ভ্যাট ও করের ভারে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা

সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চান

  ইয়াসিন রহমান ২০ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাজেট

আগামী অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ভোগ্য, শিল্পপণ্য ও সেবার ওপর আরোপিত ভ্যাট এবং করের ভারে উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা। এবারের বাজেটে ভ্যাটের আওতা ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়েছে। বেশকিছু পণ্যের ওপর সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো এবং আগাম কর আরোপ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে বাড়ানো হয়েছে টার্নওভার ট্যাক্স। ফলে ব্যবসায়ীদের ওপর করের বোঝা বেড়ে যাবে। যা সরাসরি ভোক্তার ওপর পড়বে। সামগ্রিকভাবে ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। উদ্ভূত সমস্যা সমাধানে বাজেট কার্যকর হওয়ার আগেই বিষয়টি নিয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে আলোচনায় বসতে চান তারা।

এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাজেট পাসের আগেই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে সৃষ্ট সমস্যার সমাধান করা হবে। এ লক্ষ্যে একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। এটি ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে বেশির ভাগ পণ্যেই ভ্যাটের হার বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে বেশকিছু শিল্প ও ভোগ্যপণ্যে আরোপ করা হয়েছে আগাম কর। নতুন নিয়মে কোনো ব্যবসায়ী প্রতিদিন ১৩ হাজার ৭০০ টাকা আয় করলেই টার্নওভার ট্যাক্স দিতে হবে। এর হার ৩ থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪ শতাংশ। ফলে বেশির ভাগ ব্যবসায়ীকেই এ কর দিতে হবে।

এছাড়া বাজেট উপলক্ষে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে প্রকাশিত অর্থবিলে বলা হয়েছে, স্থানীয় ব্যবসায়ী পর্যায়ে সব পণ্যের সরবরাহের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপিত হবে।

এমনকি স্থানীয়ভাবে যারা পাইকারি ব্যবসা করেন তাদেরও ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। এতে ভ্যাটের আওতা আরও বেশি সম্প্রসারিত হবে। এসব কারণে ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।

তারা বলেছেন, বাজেটে যেভাবে টার্নওভার ট্যাক্স, ভ্যাটের আওতা বাড়ানো ও অগ্রিম কর আরোপ করা হয়েছে তাতে ব্যবসায় করের বোঝা অনেক বেড়ে যাবে। এই কর ব্যবসায়ীরা ভোক্তাদের কাছ থেকেই আদায় করবেন। তখন পণ্যের দাম বাড়বে। আর কর সরকারের কোষাগারে জমা দিতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা এনবিআরের হয়রানির মুখে পড়বেন বলে আশঙ্কা করছেন।

বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সহসভাপতি সিদ্দিকুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ব্যবসায়ীরা কর দিতে চান। কিন্তু তা কিভাবে আদায় করা হবে সেটা আমাদের জানাতে হবে। ভ্যাট কোন পণ্যে কত তা এখনও ব্যবসায়ীদের কাছে পরিষ্কার নয়। টার্নওভার ট্যাক্স কোন পর্যায়ে কিভাবে আদায় সেটিও স্পষ্ট করা হয়নি। অগ্রিম কর যেভাবে আরোপ করা হয়েছে তাতে শিল্প স্থাপন ও শিল্পপণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। এতে ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা হারাবেন।

তিনি আরও বলেন, উদ্বিগ্ন ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন এফবিসিসিআইয়ে যোগাযোগ করছেন আরোপিত করের বিষয়ে। আমরা সেগুলো লিখিত আকারে নিয়ে এখন এনবিআরকে জানাচ্ছি। পরে এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।

প্রস্তাবিত বাজেটে নিত্যপণ্যের মধ্যে তরল দুধ, গুঁড়োদুধ, গুঁড়া মরিচ, ধনিয়া, আদা, হলুদসহ সব ধরনের মসলার মিশ্রণ, সরিষার তেল, মেশিনে প্রস্তুত বিস্কিট, হাতে তৈরি বিস্কিট, হাতে তৈরি কেকসহ সব ধরনের বিস্কুট জাতীয় পণ্যের বিপরীতে ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে।

একই সঙ্গে প্লাস্টিকের তৈরি সব ধরনের টেবিলওয়্যার, কিচেনওয়্যার, গৃহস্থালি সামগ্রী, টিফিনবক্স, পানির বোতল, মিলে উৎপাদিত পেপার, কিচেন টাওয়াল, টয়লেট টিস্যু, ন্যাপকিন টিস্যু, পকেট টিস্যু, নোট বুক, খাতা এসব পণ্যের ওপরও ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে।

এছাড়া বিভিন্ন শিল্পপণ্যের ওপরও ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এসব অনেক পণ্যে আগে ভ্যাট ছিল না। এবার নতুন করে ভ্যাটের আওতায় আনা হয়েছে।

আগে নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরি পোশাক বিপণন ও ক্রয়ের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হতো। এখন তা বাড়িয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়েছে। আসবাবপত্রের উৎপাদন ও বিক্রিতে সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে।

মোটর গাড়ির গ্যারেজ, ওয়ার্কশপ, ছাপাখানা, লন্ড্রি, চলচ্চিত্র স্টুডিও, চলচ্চিত্র প্রদর্শক, মেরামত সার্ভিসিং, সিকিউরিটি সার্ভিস, করাতকল, খেলাধুলা আয়োজক, পরিবহন ঠিকাদার, টেইলারিং শপ ও টেইলার্স, লটারির টিকিট বিক্রিকারী, সামাজিক ও খেলাধুলাবিষয়ক ক্লাবের বিপরীতে এবার ১০ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে। এর মধ্যে টেইলারিং শপ ও টেইলার্সসহ বেশকিছু সেবা খাতে আগে কোনো ভ্যাট ছিল না।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে প্রায় সব পণ্যের ওপর ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এই বাজেট কার্যকর হলে সাধারণ ভোক্তার জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। তবে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, যেখানে ভ্যাট নিয়ে সমস্যা হবে সেখানে তিনি তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। আমরা সেই অপেক্ষায় রয়েছি।

মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. গোলাম মাওলা যুগান্তরকে বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে বলতে গেলে সব পণ্যের ওপরই ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এতে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাবে। এ হার কমাতে আমরা এফবিসিসিআইর মাধ্যমে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করব।

বাংলাদেশ পাইকারি ভোজ্যতেল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী আবুল হাশেম বলেন, নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন হলে কী পরিমাণ ভ্যাট বাড়বে, সেটা আমরা এখনো জানি না। কোন খাতে কত ভ্যাট দিতে হবে সেটা জানাতে হবে। আমরা যারা পাইকারি ব্যবসা করি, অত্যন্ত সীমিত লাভে পণ্য বিক্রি করি। তাই ভ্যাটটা যেন যৌক্তিক হয়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। আর এই ভ্যাট নিয়ে অনেক কিছু না জানার কারণে আমরা উদ্বিগ্ন।

এদিকে গত মঙ্গলবার ফরেন চেম্বারের এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে এনবিআরের চেয়ারম্যান মোশররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেছেন, বাজেটের প্রভাবে চিনির দাম কেজিতে ৫ টাকা ও ভোজ্যতেল লিটারে ৫ টাকা বাড়তে পারে। এটি সহ্য করার ক্ষমতা ভোক্তাদের রয়েছে। তিনি আরও বলেছেন, অগ্রিম করের বিষয়টি তারা ভেবে দেখছেন। কিছু খাতে অগ্রিম কর তুলে নেয়া হবে।

ঘটনাপ্রবাহ : বাজেট ২০১৯

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×