আড়ংয়ে অভিযানকারী কর্মকর্তার বদলি প্রসঙ্গে হাইকোর্ট

সবকিছুতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ লাগলে সচিবরা কেন?

এভাবে বদলি করা হলে সৎ কর্মকর্তারা কাজে নিরুৎসাহিত হন * মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ধ্বংস করতে এক মাস সময়

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৯ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আড়ংয়ে অভিযানকারী কর্মকর্তার বদলি প্রসঙ্গে হাইকোর্ট

আড়ংয়ে অভিযান পরিচালনাকারী ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণের কর্মকর্তাকে বন্ধের দিনে বদলির বিষয়টিকে লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করেছেন হাইকোর্ট।

আদালত বলেছেন, বদলির এই আদেশ স্থগিতে প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। যদি সবকিছুতেই প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়, তাহলে সচিবরা কেন আছেন?

এ ধরনের বদলির ফলে যারা সৎ অফিসার, তারা কাজ করতে নিরুৎসাহিত হন। মঙ্গলবার মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি বন্ধে জনস্বার্থে করা এক রিট আবেদনের শুনানিকালে বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ এ মন্তব্য করেন।

শুনানির একপর্যায় রিটকারী পক্ষের আইনজীবী সাবেক বিচারপতি ব্যারিস্টার এবিএম আলতাফ হোসেন আদালতের উদ্দেশে বলেন, আড়ংয়ে ৭০০ টাকার পাঞ্জাবি কত টাকা রেখেছে দেখেছেন?

এটা যে বন্ধ করতে গেছে তাকে বদলি করে দেয়া হয়েছে। তখন আদালত বলেন, ‘সবকিছুতে প্রধানমন্ত্রীর কেন ডিরেকশন দিতে হবে? সেক্রেটারিরা কি তাদের পকেটে ঢুকে গেছে? বন্ধের সময় বদলির আদেশ দিয়েছে। লজ্জাও নেই। কী বলব, প্রধানমন্ত্রী সবকিছুতে ইন্টারফেয়ার করলে তাদের থাকার দরকার কী। কত নোংরামি! এরকম করলে তো যারা সৎ অফিসার, তারা ডিমোরালাইজড হয়ে যাবে, নিরুৎসাহিত হয়ে যাবে। যারা বন্ধের দিনে এ কাজ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দরকার ছিল।’

৩ জুন ঢাকার উত্তরায় আড়ংয়ে অভিযান চালিয়ে পণ্যের দাম বেশি রাখার দায়ে জরিমানার পাশাপাশি আউটলেটটিকে একদিনের জন্য বন্ধ করে দেয়া হয়। পরে পণ্যের দাম বেশি লেখার ভুল স্বীকার করার পর দোকানটি খুলে দেয়া হয়।

ওইদিনই ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারকে খুলনায় বদলির আদেশ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। আদেশ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাতভর সমালোচনা হয়। সেসময় ফিনল্যান্ড সফররত প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তার বদলির আদেশ প্রত্যাহার করা হয়।

তবে জনপ্রশাসন সচিব ফয়েজ আহম্মদ দাবি করেন, মনজুর শাহরিয়ারকে বদলির আদেশের পেছনে আড়ংয়ে অভিযানের কোনো সম্পর্ক নেই। তার বদলির সিদ্ধান্ত আগেই হয়েছে।

পরে মনজুর শাহরিয়ারের বদলির আদেশের সমালোচনা করে এবং অভিযানের গুরুত্ব তুলে জাতীয় সংসদে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১২ জুন সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই রোজার সময়, তখনও আমি দেশের বাইরে ছিলাম। বেশকিছু বড় বড় জায়গায় একজন অফিসার হাত দিল বলে তার বিরুদ্ধে একটা ব্যবস্থা হঠাৎ করে নেয়া হল, এটা মোটেও গ্রহণযোগ্য ছিল না। বরং আমি আজও বলে দিয়েছি যে, তাকে আবার ওই দায়িত্বেই দিতে হবে।’

এদিকে শুনানি শেষে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বাজার থেকে জব্দ করে এক মাসের মধ্যে ধ্বংস করতে সরকারকে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। পাশাপাশি মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রেতা, সরবরাহকারী ও সংরক্ষণকারীদের শনাক্ত করতে কমিটি গঠন করতে বলেছেন আদালত। জনস্বার্থে করা এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে হাইকোর্টের ওই বেঞ্চ রুলসহ অন্তর্বর্তীকালীন এ আদেশ দেন।

এসব আদেশ বাস্তবায়ন করে স্বাস্থ্য সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদফতর, ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের মহাপরিচালককে ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছেন আদালত। রিটের পক্ষে আদালতে শুনানি করেন আইনজীবী এবিএম আলতাফ হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবিএম আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার।

মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ ও রাসায়নিক সংরক্ষণের অপরাধে গত বছর ২ জুলাই ধানমণ্ডির পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

সম্প্রতি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপপরিচালক মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, গত ছয় মাসের বাজার তদারকি করে রাজধানীর প্রায় ৯৩ শতাংশ ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন সংযুক্ত করে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি বন্ধ ও অবিলম্বে সেগুলো প্রত্যাহারের নির্দেশনা চেয়ে সোমবার আবেদনটি করেন জাস্টিস ওয়াচ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ও সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মাহফুজুর রহমান মিলন।

পত্রিকার প্রতিবেদন তুলে ধরে আইনজীবী এবিএম আলতাফ হোসেন বলেন, ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর নিজেই বলছে, মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি হচ্ছে। এটা কীসের ভিত্তিতে বলছে, সে প্রতিবেদনটা দেখা দরকার। তাহলে বিষয়টি বোঝা যাবে।’

এ সময় আদালত বলেন, ‘আমাদের সরকারি সংস্থা থাকার পরও বাজারে ভেজাল ও মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ আছে এবং বিক্রি হচ্ছে। বিদেশে এ বিষয়গুলো শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেখে। এখানে বসে অনেক কথা তো বলা যায় না, অনেক কিছু গণমাধ্যমে চলে আসে।’

আদালত ‘রাজধানীর ৯৩ শতাংশ ফার্মেসিতে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি হচ্ছে’ মন্তব্যের পক্ষে তথ্যপ্রমাণসহ প্রতিবেদন দিতে অধিদফতরের মহাপরিচালক ও সংশ্লিষ্ট উপপরিচালককে নির্দেশ দিয়েছেন।

আদালত বলেন, ‘ওষুধের প্যাকেটে মেয়াদের তারিখ এত ছোট করে দেয়া হয়, দেখাও যায় না, বোঝাও যায় না। মনে হয়, মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখতে হবে। এটা প্রপারলি ভিজিবল হওয়া উচিত।’

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার বলেন, ‘একজন রোগী মুমূর্ষু অবস্থায় ওষুধ গ্রহণ করে থাকে। সেসময় যদি এই মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ গ্রহণ করে, সেটা তার জন্য আরও ক্ষতিকর। এ ব্যাপারে রাষ্ট্র বসে নেই। রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিচ্ছে।’

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×