ডিআইজি মিজানের অবৈধ সম্পদ

বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট বিক্রি করলেন এসআই নোমান

মিজানকে বরখাস্তের প্রস্তাব যাচ্ছে রাষ্ট্রপতির কাছে

  নেসারুল হক খোকন ১৯ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পুলিশের বিতর্কিত ডিআইজি মিজানুর রহমানে
পুলিশের বিতর্কিত ডিআইজি মিজানুর রহমান

পুলিশের বিতর্কিত ডিআইজি মিজানুর রহমানের অবৈধ সম্পদ হিসেবে দুদকে অন্তর্ভুক্ত কাকরাইলের বাণিজ্যিক ফ্ল্যাটটি বিক্রি করে দিয়েছেন তার ভাগনে এসআই মাহমুদুল হাসান নোমান। দলিলে এই ফ্ল্যাটের দাম দেখানো হয়েছে ৬১ লাখ ২০ হাজার টাকা। ২০১৬ সালে তিনি ৬৬ লাখ ১৮ হাজার টাকায় ফ্ল্যাটটি কিনেছিলেন। তখন রেজিস্ট্রিসহ খরচ দেখানো হয় ৬৬ লাখ ১৮ হাজার টাকা।

তিন বছর পর এই ফ্ল্যাট বিক্রির দলিলে প্রায় ৫ লাখ টাকা কম দেখানো হয়েছে। তবে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, প্রায় আড়াই কোটি টাকায় ফ্ল্যাটটি কিনে নিয়েছেন কাকরাইলের পাইওনিয়ার রোডের নির্মাণ সামাদ সেন্টারের জমির মালিক শেফালী বেগম। তিনি জুনায়েদ ইসলামের স্ত্রী।

এদিকে নারী নির্যাতনের অভিযোগে ডিআইজি মিজানকে বরখাস্ত করা হতে পারে। এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। শিগগিরই তা পাঠানো হতে পারে। মিজানুর রহমানের ঘুষ লেনদেনের ঘটনা তদন্তে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি করেছে পুলিশ সদর দফতর।

সোমবার পুলিশের একজন অতিরিক্ত মহাপরিদর্শকের (অতিরিক্ত আইজিপি) নেতৃত্বে তিন সদস্যের এই কমিটি গঠন করা হয়। জানতে চাইলে এসআই মাহমুদুল হাসান নোমান মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি ৬২ লাখ টাকায় ফ্ল্যাটটি বিক্রি করে দিয়েছি।’ ফ্ল্যাট বিক্রির বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন জানে কি না প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আসলে আমি জানি না দুদক জানতে পেরেছে কি না।’ ক্রেতা শেফালী বেগমের স্বামী জুনায়েদ ইসলাম বাণিজ্যিক ফ্ল্যাটটি কিনে নেয়ার কথা স্বীকার করেছেন।

প্রসঙ্গত, নোমান বর্তমানে কোতোয়ালি থানায় শিক্ষানবিশকাল অতিক্রম করে রমনা থানায় প্রাইজ পোস্টিং পেয়েছেন। ডিআইজি মিজানুর রহমানের জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অনুসন্ধান কর্মকর্তা দুদকের পরিচালক (সাময়িক বরখাস্ত) খন্দকার এনামুল বাছির যুগান্তরকে বলেন, ফ্ল্যাট বিক্রির বিষয়টি তিনি জানেন না।

নবনিযুক্ত অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা পরিচালক মনজুর মোর্শেদ বলেছেন, ‘বাণিজ্যিক ফ্ল্যাটটি বিক্রি করে দিলেও এর দায় কেউই এড়াতে পারবেন না।’ দুদকের তদন্তাধীন সম্পদ কীভাবে রেজিস্ট্রি হল জানতে চাইলে ধানমণ্ডির সাবরেজিস্ট্রার লুৎফুর রহমান বলেন, ‘ফ্ল্যাটটি বিক্রির ক্ষেত্রে আপত্তি জানানো হয়নি।’

ধানমণ্ডি সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্র জানায়, ২৫ এপ্রিল ১৬৬৫নং দলিলে বাণিজ্যিক ফ্ল্যাটটি বিক্রি হয়। এলাকার নির্দিষ্ট মূল্য অনুযায়ী দলিলে ফ্ল্যাটটির দাম দেখানো হয়েছে ৬১ লাখ ২০ হাজার টাকা। তবে ফ্ল্যাট বিক্রির সময় একজন প্রত্যক্ষদর্শী নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, নির্মাণ সামাদ সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত ফ্ল্যাটটি প্রায় আড়াই কোটি টাকায় কেনা হয়েছে।

বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট হিসেবে এর দাম আরও বেশি। তড়িঘড়ি বিক্রি করে দেয়ায় এর দাম তুলনামূলক কম হয়েছে। ডিআইজি মিজানের ভাগিনা মাহমুদুল হাসান নোমানের জবানবন্দির উদ্বৃতি দিয়ে দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে এ ফ্ল্যাট সম্পর্কে বলা হয়, নোমানের জন্ম ১৯৯০ সালে।

তিনি ২০১৬ সালের ১৬ জুন কাকরাইলে ১৯১৯ বর্গফুটের ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশন খরচসহ ৬৬ লাখ ১৮ হাজার টাকায় কিনেছেন। ২০১৬ সালেই তিনি এসআই হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ১৩ বছর বয়সে ব্যবসায়ী হিসেবে ২০০৩-২০০৪ অর্থবছর প্রথম আয়কর দেন। তিনি ওই বছর আয়কর রিটার্নে এক কোটি টাকা ব্যবসাবহির্ভূত সম্পদ দেখান।

আয়কর ফাইলে প্রদর্শিত টাকা থেকে ৬৬ লাখ ১৮ হাজার টাকায় কাকরাইলে বাণিজ্যিক ফ্ল্যাট কেনেন। বাকি টাকা এফডিআর করেন। ভাগিনা এসআই নোমানের বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন দুদকের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা (সাময়িক বরখাস্ত) খন্দকার এনামুল বাছির।

তিনি অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, নোমানের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। ২০০৩-০৪ করবর্ষে আয়কর রিটার্নে প্রদর্শিত এক কোটি টাকার উৎস সম্পর্কে নোমান সদুত্তর দিতে পারেননি। তিনি এই টাকা তার দাদা ও বাবার কাছ থেকে পেয়েছেন বলে মৌখিকভাবে জানান।

তার আত্মীয়স্বজনের মধ্যেও কোটি টাকা দেয়ার মতো কেউ নেই। কাকরাইলের ফ্ল্যাট এবং এফডিআর আসলে মিজানুর রহমানের অবৈধ আয় দিয়ে অর্জিত। এই সম্পদ মিজানুর রহমানের সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হল। তদন্তকারী কর্মকর্তা বলেন, এসব সম্পদ বিবেচনায় নিয়েই ডিআইজি মিজানের ৪ কোটি ২ লাখ ৮৭ হাজার টাকার সম্পদ পাওয়া গেছে।

আয়-ব্যয় বাদ দিয়ে ডিআইজি মিজান ১ কোটি ৯৭ লাখ ২১ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়। তাই তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ২৬ (২), ২৭(১) ধারা ও মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২ এর ৪(২) ধারায় মামলা রুজুর সুপারিশ করেন খন্দকার এনামুল বাছির।

এদিকে এক নারীকে জোর করে বিয়ের পর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ ওঠার পর পুলিশ সদর দফতর একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। ঘটনা তদন্ত করে কমিটি গত বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০৩ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি মহাপুলিশ পরিদর্শকের (আইজিপি) কাছে জমা দেয়।

এরপর নিয়মানুযায়ী প্রতিবেদনটি পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রাণনাশের হুমকি এবং নারী উত্ত্যক্তকরণের অভিযোগ সত্য। ডিআইজি মিজানের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। তার আচরণ অকর্মকর্তাসুলভ, যা অসদাচরণ হিসেবে পরিগণিত।

ঘটনাপ্রবাহ : ডিআইজি মিজান

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×