সিপিডি বাজেট ডায়লগ

ব্যাংক ঋণনির্ভরতা বাধাগ্রস্ত করবে বেসরকারি খাতকে

বেশি জোর দেয়া হয়েছে দারিদ্র্য বিমোচন, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে : পরিকল্পনামন্ত্রী * বাজেটে ৪৭ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে নেয়ার কথা বলা হয়েছে, এটি কিভাবে সম্ভব -আমীর খসরু * অর্থনীতিতে বৈষম্য জটিল আকার ধারণ করেছে -রেহমান সোবহান

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৪ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাংক ঋণনির্ভরতা বাধাগ্রস্ত করবে বেসরকারি খাতকে
ছবি: যুগান্তর

২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বেসরকারি উদ্যোক্তাদের ঋণের সুযোগ কমে আসবে। যা এ খাতকে বাধাগ্রস্ত করবে। প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যাংক থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার কথা বলা হয়েছে। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১৭ হাজার কোটি টাকা বেশি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। সিপিডির ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানের সঞ্চালনায় বক্তব্য রাখেন পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান, অর্থ মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান কাজী নাবিল আহমেদ, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বিএনপির এমপি ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা প্রমুখ। বক্তারা মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির তথ্য ও কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বিএনপি নেতারা বলেন, এ সরকার জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে না। তাদের বাজেট দেয়ারই অধিকার নেই।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বাজেটে নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে। একেকজন একেক অ্যাঙ্গেল থেকে দেখছেন। কোনো কিছু অ্যাঙ্গেল থেকে দেখলে বাঁকা দেখা যায়। তবে সরকার দেখছে সরাসরি। স্বচ্ছতা নিয়ে মন্ত্রী বলেন, ২০০৯ সালের সঙ্গে তুলনা করলে এ বাজেট অনেক স্বচ্ছ। সরকার বেশি জোর দিয়েছে দারিদ্র্য বিমোচন, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে। দারিদ্র্য বিমোচনে সরকার শুরু থেকেই কাজ করায় এখন মোট দরিদ্র ৩ কোটির নিচে। এর মধ্যে হতদরিদ্র ৫০ থেকে ৬০ লাখ। বিএনপির সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, বিএনপি জনগণ বলতে যাদের বোঝায়, তারা ৫ তারকা হোটেল, প্রেস ক্লাবসহ বড় জায়গায় বসে থাকেন। চরাঞ্চলসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে আওয়ামী লীগের। সরকার এদের উন্নয়নেই বেশি কাজ করছে। অর্থনীতিতে বৈষম্য নিয়ে মন্ত্রী বলেন, বৈষম্য কমাতে কাজ করছে সরকার। তবে অর্থনীতি নৈতিক বিজ্ঞান নয়। এটি নিষ্ঠুর বিজ্ঞান। বাজার সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থনীতিতে বাজারই হল প্রভু। এ প্রভুই ঠিক করে দেবে, কার ভাগ্যে কত বণ্টন হবে। ব্যাংকিং খাত নিয়ে তিনি বলেন, বিভিন্ন মহল থেকে কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। সরকারও চিন্তা করছে। বাজেট বক্তৃতায়ও এর উল্লেখ রয়েছে।

বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকারের দাবি- জনগণের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আছে। তাহলে জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিতে হবে কেন। কারা সংসদে যাবে, কারা বাজেট দেবে ঠিক করার দায়িত্ব জনগণের। আমীর খসরু মাহমুদ বলেন, কাদের কল্যাণে ও সিদ্ধান্তে বাজেট হয়, কারা দেশে প্রভু, এটি বড় প্রশ্ন। তবে এ প্রশ্নের উত্তর আমরা জানি। ব্যবসা-বাণিজ্য, সংসদসহ সবকিছু তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে। ভোট চোর, ক্ষমতার দখলদার এবং এদের সহযোগী- সবাই এক হয়েছে। তিনি বলেন, তাদের বাজেট দেয়ার অধিকার নেই। সাবেক এ বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, প্রবৃদ্ধির সঙ্গে অন্যান্য সূচকের মিল নেই। কারণ ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ হল প্রবৃদ্ধির চালক। কিন্তু দেশে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে আছে। তিনি বলেন, সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সরকার ২০ বিলিয়ন ডলার সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের কথা বলেছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ। ওই ৫ বছর শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিনিয়োগ এসেছে ৭ বিলিয়ন ডলার। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ অর্জনের কথা বলেছে সরকার। এখানে কোন ম্যাজিক কাজ করেছে, তা আমাদের বুঝে আসে না। তিনি বলেন, ১২ হাজার কোটি টাকা প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে ৩০ হাজার কোটি টাকা হয়ে যাচ্ছে। দেখার কেউ নেই। ব্যাংক খালি হয়ে যাচ্ছে। জনগণের করের টাকায় ভর্তুকি দিয়ে তা বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে। বিএনপি নেতা বলেন, যে ব্যাংকে টাকাই নেই, সেখান বাজেটের ঘাটতি মেটাতে ৪৭ হাজার কোটি টাকা নেয়ার কথা বলা হচ্ছে, এটি কিভাবে সম্ভব।

ড. রেহমান সোবহান বলেন, বাজেটে বরাদ্দ, টাকা ব্যয় ও আয়ের মধ্যেই আলোচনা সীমাবদ্ধ। কিন্তু এখান থেকে কী অর্জন হবে, সে আলোচনা ওই ভাবে আসে না। তিনি বলেন, অর্থনীতিতে বড় সমস্যা বৈষম্য। এটি জটিল আকার ধারণ করেছে। ব্যাংকিং খাতে ভর্তুকিতে জনগণের টাকা ব্যয় হচ্ছে। এর মানে হচ্ছে, সরকারি নীতি অল্প মানুষের সহায়তার জন্য। সামগ্রিকভাবে সমাজে বৈষম্য কমাতে ওইভাবে অবদান রাখছে না। তিনি বলেন, সরকার সংসদে ঋণের তথ্য দিয়েছে। সেখানে দেখা গেল একটি গ্রুপের ঋণ ১৫ হাজার কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে যা সামাজিক নিরাপত্তা বরাদ্দের বড় একটি অংশের সমান। এটি ন্যায়বিচার নয়। তিনি বলেন, সরকারকে সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিশীল হতে হবে।

সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইদুজ্জামান বলেন, রাজস্ব আদায় জিডিপির ১০ থেকে ১৪ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তুু অ্যাকশন প্ল্যান উল্লেখ নেই। কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়ানোর কথা বলা হলেও কিভাবে বাড়ানো হবে, তা বলা হয়নি। তিনি বলেন, নতুন বাজেট ব্যবসায়ীবান্ধব কিন্তু ব্যবসাবান্ধব নয়। গার্মেন্টস খাতে অটোমেশন কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলবে।

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা বলেন, বাজেটের মাধ্যমে একটি সরকারের চরিত্র বোঝা যায়। ধনী বৃদ্ধিতে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয়। হতদরিদ্রের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চতুর্থ। অর্থনীতিতে বৈষম্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০১০ সালে দেশের মোট আয়ের দশমিক ৭৮ শতাংশ ছিল নিম্নবিত্ত ৫ শতাংশের হাতে। ২০১৬ সালে তা কমে দশমিক ২৩ শতাংশে নেমে এসেছে। এর মানে হল দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হচ্ছে। অন্যদিকে ২০১০ সালে মোট আয়ের ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ ছিল উচ্চবিত্ত ৫ শতাংশের হাতে। ২০১৬ সালে তা বেড়ে ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এর মানে হল ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে দেশে বেকারের সংখ্যা ৪ কোটি ৩০ লাখ। প্রতিদিনই এ সংখ্যা বাড়ছে। অথচ ২০৩০ সালের মধ্যে ৩ কোটি লোকের কর্মসংস্থানের কথা বলেছে সরকার। সেখানে বরাদ্দ কমছে।

গণফোরামের এমপি মোকাব্বির খান বলেন, ব্যাংকগুলোতে ঋণের নামে লুটপাট হচ্ছে। হাজার কোটি কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে মানুষ। বিদেশে পাচার হচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্র কোনো শক্ত উদ্যোগ নিচ্ছে না। তিনি বলেন, দেশে দুর্নীতি মহামারী আকার ধারণ করেছে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) উপদেষ্টা মনজুর আহমেদ বলেন, ২০১৬ সালে কাস্টসম আইন পাস হয়েছে। এরপর ২০১৯ সালে ভ্যাট আইন এবং আয়কর আইনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। এসব আইন বাস্তবায়ন হওয়ায় করের চাপটি বেসরকারি খাতেই বেশি পড়ছে।

কাজী নাবিল আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বলেছে, এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৪৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের জিডিপি দ্রুত বাড়ছে। এবারের বাজেটে প্রবাসী ও গার্মেন্টস খাতে প্রণোদনা এবং ১৮ বছরের কম বয়সীদেরও জাতীয় পরিচয়পত্রের আওতায় আনা হচ্ছে। শিক্ষায় বরাদ্দ নিয়ে তিনি বলেন, শুধু শিক্ষার বরাদ্দ দেখে এ খাতকে মূল্যায়ন করলে ঠিক হবে না। কারণ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ও এ খাতে বরাদ্দ রয়েছে।

বিএনপি নেতা তাবিথ আউয়াল বলেন, বর্তমানে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশেরও কম। এটি উদ্বেগজনক। পণ্যের বহুমুখীকরণের উদ্যোগ নিতে হবে। বিনিয়োগের জন্য ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন জরুরি। অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান বজলুল হক খোন্দকার বলেন, ঋণের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের কথা বলা হয়েছে। এটি সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। এক্ষেত্রে কর আদায়ের মাধ্যমে ব্যয় মেটানো উচিত। তিনি বলেন, সমাজে বৈষম্য বাড়ছে। এজন্য সম্পদের কর বসানো উচিত। এছাড়াও শিক্ষা খাতের ব্যয়ের গুণগতমান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির সাবেক সভাপতি নূরুল আমিন বলেন, ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানো হয়েছে। এটি বেসরকারি খাতকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

ঘটনাপ্রবাহ : বাজেট ২০১৯

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×