছিল আমাদের মধ্যে। ওপেনাররা যেভাবে শুরু করেছিল, ড্রেসিংরুমে সবার আত্মবিশ্বাস তাতে জোরালো হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমি তামিমের সঙ্গে ব্যাট করার সময় তাকে বলছিলাম ম্যাচটা আমরা দু’জনই ৫-৬ ওভার থাকতে শেষ করে আসব। এরপর লিটনের সঙ্গে ব্যাট করার সময়ও আমরা একে-অন্যকে বলেছি, অপরাজিত থেকে ম্যাচ শেষ করে আসব। অনেক বাজে বল পাচ্ছিলাম। চার মারতে পেরেছি। কখনোই চাপ নিতে হয়নি।’

ভারতের সাবেক টেস্ট ক্রিকেটার ভিভিএস লক্ষ্মণের মতো অনেকেই সাকিবের চেয়েও লিটনের ইনিংসটাকে এগিয়ে রেখেছেন। ব্যাটিংয়ে নামার সময় লিটন নাকি নার্ভাস ছিলেন। তিনি বলেন, ‘ব্যাটিংয়ে নামার সময় অনেকটা নার্ভাস ছিলাম। আমি এই পজিশনে আগে খেলিনি। টিম ম্যানেজমেন্টের চাওয়ায় মানিয়ে নিতেই হতো। ৩০ রান করার পর সহজ হয়ে যায়। সাকিব ভাই আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। তার বাউন্ডারি মারা দেখেও চাপমুক্ত হয়েছি।’

প্রশ্ন হল, লিটনকে কেন বসিয়ে রাখা হয়েছিল? নির্বাচকদের আস্থার প্রতিদান দিয়ে খুশি এই ডান-হাতি ব্যাটসম্যান। এদিকে সাবেক বাংলাদেশ অধিনায়ক এবং বর্তমানে অন্যতম নির্বাচক হাবিবুল বাশার মনে করেন, জয়টা বাংলাদেশের প্রত্যাশিত। তিনশ’র বেশি রান টপকানো সম্ভব হয়েছে নিজেদের ওপর বিশ্বাস থাকায়।

তিনি বলেন, ‘এই ওয়েস্ট ইন্ডিজকেই আমরা ত্রিদেশীয় সিরিজে তিনবার হারিয়েছি। বিশ্বকাপেও তাদের বিপক্ষে জয়টা প্রত্যাশিত। কিন্তু তিনশ’র বেশি রান হয়ে যাওয়ায় কাজটা সহজ ছিল না। নিজেদের ওপর বিশ্বাস থাকার কারণেই বাংলাদেশ তৃপ্তিদায়ক এই জয় পেয়েছে।’

বিশ্বকাপে আইসিসির দূত বাংলাদেশের বাঁ-হাতি স্পিনার আবদুর রাজ্জাক। আইসিসির এক কলামে তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়কে কাঙ্ক্ষিত বলে উল্লেখ করেছেন। তার দেখা সাকিবের সেরা ফর্ম এটা। রাজ্জাক বলেন, ‘এই মুহূর্তে আমাকে বলতেই হচ্ছে, বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডারদের মাঝে দুরন্ত ফর্মে আছে সাকিব। ওকে এভাবে আগে কখনও খেলতে দেখিনি। এই মুহূর্তে যে ধারাবাহিকতা সে দেখাচ্ছে, তা অবিশ্বাস্য। তার সঙ্গে অনেক বছর খেলেছি। এটাই তার ক্যারিয়ারের সেরা ফর্ম বলে মনে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্বকাপে ভালো দল। তাদের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়টা দুর্দান্ত।’ এদিকে সাবেক অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেন লিপু মনে করেন, এখন বাংলাদেশের ব্যাটিং শুধু সাকিবনির্ভর নয়। সবাই পারফর্ম করায় কাজটা সহজ হয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের আলোকিত ব্যাটিং উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে বিশ্বকাপে সেমির চতুর্থ স্থান নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আমেজ এনে জমিয়ে তুলল বিশ্বকাপ। একটা নতুন সমীকরণ নিয়েও আলোচনা হতে পারে যে প্রথম ব্যাট করলে দলীয় রান কত করলে তা নিরাপদ হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘দলের ব্যাটিং বিগত ম্যাচগুলোতে অনেকটা সাকিবনির্ভর ছিল। এদিন উদ্বোধনী জুটি ভালো শুরু এনে দিয়েছে। আর মিডলঅর্ডাররা শেষ করল স্মরণীয় সেরা ইনিংস খেলে।’ টন্টনের সুখস্মৃতি নিয়ে মঙ্গলবার নটিংহামে গেছে বাংলাদেশ দল। সেমিফাইনালের পথে সেখানে আরও কঠিন বাধা পেরোতে হবে বাংলাদেশকে। এবার প্রতিপক্ষ শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়া। আগামীকাল অ্যারন ফিঞ্চদের হারাতে পারলেই বাংলাদেশের স্বপ্নের সেমিফাইনাল যাত্রা আরও জ্বলজ্বল করবে।

ঘটনাপ্রবাহ : আইসিসি বিশ্বকাপ-২০১৯

আরও
আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×