বাংলাদেশ ব্যাংক ও আইএমএফ বৈঠক

উচ্চ খেলাপি ঋণে উদ্বেগ

ব্যাংকিং খাতের সংস্কার নিয়ে প্রশ্ন, আস্থা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ * অর্থ বিভাগের সঙ্গে বৈঠকে ভ্যাটের একাধিক স্তর নিয়ে অসন্তোষ

প্রকাশ : ২০ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  হামিদ বিশ্বাস

ব্যাংকিং খাতে বিপুল অঙ্কের খেলাপি ঋণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত খাতের ব্যাংকের খেলাপি ঋণ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে তারা। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতে নেয়া বিভিন্ন নীতি সংস্কারের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে দাতা সংস্থাটি।

বুধবার সফররত আইএমএফ প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পৃথক বৈঠকে এসব বিষয় আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। এশিয়া এবং প্যাসিফিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডাইসাকু কিহারার (ডিকে) নেতৃত্বে সংস্থার আর্টিকেল-৪-এর ছয় সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধি দল বৈঠকে অংশ নেয়।

বৈঠক সূত্র জানায়, ব্যাংকিং খাতের সংস্কারে যেসব বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- খেলাপি ঋণের বিশেষ পুনঃতফসিল নীতিমালা, ঋণ শ্রেণীকরণ ও অবলোপন নীতিমালা, ব্যাসেল-৩ (বিশ্বমানের ব্যাংক ব্যবস্থা)-এর আওতায় ন্যূনতম মূলধন সংরক্ষণ, ব্যাংকে পরিচালক নিয়োগ ও সুশাসন।

এ ছাড়া নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পারফরমেন্স ও করের টাকায় ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ হচ্ছে কি না, তা-ও জানতে চেয়েছে আইএমএফ।

এ ছাড়া সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোকে টেনে তুলতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কী ধরনের পলিসি রয়েছে, সেটাও জানতে চেয়েছে দাতা সংস্থাটি। পাশাপাশি ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য জোর দেয়ার কথা বলেছে।

একই দিনে অর্থ বিভাগের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন আইএমএফ প্রতিনিধিরা। বৈঠকে নতুন ভ্যাট আইনে একাধিক স্তর নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তারা। প্রস্তাবিত বাজেট পেশের আগেই এ ব্যাপারে লিখিতভাবে অর্থমন্ত্রীকে আপত্তি জানিয়েছিল সংস্থাটি।

পাশাপাশি প্রস্তাবিত বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ, সঞ্চয়পত্রের উৎসে কর কর্তন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তারা। এ ছাড়া বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে ব্যাংকিং খাত থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেয়ায় তারল্য সংকটসহ চাপ সৃষ্টি হবে কি না, জানতে চাওয়া হয়।

তবে সংস্থাটির পক্ষ থেকে নৌবন্দরে স্ক্যানিং মেশিন স্থাপন ও অনলাইনে সঞ্চয়পত্রের কার্যক্রম বাস্তবায়নে তাগিদ দেয়া হয়েছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র।

এর আগে মঙ্গলবার আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সঙ্গে আরেকটি বৈঠক করে আইএমএফের প্রতিনিধি দলটি। ওই বৈঠকে বলা হয়, খেলাপি ঋণ না কমা মানে সুশাসনের ঘাটতি থাকা। এর মধ্যে আবার ঋণখেলাপিদের পুনঃতফসিল সুবিধা দেয়া হয়েছে। ফলে ভালো ঋণগ্রহীতারাও ঋণ পরিশোধে নিরুৎসাহিত হবেন।

সূত্র জানায়, আইএমএফের প্রতিনিধি দলটি বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই ডেপুটি গভর্নর এসএম মনিরুজ্জামান ও আহমেদ জামালের সঙ্গে বৈঠক করে। এরপর ১১টায় বৈঠক করে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে।

এসব বৈঠকে ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ, খেলাপি কমাতে কী কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, মূলধন পর্যাপ্ততার হার, ব্যাংকের মুনাফা, বিভিন্ন নীতি সংস্কার যেমন: খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলের বিশেষ নীতিমালা, ঋণ শ্রেণীকরণ নীতিমালা ও অবলোপন নীতিমালা প্রভৃতি বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালক নিয়োগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং এটা বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো নীতিমালা আছে কি না, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে।

পাশাপাশি নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স ইস্যুতেও আইএমএফের সমালোচনার মুখে পড়েন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

বৈঠকে খেলাপি ঋণ ইস্যুতে আইএমএফের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, খেলাপি ঋণ হ্রাসে সম্প্রতি দুটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের জন্য এবং অপরটি রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকের।

বৈঠকে উপস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, আইএমএফের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মিত বৈঠকের অংশ এটি। তবে বৈঠকে বেশ কিছু বিষয়ে আইএমএফ অসন্তোষ প্রকাশ করে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ অন্যতম।

বুধবার দুপুর ১২টায় বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) সঙ্গে বৈঠক করে প্রতিনিধি দলটি। বৈঠকে বিএফআইইউর প্রধান আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান, নির্বাহী পরিচালক ইস্কান্দার মিয়া, উপদেষ্টা দেব প্রসাদ দেবনাথ ও মহাব্যবস্থাপক জাকির হোসেন চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, এটি আইএমএফের নিয়মিত মিটিংয়ের অংশ। এতে তারা কিছু প্রশ্ন করেছে। আমরা তার জবাব দিয়েছি। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাংলাদেশকে মিলিয়ে লাভ নেই। এখানে রাষ্ট্রের কিছ– নিজস্ব নিয়মনীতি আছে। সে আলোকেই চলছে ব্যাংকিং খাত। তারা চাইলেই হবে না, তাদের মতো শতভাগ চলাও সম্ভব নয়।

প্রসঙ্গত, ঋণ অবলোপনসহ বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ দেড় লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। এ ছাড়া ঋণ পুনঃতফসিল আমলে নিলে ব্যাংকে মন্দ সম্পদের পরিমাণ অনেকগুণ বেশি।