বিএসটিআইর নির্দেশনা মানা হচ্ছে না

দেদারসে বিক্রি হচ্ছে প্রাণের নিষিদ্ধ পণ্য

প্রাণের নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রি করায় ৫ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা, অভিযান চলবে * প্রাণ প্রিমিয়ামও মানহীন, বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে নতুন মামলা

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৯ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিএসটিআইর নির্দেশনা মানা হচ্ছে না
ছবি: সংগৃহীত

নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে প্রাণের ভেজাল পণ্য। মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে প্রায় দোকানেই প্রাণের ঘি- ‘প্রাণ প্রিমিয়াম’ পাওয়া গেছে।

জাতীয় মাননিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউটের (বিএসটিআই) দেয়া ৭২ ঘণ্টা সময়সীমা অনেক আগে পার হলেও কোম্পানির পক্ষ থেকে নিষিদ্ধ পণ্য তুলে নেয়ার কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় প্রাণের নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রি করায় শনিবার ৫ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বিএসটিআইর ভ্রাম্যমাণ আদালত।

একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোটা অঙ্কের জরিমানাও করা হয়েছে। রাজধানীর গুলশান, মালিবাগ, মতিঝিল, শান্তিনগর, ফকিরাপুল এলাকায় অভিযান চালিয়ে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়। তবে এ নিয়ে মুখ খুলতে রাজি নয় প্রাণ কর্তৃপক্ষ। এদিকে প্রাণ ডেইরির ঘি ‘প্রাণ প্রিমিয়াম’ নিুমানের হওয়ায় বিএসটিআইয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তে প্রাণ প্রিমিয়ামসহ ২১টি পণ্যে বিরুদ্ধে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে মামলা করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক মোহাং কামরুল হাসান।

জানতে চাইলে বিএসইটিআইর পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার এসএম ইসহাক আলী মঙ্গলবার যুগান্তরকে বলেন, এই পণ্যগুলো বাজারে এখনও আছে এটি মোটামুটি সবারই জানা। তবে একটি বিষয় আমি জোর দিয়ে বলব, আমরা বসে নেই। বিএসটিআইর অভিযান চলছে। তিনি বলেন, দ্বিতীয় দফার পণ্যগুলোর জন্য দেয়া সময়সীমা শেষ হওয়ার পর গত শনিবার থেকে এই অভিযান শুরু হয়েছে। এটি অব্যাহত থাকবে। নিষিদ্ধ পণ্য পাওয়া গেলে আইন অনুসারে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ভেজাল রোধে গত রমজানে বাজার থেকে পণ্য নিয়ে পরীক্ষা করে বিএসটিআই। দুই দফায় এতে প্রাণের ৪টি পণ্যেই ভেজাল পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে- প্রাণের গুঁড়া হলুদ, কারি পাউডার, লাচ্ছা সেমাই ও প্রিমিয়াম ঘি। পরবর্তীকালে এসব পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিএসটিআই, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয় আদালত। এরপর পণ্যগুলোর লাইসেন্স স্থগিত করে বিএসটিআই। এছাড়া উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞার পরও বাজারে প্রাণের ঘি বিক্রি হচ্ছে। বিএসটিআইর প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শুধু ছাই ও রঙ মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে প্রাণের গুঁড়া হলুদ। এরপর চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে তা বাজারে ছাড়া হয়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব পণ্য মানবদেহের জন্য ভীষণ ক্ষতিকারক। এ ব্যাপারে জানতে প্রাণের মার্কেটিং ডিরেক্টর কামরুজ্জামান কামালের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে কোনো সাড়া দেননি। পরে প্রতিবেদনের বিষয়টি তাকে ক্ষুদে বার্তায় জানানো হলেও সাড়া মেলেনি।

বিএসটিআই থেকে জানানো হয়, প্রথম দফায় মে মাসের শুরুতে প্রাণের তিনটি পণ্যে ভেজাল পাওয়া যায়। এগুলো হল- গুঁড়া হলুদ, কারি পাউডার ও লাচ্ছা সেমাই। ওই সময়ে এসব পণ্যের লাইসেন্স স্থগিত করে পণ্যগুলো নিষিদ্ধ করা হয়। পরে দ্বিতীয় দফায় গত বুধবার প্রাণের ‘প্রিমিয়াম ঘি’সহ কয়েকটি কোম্পানির পণ্যের লাইসেন্স স্থগিত করে বিএসটিআই।

একই সঙ্গে এসব পণ্য ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বাজার থেকে তুলে নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয় কোম্পানিগুলোকে। সে হিসাবে শুক্রবারের মধ্যে ওইসব পণ্য তুলে নেয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিষয়টি আমলে নেয়নি প্রাণ। বাজারে এখনও প্রাণের প্রিমিয়াম ঘি বিক্রি হচ্ছে।

খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, কোম্পানির পক্ষ থেকে তাদের কাছে এখনও ওইভাবে কোনো নির্দেশনা আসেনি। এ কারণে তারা বিক্রি করছেন। রাজধানীর কেরানীগঞ্জের সর্ববৃহৎ পাইকারি ও খুচরা বাজার ‘জিনজিরা বাজারে’ প্রাণের এই পণ্য এখনও দেদারসে বিক্রি করতে দেখা গেছে। এছাড়া পুরান ঢাকার নয়াবাজারের একাধিক দোকানে বিক্রি হতে দেখা যায় প্রাণের ঘি।

এই পণ্য বিক্রি করা যাবে না এমন কোনো চিঠি কোম্পানির কাছ থেকে না পাওয়ার কথা জানান ব্যবসায়ীরা। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের উপপরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার যুগান্তরকে বলেন, আমরা প্রাণের প্রিমিয়াম ঘিসহ লাইসেন্স স্থগিত ও বাতিলকৃত পণ্য বাজার থেকে উচ্ছেদের জন্য বাজার মনিটরিং করছি।

মঙ্গলবার অধিদফতরের দুটি টিম হাতিরপুল কাঁচাবাজার ও সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারে অভিযান চালিয়েছে। পর্যায়ক্রমে রাজধানীর সবগুলো বাজারে অভিযান চালানো হবে। এসব পণ্য পেলে আইন অনুসারে শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জিনজিরা বাজারের একাধিক ব্যবসায়ী যুগান্তরকে জানান, কয়েকদিন ধরে পত্রপত্রিকা বা টেলিভিশনে ‘প্রাণ প্রিমিয়াম ঘি’সহ আরও কয়েকটি পণ্যের লাইসেন্স স্থগিত করার খবর শুনেছি। কিন্তু প্রাণ কোম্পানি থেকে এখনও পাইকারি ও খুচরা পর্যায় এই ঘি বিক্রি না করা বা বাজার থেকে উঠিয়ে নেয়ার কোনো চিঠি পাইনি।

কোম্পানির কোনো প্রতিনিধিও এই পণ্য বাজার থেকে সরানোর জন্য আসেনি। তাই এখনও দোকান থেকে সরানো হয়নি। তারা বলেন, আমরা শঙ্কায় আছি। কারণ আমরা কোম্পানি থেকে টাকা দিয়ে পণ্য কিনেছি। তাদের এই টাকা ফেরত দিতে হবে। তবে পাওয়া যাবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কায় আছি। এছাড়াও বাজার মনিটরিংয়ের সময় এসব পণ্য পেলে জেল-জরিমানা করবে। তাই এখন আমরা ব্যবসায়ীরা কি করব জানি না।

রাজধানীর নয়াবাজারের মুদি দোকানদার আলাউদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, বাজারে এখনও প্রাণের ঘি বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতারাও পণ্যটি কিনছে। কিন্তু এই বড় কোম্পানির পণ্যে ভেজাল কোনোভাবেই মানা যায় না। তিনি বলেন, বাজার থেকে এই পণ্যটি উঠিয়ে নিতে বলেছে বিএসটিআই। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেই।

এ কারণে বিএসটিআইর উচিত দোকানদার বাদ দিয়ে প্রাণকে জরিমানা করা। একই বাজারে পণ্য কিনতে আসা মো. মাসুম যুগান্তরকে বলেন, এসব কি হচ্ছে? প্রাণের পণ্য আমরা এতদিন আস্থায় কিনেছি। আর এদের পণ্যে এক এক করে ভেজাল ধরা পড়ছে। এটা মেনে নেয়া য়ায় না। তাই কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×