২০ দলীয় জোটে ফের অস্থিরতা

এলডিপি, জামায়াতসহ কয়েকটি শরিকের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ * ক্ষোভ নিরসনের চেষ্টা চালাচ্ছে বিএনপি

  হাবিবুর রহমান খান ২৬ জুন ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

২০ দলীয় জোটে ফের অস্থিরতা

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে আসন ভাগাভাগি ও সংসদে যাওয়া নিয়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে সৃষ্ট ক্ষোভ এখনও নিরসন হয়নি। এরই মধ্যে নতুন করে সৃষ্টি হয়েছে সংকট।

সর্বশেষ জোটের অন্যতম শরিক এলডিপির কর্নেল অলি আহমদের প্রেস ব্রিফিংকে কেন্দ্র করে চলছে এ অস্থিরতা। সৃষ্টি হয়েছে অবিশ্বাস আর সন্দেহ। ২০ দলীয় জোট অক্ষুণ্ণ থাকার পরও কেন অলি আহমদ নতুন করে আলাদা ‘প্লাটফর্ম’ দাঁড় করাতে চাচ্ছেন, তা নিয়ে শরিকদের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা। তার এমন ভূমিকাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন কেউ কেউ। শুধু তা-ই নয়, জামায়াতকে নিয়েও জোটের অনেকের মধ্যে তৈরি হয়েছে অস্বস্তি।

বগুড়া উপনির্বাচনে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে বিএনপিকে সমর্থন না দেয়া এবং রোববার ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে জামায়াত অংশ না নেয়ায় তাদের নিয়েও এ সন্দেহের মাত্রা আরও গভীর হচ্ছে। পাশাপাশি বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন না পেয়ে শরিকদের কেউ কেউ এখনও বিএনপির ওপর ক্ষুব্ধ। নিজেদের অবমূল্যায়নসহ নানা কারণেই এই অসন্তোষ দিন দিন প্রকট হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে শরিকরা বিভক্ত হয়ে পড়ছে। সংসদে যাওয়াকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে জোট ত্যাগ করেছে আন্দালিব রহমান পার্থের নেতৃত্বে বিজেপি।

এদিকে জোটের শরিকদের মধ্যে ক্ষোভ নিরসনে চেষ্টা চালাচ্ছে প্রধান দল বিএনপি। দলটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা শরিকদের সঙ্গে আলাদা কথা বলছেন। কারও কোনো অভিমান বা অভিযোগ থাকলে সরাসরি তাদের কাছে জানাতে বলছেন। ঐক্যফ্রন্টের আগে ২০ দলের শরিকদের সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়া হবে বলে আশ্বাসও দেয়া হচ্ছে।

জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যুগান্তরকে বলেন, ২০ দলীয় জোটে কোনো টানাপোড়েন নেই। সরকার জোট ভাঙার চেষ্টা চালাচ্ছে। জোটের শরিকদের সঙ্গে নিয়মিত তাদের যোগাযোগ রয়েছে। আগের চেয়ে জোট আরও বেশি শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ আছে।

সূত্র জানায়, গত নির্বাচন থেকেই নানা ইস্যুতে জোটের শরিকদের মধ্যে বিরোধ চলে আসছে। জোটের অন্যতম শরিক জামায়াত প্রত্যাশিত আসন না পেয়ে বিএনপির ওপর ক্ষুব্ধ হয়। তারা কয়েকটি আসনে তাদের স্বতন্ত্র প্রার্থীও রাখে।

এ নিয়ে জামায়াতের ওপর ক্ষুব্ধ হয় বিএনপি। এ ইস্যুতে দুই দলের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। নিজেরা বৈঠক করে জোটে না থাকার নীতিগত সিদ্ধান্তও নেয় জামায়াত। জোটের সব ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের দূরত্বে রাখছে তারা। সর্বশেষ বগুড়া উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীকে সমর্থন দেয়নি জামায়াত। উল্টো প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে তারা বিএনপির প্রার্থীর বিরোধিতা করে। বিষয়টি নিয়ে বিএনপির হাইকমান্ড ক্ষুব্ধ। রোববারের জোটের বৈঠকেও উপস্থিত হয়নি জামায়াত। এ নিয়েও জোটের শরিকদের মধ্যে নানা আলোচনা রয়েছে।

বৈঠকে উপস্থিত না থাকলেও গত কয়েক দিনে জামায়াত নেতারা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে। সূত্র জানায়, কর্নেল অলি আহমদের নেতৃত্বে নতুন যে প্লাটফর্ম তৈরির চেষ্টা চলছে তাতে নেপথ্যে থেকে ইন্ধন দিচ্ছে জামায়াত। এমন তথ্য বিএনপির হাইকমান্ডের কাছেও পৌঁছেছে। তারাও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছেন।

এদিকে অলি আহমদের ভূমিকা এবং আরও বেশকিছু ইস্যু নিয়ে রোববার জোটের বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকে জোটের কয়েকটি শরিক সরাসরি অলি আহমদ কী করছেন, তা জানতে চান।

এভাবে জোটের ভেতর আরেকটি জোট গঠন করা হলে জনগণ সেটিকে ভালোভাবে নেবে না বলেও মত দেন তারা। এ নিয়ে জোটের শরিকদের মধ্যেও অবিশ্বাস-সন্দেহ তৈরি হতে পারে। তাই এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে জোটের প্রধান শরিক বিএনপির প্রতি আহ্বান জানান তারা।

এছাড়া বৈঠকে শরিকদের মধ্যে বাদানুবাদের ঘটনাও ঘটে। শরিকদের কেউ কেউ বলেন, যাদের দলের কোনো অস্তিত্ব নেই, যারা ওয়ান ম্যান শো রাজনীতি করে, তারাই এসব বৈঠকে বড় বড় কথা বলেন। এসব নেতা শুধু কোনো বৈঠকে চেয়ার দখল করে লম্বা লম্বা বক্তৃতা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন।

এ প্রসঙ্গে বৈঠকে বিএনপি মহাসচিব বলেন, জোটের কোনো দল সুনির্দিষ্ট ইস্যুতে তারা সংবাদ সম্মেলন বা কর্মসূচি পালন করতে পারে। কিন্ত খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কোনো কিছু করতে হলে সেটা বিএনপিই করবে। বিএনপির নেতৃত্বেই তা হবে। এ নিয়ে মায়ের চেয়ে তো মাসির দরদ বেশি হতে পারে না।

জোটের কয়েকটি শরিক দলের নেতারা অভিযোগ করেন, জোটের শরিকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ নিরসনে এখনও কার্যকর কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিনের শরিক বিজেপি কেন জোট ছাড়ল, তা গভীরভাবে ভেবে দেখা প্রয়োজন ছিল। চাওয়া-পাওয়া বা ক্ষোভ থেকেই পার্থ জোট ছেড়েছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এমন ক্ষোভ তো অন্য শরিকদের মধ্যেও থাকতে পারে। সেগুলো নিরসন করা সম্ভব না হলে ভবিষ্যতে আরও অনেকেই জোট ছেড়ে চলে গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

এ প্রসঙ্গে জোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম যুগান্তরকে বলেন, বিজেপি জোটের সবচেয়ে পুরনো মিত্র ছিল। পার্থ কেন জোট ছেড়ে গেল, তা অনুধাবন করতে হবে। এর কারণ খুঁজে বের করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ২০ দলীয় জোট অক্ষুণ্ণ থাকুক। আমি এজন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। ভবিষ্যতেও করে যাব। কারণ ২০ দলীয় জোটকে আমি অনুধাবন করি। মনেপ্রাণে চাই এটা টিকে থাকুক।

সূত্র জানায়, গত নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়াকে কেন্দ্র করে জোটের কয়েক শরিক ক্ষুব্ধ হয়। সেটা এখনও অব্যাহত আছে। জোটের শরিক জাগপাকে কোনো আসন না দেয়ায় তারা চরম ক্ষুব্ধ হয়। জাগপার চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান ক্ষোভ থেকে বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন না। অথচ তার বাবা শফিউল আলম প্রধান জীবিত থাকাকালে প্রত্যেকটি বৈঠকেই উপস্থিত ছিলেন।

বিএনপিসহ ২০ দলের কয়েকটি শরিক দলের বেশ ক’জন নেতার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন করার পর উদ্ভূত সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জোটটির বেশির ভাগ শরিকের মধ্যে হতাশা ভর করেছে। জোটের আগে এসব দল এখন নিজেদের লাভ-ক্ষতির হিসাব কষছে। নিজেদের ভবিষ্যৎকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক সমীকরণে যাওয়ার চেষ্টা করছেন এসব শরিকদের কেউ কেউ।

জানতে চাইলে এলডিপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম যুগান্তরকে বলেন, নানা চাওয়া-পাওয়া নিয়ে জোটের শরিকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ বা অসন্তোস বিরাজ করছে। সম্প্রতি অলি আহমদের প্রেস ব্রিফিংকে কেন্দ্র করেও কেউ কেউ নানা সন্দেহ করছেন।

তিনি বলেন, অলি আহমদকে নিয়ে জোটের শরিকদের মধ্যে অবিশ্বাস-সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এলডিপি, জামায়াত বা কল্যাণ পার্টির মতো দল যদি জোট থেকে বেরিয়ে যায়, তাহলে তো জোটের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। অলি আহমদ যদি শুধু জামায়াতকে নিয়ে নতুন কিছু করতে যায়, তাহলে ওনার নিজের ইমেজ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জোটরে জন্যও তা ক্ষতিকর হবে বলে মন্তব্য করেন এলডিপির এই নেতা।

জানতে চাইলে জোটের আরেক শরিক এনপিপির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ যুগান্তরকে বলেন, বিগত সময়ে নানা ইস্যুতে জোটের মধ্যে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। এসব ক্ষোভ নিরসনে বিএনপির পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তারপরও কিছুটা ক্ষোভ এখনও রয়েছে।

তিনি বলেন, সর্বশেষ জোটের বৈঠকেও বিএনপি মহাসচিব আমাদের আশ্বাস দিয়েছেন, কারও কোনো অভিযোগ থাকলে সরাসরি আমাকে বলবেন তা নিরসন করা হবে। ২০ দলকে বাদ দিয়ে কখনও ঐক্যফ্রন্টকে প্রাধান্য দেয়া হবে না বলেও মহাসচিব আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×