জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালের ওটিতে মারাত্মক ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ

সীমিত করা হয়েছে সব ধরনের হৃদরোগীর অপারেশন * এ সপ্তাহে সব ঠিক হয়ে যাবে- পরিচালক

  রাশেদ রাব্বি ২৫ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) মারাত্মক ‘সিউডোমোনাস এরোজিনাস’ ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ ঘটেছে। সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী এ ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমণে যে কোনো মানুষের মৃত্যু ঘটা অস্বাভাবিক নয়।

এ বিষয়টি জেনেই হৃদরোগ হাসপাতালের শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কসহ সব ধরনের হৃদরোগীর অপারেশন সীমিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি হাসপাতালে যেসব হৃদরোগীর অপারেশন হয়েছে তাদের অনেকের শরীরে তাপমাত্রা প্রচণ্ড বাড়তে দেখা যায়।

পরে তাদের রক্তের কালচার করে দেখা গেছে, ‘সিউডোমোনাস এরোজিনাস’ নামের মারাত্মক এক ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণ। প্রায় সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী এ ব্যাক্টেরিয়ার সংক্রমণে যে কোনো রোগীর মৃত্যু ঘটা অস্বাভাবিক নয়।

হাসপাতালে কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক যুগান্তরকে জানান, একাধিক রোগীর শরীরে এ ধরনের সংক্রমণ ঘটায় হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করে সেখানেও এ জীবাণুর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।

পরে কর্তৃপক্ষ অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়েছে যে, অপারেশন থিয়েটারের স্টেরিলাইজেশন (জীবাণুমুক্তকরণ ব্যবস্থা) অকার্যকর হয়ে পড়েছে। যার মধ্যে রয়েছে হটএয়ার ওভেন ও অটোক্লেভ মেশিন।

তারা জানান, প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে এ অবস্থা বিরাজ করলেও গত ৩-৪ দিনে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে। আন্তর্জাতিকভাবে অপারেশনের রোগী মৃত্যুর হার ৫ শতাংশ স্বাভাবিক ধরা হলেও এ সময় হৃদরোগ হাসপাতালে মৃত্যুর হার বেড়ে যায় বলেও জানান তারা।

হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, অপারেশন থিয়েটারে নতুন মেশিন আনা হচ্ছে। তাই সীমিত আকারে অপারেশন করা হচ্ছে, বন্ধ রাখা হয়নি। তিনি বলেন, আগে এই হাসপাতালে নিয়মিত অপারেশন থিয়েটার ও সংশ্লিষ্টদের জীবাণু পরীক্ষা করা হতো না। যদিও আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতালে এ নিয়ম চালু রয়েছে।

তাই আমি চেষ্টা করছি প্রতিষ্ঠানটিকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে। এখন হৃদরোগ হাসপাতালে অপারেশন থিয়েটারে কর্মরত চিকিৎসকসহ সব স্টাফের পোশাকও পরীক্ষা করা হচ্ছে, সেখানে কোনো জীবাণু আছে কিনা তা দেখা হচ্ছে। এ সপ্তাহের মধ্যে অপারেশন থিয়েটারের কার্যক্রম পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হবে।

এর আগে গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত একই কারণে বন্ধ ছিল জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার। ওই সময় অপারেশন থিয়েটার জীবাণুমুক্ত করা হলেও পুনরায় আবার ওটিতে জীবাণুর সংক্রমণ ঘটায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

‘সিউডোমোনাস এরোজিনাস’ ব্যাক্টেরিয়া সম্পর্কে রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. একেএম শামছুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে হাসপাতালে সংক্রমণের জন্য এ ব্যাক্টেরিয়ার কুখ্যাতি রয়েছে।

প্রায় সব ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী এ ব্যাক্টেরিয়া প্রবহমান রক্তের মাধ্যমে সংক্রমিত হয়। উন্নত প্রযুক্তির দামি অ্যান্টিবায়োটিক দিয়েও এর সংক্রমণ বন্ধ করা যায় না। এই জীবাণুর সংক্রমণে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয় এবং মস্তিষ্কে রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে রোগী ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়।

পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালের কার্ডিয়াক সার্জারি বিভাগের একজন চিকিৎসক যুগান্তরকে বলেন, ওপেন হার্ট সার্জারির রোগীরা এ ব্যাক্টেরিয়ায় আক্রান্ত হলে তাদের ভাল্ব কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে, এমনকি রোগীর সেলাই পর্যন্ত কেটে যেতে দেখা যায়।

এসব কারণে হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক সার্জারি অলিখিতভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। গত দুই থেকে তিন দিনে অপারেশন করতে হবে এমন ১৫-২০ জন রোগী হাসপাতাল ত্যাগ করেছে। এছাড়া ভাসকুলার সার্জারি বিভাগের দুটি অপারেশন থিয়েটারের একটির কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। জরুরি বিভাগের অপারেশন থিয়েটারে তারা রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছে।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ৩ দিন হাসপাতালে পানির সংকট ছিল। অপারেশন থিয়েটার ও আইসিইউ আধুনিকায়নের কাজে হাসপাতালে সার্জারি বিভাগের কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছে। এতে কিছু চিকিৎসক ও হাসপাতালের কর্মচারীরা রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে।

এ বিষয়ে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি থাকা সাড়ে ৪ বছর বয়সী মিথিলার বাবা লতিফ সিদ্দিক জানান, অপারেশন হবে না জানিয়ে আমার মেয়েকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়া হয়েছে। ডাক্তার বলেছে, অপারেশন থিয়েটার রোগ-জীবাণু দিয়ে পরিপূর্ণ।

আমার মেয়ের ফুসফুসে ইনফেকশন। কিন্তু দীর্ঘদিন ভর্তি থাকার পরও অপারেশন সম্পন্ন হচ্ছে না। এখানকার ডাক্তাররাও অন্য হাসপাতাল থেকে দ্রুত অপারেশন করিয়ে নিতে বলেছে। কিন্তু আমি রিকশা চালাই, অন্য হাসপাতালে চিকিৎসা করানো আমার পক্ষে সম্ভব হবে না।

হাসপাতালের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি রোগী জয়তুন বেগম বলেন, ৩ দিন ধরে হাসপাতালে পানি ছিল না, আজ এসেছে। তবে এ ৩ দিন হাসপাতালে একটা আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজমান করছে। মূলত রোগজীবাণু আক্রমণের ফলে অপারেশন থিয়েটারের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আতঙ্কটা বেশি ছড়িয়েছে। ফলে ওয়ার্ডগুলো পরিষ্কার করা হয়নি এবং বাথরুমগুলোও নোংরা পড়ে রয়েছে।

সামগ্রিক বিষয়ে জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার ও আইসিইউ আধুনিকায়নের কাজ চলছে। নতুন ৫টি হার্ট লাং মেশিন, আধুনিক ৬৫টি আইসিইউ বেড, ৬টি ভেনটিলেশন মেশিন, অ্যানেস্থেশিয়া মেশিনসহ আরও অনেক আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে।

সেগুলো স্থাপনের কাজ চলছে। এছাড়া অপারেশন থিয়েটার স্টেরিলাইজেশনের মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত করা হচ্ছে। এ কারণে স্বাভাবিক অপারেশনে কিছুটা ব্যাঘাত ঘটছে। তবে এজন্য রোগীদের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×