অবৈধ সম্পদ ও মানি লন্ডারিং

অবশেষে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

আসামির তালিকায় স্ত্রী, ভাই ও ভাগ্নে, সবার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা * নিজস্ব কার্যালয়ে প্রথম মামলা * গ্রেফতারে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান * ঘুষের ঘটনায় মিজান-বাছিরকে ১ জুলাই তলব * দুইজনের কথোপকথনের ফরেনসিক রিপোর্ট চেয়ে এনটিএমসিতে দুদকের চিঠি

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৫ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডিআইজি মিজানুর রহমান
ডিআইজি মিজানুর রহমান। ফাইল ছবি

বহু নাটকীয়তার পর অবশেষে বিতর্কিত ডিআইজি মিজানুর রহমানসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। মামলার অপর তিন আসামি হলেন- মিজানের স্ত্রী সোহেলিয়া আনার রত্না ওরফে রত্না রহমান, ভাই মাহবুবুর রহমান ও ভাগ্নে পুলিশের এসআই মাহমুদুল হাসান।

মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে ৩ কোটি ২৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ৩ কোটি ৭ লাখ ৫ হাজার টাকার সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

দুদক সূত্র জানায়, ২০০৪ সালের দুদক আইনের ২৬(২) ও ২৭(১) ধারা, ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং আইনের ৪(২) ধারা এবং দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় মামলাটি দুদকের ঢাকা জেলা সমন্বিত কার্যালয়ে দায়ের করা হয়। সোমবার দুপুরে দুদকের পরিচালক মঞ্জুর মোর্শেদ বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। মামলা রেকর্ড করেন দুদকের ঢাকা জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আবদুল ওয়াদুদ এবং এটি গ্রহণ করেন উপপরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম। দুদকের সংশোধিত বিধি গেজেট হওয়ার পর এটাই নিজস্ব কার্যালয়ে প্রথম মামলা।

সূত্র জানায়, মামলার পর দুদক টিমের পক্ষ থেকে ডিআইজি মিজানসহ চার আসামির বিদেশ গমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছে। এর পরপরই তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। একই সঙ্গে তাকে গ্রেফতারে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় দুদক টিম। মিজানের মুঠোফোনটি বন্ধ রয়েছে বলে জানান দুদকের এক পরিচালক। তার সন্ধানে দুদকের পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্লাহ, সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান ও মো. সালাহউদ্দিন পুলিশ সদর দফতরেও গিয়েছিলেন।

কিন্তু কেউ কোনো তথ্য দিতে পারেননি। দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সোমবার বিকালে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, ডিআইজি মিজানসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাকে গ্রেফতার করা হবে কি না, সেই ক্ষমতা তদন্তকারী কর্মকর্তার। তিনিই আইনগত পদক্ষেপ নেবেন। ইকবাল মাহমুদ জানান, ঘুষ লেনদেনের ঘটনায় ডিআইজি মিজান ও এনামুল বাছিরকে পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। ওই টিম প্রয়োজনে যেসব স্থানে যাওয়া দরকার, সেসব স্থানে যাবে। যাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করবে। দুদক মুখ দেখে নয়, দুর্নীতির ঘটনা দেখেই অনুসন্ধান ও তদন্ত করে।

এদিকে ঘুষের ঘটনায় ১ জুলাই ডিআইজি মিজান ও দুদক পরিচালক এনামুল বাছিরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে। সকাল ১০টায় ডিআইজি মিজানকে এবং দুপুর ২টায় বাছিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে দুদকের পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্লাহর নেতৃত্বে তিন সদস্যের টিম। এছাড়া এটিএন নিউজের সিনিয়র রিপোর্টার এমরান হোসেন সুমনের সঙ্গেও কথা বলবে দুদক টিম। তাকে ২৬ জুন দুদকে হাজির হতে বলা হয়েছে। তিনিই প্রথম ডিআইজি মিজান ও পরিচালক বাছিরের ঘুষ লেনদেন সংক্রান্ত কথোপকথনের অডিও নিয়ে রিপোর্ট করেছিলেন।

দুদক সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বিকালে মামলার পরপরই ডিআইজি মিজান ও তার স্ত্রী, ভাই-ভাগ্নের বিদেশ গমনের ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়ে পুলিশের বিশেষ শাখার অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক বরাবর চিঠি পাঠানো হয়। এর মধ্যে চারজনের বিষয়ে চিঠি দেয় দুদকের পরিচালক মঞ্জুর মোর্শেদের টিম। আর ডিআইজি মিজানের বিষয়ে আলাদাভাবে চিঠি দেয় পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্লাহর নেতৃত্বে অপর টিম। এই চিঠিতে বলা হয়, ‘ঘুষের অভিযোগের বিষয়ে ডিআইজি মিজানের বক্তব্য নেয়ার জন্য নোটিশ করা হয়েছে। কিন্তু বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, তিনি সপরিবারে দেশত্যাগ করে অন্যদেশে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। অনুসন্ধান কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য তার বিদেশ গমন রহিত করা একান্ত আবশ্যক।’ চিঠিতে ডিআইজি মিজানসহ চারজনের পাসপোর্ট নম্বর ও এনআইডি নম্বর সংযুক্ত করে দেয়া হয়।

অন্যদিকে, ঘুষের ঘটনায় গঠিত অনুসন্ধান টিম ডিআইজি মিজান ও বাছিরের কথোপকথনের ফরেনসিক রিপোর্ট চেয়ে সোমবার বিকালে এনটিএমসির প্রধানের কাছে চিঠি দিয়েছে। ওই রিপোর্ট আজকালের মধ্যে হাতে আসবে বলে জানা গেছে। টিমের একজন সদস্য জানান, অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এনামুল বাছিরের ব্যাংকের সমুদয় লেনদেনের তথ্য চেয়ে পুনরায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে। এর আগেও একবার চিঠি দেয়া হয়েছিল। তবে পূর্ণাঙ্গ তথ্য না আসায় ফের চিঠি দেয়া হল।

ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের মামলা ছাড়াও ঘুষের ঘটনায় পৃথক মামলা হবে বলে আভাস দিয়েছেন দুদকের একজন কর্মকর্তা। ওই মামলায় এনামুল বাছিরও আসামি হতে পারেন। এছাড়া রাজউকের প্লট কেলেঙ্কারির ঘটনায় আরও একটি মামলা হচ্ছে। একই সঙ্গে দুদকের বিরুদ্ধে পরিকল্পনা করে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অপর একটি মামলাও হতে পারে। হোটেল ভিক্টরিতে দুদকের তালিকাভুক্ত বিতর্কিত ডিআইজি মিজানের সঙ্গে গোপন বৈঠক ও দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ এবং পরিচালক কাজী শফিকের নাম ওই বৈঠকে টেনে আনার কারণে অবসরে যাওয়া দুদকের পরিচালক এমএ আজিজকেও জিজ্ঞাসাবাদ করবে দুদক। তাকেও দুদকের টিম খুঁজছে। তবে তার মুঠোফোনটি বন্ধ রয়েছে বলে অনুসন্ধান টিমের একজন কর্মকর্তা জানান।

তিনি বলেন, হোটেল ভিক্টরিতে গোপন বৈঠকে অংশ নিয়ে এমএ আজিজ কৌশলে অপর পরিচালক কাজী শফিকের নাম টেনে আনেন। তিনি ডিআইজি মিজানের পরিকল্পনায় অংশ নেন। এছাড়া লন্ডনপ্রবাসী আবদুল দয়াছ নামে যে ব্যক্তি দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের বন্ধু পরিচয় দিয়ে ওই বৈঠকে অংশ নিয়ে ডিআইজি মিজানকে ‘রক্ষার মিশন’ নিয়ে কথা বলছিলেন, তাকেও জিজ্ঞাসাবাদ করবে দুদক। তিনি কেন ডিআইজি মিজানকে ‘রক্ষার মিশন’ নিয়ে ওই হোটেলে বৈঠক করেছেন, সেই তথ্য জানতে চায় দুদক। কে তাদের সেই বৈঠকের কথোপকথন মোবাইল ফোনে ধারণ করেছে, সেটিও উদ্ধার করার চেষ্টা করছে দুদক টিম।

ওই বৈঠকে যা কথা হয়েছে তাতে আবদুল দয়াছ দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের সঙ্গে সম্পর্ক আছে বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু তিনি ডিআইজি মিজানকে বাঁচাতে চান বা কোনো ধরনের সুবিধা চেয়েছেন- এমন কোনো কথা আসেনি। একই সঙ্গে ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান কাজ তদারককারী পরিচালক কাজী শফিকুল আলমও কোনো সুবিধা নিয়েছেন, সেটাও কেউ বলেননি।

অবসরে যাওয়া পরিচালক এমএ আজিজ শুধু বলছেন, কাজী শফিককে তিনি দেখবেন। ওই বৈঠকের কথোপকথনে এনামুল বাছির ছাড়া দুদকের শীর্ষ পর্যায়ের কোনো সম্পৃক্ততার কথা কেউ বলেননি। তারা শুধু কয়েকটি নাম বারবার উচ্চারণ করেছেন। এ কারণে বৈঠকটি দুদকের বিরুদ্ধে একধরনের ষড়যন্ত্র বলে মনে করছেন দুদকের কর্মকর্তারা।

কার্যালয় থেকে বের হওয়া পথে বিকালে এক সাংবাদিক দুদক চেয়ারম্যানের কাছে জানতে চান, ‘স্যার, আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছে- এর উত্তরে তিনি বলেন, ‘দিজ ইজ রং, আপনি প্রশ্ন প্রত্যাহার করেন। আপনি কী প্রশ্ন করেছেন, তা কি ঠিক হল? আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠেনি। আমি ফেসবুকসহ বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি দুদক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। এই তো? আপনি বরং এটা বলতে পারেন, আমার নাম ভাঙিয়ে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। আপনারা তো জানেন, গত দুই বছরে দুদকের পক্ষ থেকে সবাইকে আটবারের বেশি সতর্ক করে দুদক থেকে বলা হয়েছে- দুদকের চেয়ারম্যান, কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে বা তাদের

আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে কোনো লেনদেন করা যাবে না। যদি আপনি লেনদেন করে থাকেন, তাহলে আপনি দায়ী।’ অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখানে বিব্রত হওয়ার কী আছে?’

এদিকে, ডিআইজি মিজানসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলার এজাহারে বলা হয়, ‘অনুসন্ধানকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সংগৃহীত ও জব্দকৃত রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেয়া হয়। মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উত্থাপিত হলে বিষয়টি প্রাথমিকভাবে অনুসন্ধান করা হয়। প্রাথমিক অনুসন্ধানকালে অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ২০১৮ সালের ১০ জুলাই তকে সম্পদ বিবরণী নোটিশ জারি করা হয়। ওই নোটিশের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ওই বছর ১ আগস্ট দুদক সচিবের কাছে সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন। তাতে তিনি এ মর্মে প্রত্যয়ন করেন, সম্পদ ও দায়দেনার বিবরণী তার জ্ঞান ও বিশ্বাসমতে সত্য, এমন কোনো সম্পদ বা দায়-দেনার বিবরণ হিসাব বিবরণী থেকে গোপন করা হয়নি; যাতে তার নিজের অথবা স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, ভাই বা অপর কোনো ব্যক্তির মাধ্যমে তার স্বার্থ আছে। সম্পদ বিবরণীতে তিনি সাভারে পুলিশ লাইনে ১৯১৩ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট (মূল্য দেখান ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা), পূর্বাচলে ৫ কাঠার প্লট (১০ লাখ ২৫ হাজার ৮০০ টাকা), জোয়ার সাহারা বাংলাদেশ পুলিশ অফিসার্স বহুমুখী সমবায় সমিতিতে সাড়ে ৭ কাঠার প্লট (১৪ লাখ ২০ হাজার ৫৫০) বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জে ৩২ শতাংশ জমি (ক্রয়মূল্য ৮ লাখ ১৭ হাজার টাকা) এবং ওই জমির ওপর ইমারত নির্মাণ করেন ৬৯ লাখ টাকার, উত্তরার পলওয়েল কারনেশন শপিংমলে একটি দোকান, যার ক্রয় ৭ লাখ ৪১ হাজার ৪১০ টাকাসহ ১ কোটি ১০ লাখ ৪২ হাজার টাকার স্থাবর সম্পদের তথ্য দেন।

তবে তিনি সহোদর ভাই মাহবুবুর রহমানের নামে রাজধানীর ২৯, সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোডে (১, নিউ বেইলী রোড), ‘বেইলী রিজ’ নামীয় ভবনে ২১৭০ বর্গফুট আয়তনের অ্যাপার্টমেন্ট, (যার ক্রয়মূল্য দেখান ৬৫ লাখ ৯৯ হাজার ৭৮৯ টাকা), ভাগ্নে পুলিশের এসআই মাহমুদুল হাসানের নামে ৬৩/১, পাইওনিয়ার রোড, কাকরাইলে নির্মাণ সামাদ ট্রেড সেন্টারে ১৭৭৬ বর্গফুটের অফিস স্পেস, যার ক্রয়মূল্য ১ কোটি ৭৭ লাখ ৯৬ হাজার ৩৫০ টাকা, গুলশানের পুলিশ প্লাজা কনকর্ডে ২৪ লাখ ২১ হাজার ২২৫ টাকার সম্পদ নিজের দখলে রাখেন ভিন্ন ভিন্ন নামে। এসব সম্পদ মিলে তিনি ৩ কোটি ৩২ লাখ ৭ হাজার ৩৬৪ টাকার স্থাবর সম্পদ অর্জন ও দখলে রাখেন। সব মিলে তার অর্জিত স্থাবর সম্পদের মূল্য ৪ কোটি ৪২ লাখ ৪৯ হাজার ৬২৪ টাকা।

অপরদিকে, তিনি বেসিক ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ে ১৮ লাখ টাকার ওয়েজ আর্নার বন্ড হিসাবসহ ৪৬ লাখ ২৬ হাজার ৭৫২ টাকার অস্থাবর সম্পদ প্রদর্শন করেন। তবে তার ভাগ্নে মাহমুদুল হাসানের নামে ওয়ান ব্যাংক লিমিটেড কারওয়ান বাজার শাখায় ২০১৩ সালে ৩০ লাখ টাকায় একটি এফডিআর খুলে ২০১৮ সালের ১৪ জানুয়ারি তা ভাঙানো হয়। ওই ৩০ লাখ টাকার এফডিআরের নমিনি ছিলেন অভিযোগ মো. মিজানুর রহমান নিজেই। এক্ষেত্রে ২০১৩ সালে ভাগ্নে মাহমুদুল হাসান বেকার থাকায় এবং তার পিতা-মাতা, ভাই-বোন থাকা সত্ত্বেও ওই এফডিআর হিসাবের নমিনি মিজানুর রহমান হওয়ায় স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়, ওই অর্থের নেপথ্যে যোগান দাতা ছিলেন মিজানুর রহমান। অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে দুদকে অনুসন্ধান চালু হওয়ার পরেই অসৎ উদ্দেশ্যে ওই এফডিআরের সুদাসলে ৩৮ লাখ ৮৮ হাজার ৫৭ টাকা ভাঙ্গিয়ে সম্পূর্ণ অর্থ অন্যত্র স্থানান্তর করেন তিনি। মিজানুর রহমান তার সম্পদ বিবরণীতে ওই টাকার হিসাব কৌশলে গোপন করেন। এভাবে তার অস্থাবর সম্পদের মূল্য দাঁড়ায় মোট ৮৫ লাখ ১৪ হাজার ৮০৯ টাকা। অর্থাৎ তার অর্জিত মোট সম্পদ ৪ কোটি ৬৩ লাখ ৭৪, হাজার টাকার। পক্ষান্তরে সম্পদ বিবরণীতে তিনি ৩ কোটি ৭ লাখ ৫ হাজার টাকার সম্পদ গোপন করে ২০০৪ সালের দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ২৬(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়, অনুসন্ধানকালে মিজানুর রহমানের ৩ কোটি ২৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকার বৈধ আয়ের কোনো উৎস পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মিজানুর রহমান ৩ কোটি ২৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং দখলে রেখে দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ২৭(১) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। এছাড়া তিনি ওই ৩ কোটি ৭ লাখ ৫ হাজার টাকার গোপনকৃত সম্পদ ভোগদখলের অসৎ উদ্দেশ্যে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে কখনও স্ত্রী সোহেলিয়া আনার রত্নার নামে, কখনও ভাগ্নে মাহমুদুল হাসানের নামে, আবার কখনও সহোদর মো. মাহবুবুর রহমানের নামে বিভিন্ন সময়ে হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তর (লেয়ারিং) করেন। এর মাধ্যমে মিজানুর রহমানসহ তারা সবাই ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪(২) ধারা ও দণ্ডবিধির ১০৯ ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ সংঘটন করেছেন।

এজাহারে আরও বলা হয়, অনুসন্ধানকালে সংগৃহীত রেকর্ডপত্র ও তথ্যাদি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মো. মিজানুর রহমানের সহোদর ভাই মো. মাহবুবুর রহমান একজন সামান্য ওষুধ বিক্রেতা। যার দোকানটি বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার পাতারহাটে অবস্থিত। ৬নং ধুলখোলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মকবুল আহমদ লিখিতভাবে প্রত্যয়ন করে জানান, মো. মাহবুবুর রহমানের মেহেন্দিগঞ্জ পৌরসভায় আকবর মেডিকেল হল নামীয় ব্যবসা ছাড়া তার আর কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই। অথচ নিউ বেইলী রোড, ঢাকায় তার নামে ৬৫ লাখ ৯৯ হাজার ৭৮৯ টাকা মূল্যের ফ্ল্যাট ক্রয় করা হয়েছে। এছাড়াও ২০১৭-১৮ করবর্ষে তার আয়কর নথিতে নিজ জেলা বরিশাল ও মুন্সীগঞ্জ জেলায় জমি ক্রয়সহ সর্বমোট ১ কোটি ৮ লাখ ৯৫৯ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ প্রদর্শন করা হলেও তার আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ মর্মে প্রতীয়মান হয়।

অনুসন্ধানকালে দেখা যায়, মো. মিজানুর রহমানের ভাগ্নে মাহমুদুল হাসান বাংলাদেশ পুলিশ বিভাগে সাব-ইন্সপেক্টর পদে রাজধানীর কোতোয়ালি থানায় কর্মরত আছেন। তিনি ২০১৬ সালে সরকারি চাকরিতে যোগদান করলেও ২০১৭-১৮ করবর্ষে ব্যবসায়ী হিসেবে আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন। তিনি ঢাকার কাকরাইলে পাইওনিয়ার রোডে ২ কোটি ২০ লাখ টাকা মূল্যের ১৯১৯ বর্গফুটের বাণিজ্যিক স্পেস ক্রয়, ওয়ান ব্যাংক লিমিটেড কারওয়ান বাজার শাখায় ৩০ লাখ টাকার এফডিআরসহ ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেন। একজন নবীন সরকারি চাকরিজীবী হয়েও তিনি ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন, যা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। অনুসন্ধানকালে জানা যায়, মো. মিজানুর রহমান বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে তার দুই সন্তানকে দেশের বাইরে কানাডায় পড়াশোনার জন্য পাঠিয়েছেন। এছাড়া তিনি ৫০ লাখ টাকার কাবিন করে মরিয়ম আক্তার ইকোকে ২য় বিবাহ করেন এবং মাসিক ৫০ হাজার টাকায় লালমাটিয়ার একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করে কয়েক মাস রাখেন। এভাবে তিনি আরও কী পরিমাণ অবৈধ টাকা অর্জন ও ব্যয় করেন, তদন্তকালে আরও তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে মামলায় বলা হয়।

দুদকের এই অনুসন্ধান কাজটিই করেছিলেন পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির। কিন্তু তিনি ঘুষ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে যাওয়ায় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে ১২ জুন পরিচালক মঞ্জুর মোর্শেদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের টিমকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেয়া হয়। টিমে আরও ছিলেন দুদকের উপপরিচালক মো. আবু বকর সিদ্দিক ও সহকারী পরিচালক মো. নেয়ামুল আহসান গাজী।

মামলা দায়েরের পর এর কার্যক্রম কী হবে- জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, কোনো মামলাই স্পেশাল মামলা নয়। প্রত্যেক অপরাধ সমান। আমরা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিইনি। আমরা অপরাধের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সে অনুযায়ী মামলাটা হয়েছে। এখন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলতে পারবে কী করবেন। ডিআইজি মিজানকে তিনি গ্রেফতার করবেন কি করবেন না, এটা সম্পূর্ণ তার ব্যাপার। তিনি বলেন, চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা হয়েছে। দুদক কার্যালয়ে প্রথম মামলা দায়ের হল- এ বিষয়ে বলেন, আমরা দুদকের আইনে আগেও মামলা করতে পারতাম। আইনে কিছু অস্পষ্টতা ছিল এখন স্পস্ট করেছি মামলা করার জন্য। ডিআইজি

মিজান পলাতক কি না, তা বলতে পারব না। ঘুষের মামলায় ডিআইজি মিজান, এনামুল বাছির এবং সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারকে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে আগামীকাল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয়েছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×