২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট পাস

মোট ব্যয় ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা * রাজস্ব আয় ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা

  যুগান্তর রিপোর্ট ০১ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট পাস
সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। ফাইল ছবি

বিরোধী দল জাতীয় পার্টির স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে নির্দিষ্টকরণ বিল পাসের মধ্য দিয়ে রোববার জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট পাস হয়েছে। সকাল ১০টায় স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশন বসার পর নতুন অর্থবছরের জাতীয় বাজেট কণ্ঠভোটে পাস হয়। আজ সোমবার অর্থবছরের (২০১৯-২০) প্রথম দিন থেকেই এ বাজেট কার্যকর হবে।

অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ১৩ জুন জাতীয় সংসদে ‘সমৃদ্ধ আগামীর পদযাত্রায় বাংলাদেশ : সময় এখন আমাদের সময় এখন বাংলাদেশের’ শিরোনামে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করেন। বাজেটে অনুদান ছাড়া আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। আর অনুদানসহ আয় হবে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। আয় ও ব্যয়ের ঘাটতি (অনুদানসহ) ১ লাখ ৪১ হাজার ২১২ কোটি টাকা। আর অনুদান ছাড়া এ ঘাটতির পরিমাণ ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি।

নতুন বাজেটে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের মধ্যে কর হিসেবে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৩ লাখ ৪০ হাজার ১০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মাধ্যমে কর হিসেবে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, এনবিআরবহির্ভূত কর ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কর ছাড়া আয় হবে ৩৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা। এছাড়া বৈদেশিক অনুদানের পরিমাণ আগামী বছর ৪ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

সামগ্রিক ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক উৎস থেকে ৬৩ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ঋণের মাধ্যমে নেয়া হবে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা। এছাড়া সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়া হবে ২৭ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য খাত থেকে নেয়া হবে ৩ হাজার কোটি টাকা।

বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা ১৮ জুন শুরু হয় এবং ৩০ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। প্রায় ৫২ ঘণ্টার আলোচনায় বিরোধী দলের ৩৮ সদস্যসহ মোট ৩৪৯ জন অংশ নেন।

সংসদ নেতা শেখ হাসিনা ও রওশন এরশাদসহ সরকারি ও বিরোধী দলের অধিকাংশ সদস্যের উপস্থিতিতে রোববার বাজেটের ওপর ৫৯টি মঞ্জুরি দাবির বিপরীতে ৪৮৪টি ছাঁটাই প্রস্তাব আনা হয়। সরকার ও বিরোধী দলের হুইপের মধ্যে সমঝোতা অনুযায়ী ৪টি মঞ্জুরি দাবি আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়।

এর আগে আলোচনা শেষে মঞ্জুরি দাবিগুলো কণ্ঠভোটে সংসদে গৃহীত হয়। এরপর অর্থমন্ত্রী বৈষম্য দূর করে টেকসই উন্নয়ন করার লক্ষ্য নিয়ে সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৪২ হাজার ৪৭৮ কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার টাকা ব্যয়ের অনুমোদন নিতে ‘নির্দিষ্টকরণ বিল ২০১৯’ পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পরে কণ্ঠভোটে সর্বসম্মতিতে তা পাস হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়ে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ বাজেট বাস্তবায়নের যাত্রাকে স্বাগত জানান। এ সময় অর্থমন্ত্রী স্পিকারের অনুমতি নিয়ে সংসদ সদস্যদের সবাইকে বাজেটোত্তর নৈশভোজে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানান। নির্দিষ্টকরণ বিলটি মূলত গ্রস বাজেট। বিভিন্ন দাতা সংস্থা ও অন্যান্য খাতে বাজেটে সরকারের অর্থ বরাদ্দের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এই অর্থ কখনও ব্যয় হয় না, যা বাজেটের আয়-ব্যয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে হিসাব মেলানো হয়। এ বাধ্যবাধকতার কারণে এবারের বাজেটেও ১ লাখ ১৯ হাজার ২৮৮ কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা ব্যয় হবে না। অর্থমন্ত্রী ৭ জুন ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার যে বাজেট উত্থাপন করেছেন, সেটাই ব্যয় হবে। সেটাই আগামী অর্থবছরের নিট বাজেট।

যে চারটি মঞ্জুরি দাবি নিয়ে আলোচনা হয় তার মধ্যে কৃষি খাতে বরাদ্দের বিরুদ্ধে ছাঁটাই প্রস্তাব দিয়ে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সংসদ সদস্যরা অভিযোগ করেন, দেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ ও খাদ্য উদ্বৃত্ত হলেও কৃষকরা ফসলের দাম পাচ্ছেন না। ধানের দাম না পেয়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও কোথাও কোথাও ঘটেছে। ঋণখেলাপিরা হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেলেও সামান্য ঋণ নেয়ার কারণে ৪৫ হাজার কৃষকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। কৃষকদের ঋণ কখনও মওকুফ করা হয় না।

জবাবে কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক বলেন, বর্তমান সরকার কৃষিবান্ধব এবং নানা পদক্ষেপ নিয়েছে বলেই উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়েছে। এখনও ৪০ ভাগ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। রফতানি বহুমুখী করতে না পারলে অর্থনীতি বিকশিত হবে না। কৃষিকে বাণিজ্যকরণ করতে পারলে রফতানিকে বহুমুখী করতে পারব।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দের বিরোধিতা করে জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সংসদ সদস্যরা বলেন, যখন একটি সরকার এক দশক ক্ষমতায় থাকার পরও বিদেশ থেকে শিক্ষক আনতে চায়, সেই সরকারের ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার থাকে না। প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়াতে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নিয়ে একটি শিক্ষা উন্নয়ন কমিটি গঠনের দাবি জানিয়ে তারা বলেন, লন্ডনভিত্তিক একটি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনের জরিপ অনুযায়ী, এশিয়ার শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ফিলিপাইনসহ কয়েকটি দেশ থাকলেও আমাদের দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। শিক্ষার মান ক্রমেই কমে যাচ্ছে।

জবাবে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, যারা ছাত্রদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় রণক্ষেত্র করে, শিক্ষার্থীদের হাতে মাদক তুলে দেয়, মেধাবী ছাত্রদের বিপথগামী করে, যারা এসব অনৈতিক কাজ করে তাদের কাছে নৈতিকতার সবক নেয়া একটু হাস্যকরই মনে হয়। বিএনপি-জামায়াতের আমলে নিয়মবিরুদ্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এখন সব এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যাচাই করার সময় এসেছে।

আলোচনায় স্বাস্থ্য খাতের নানা সমস্যার কথা তুলে ধরে ছাঁটাই প্রস্তাব দিয়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বলেন, বিএনপি আমলে ডাক্তারদের দলীয়করণের কারণে স্বাস্থ্য খাতের এই অবস্থা। চিকিৎসা নিতে মানুষ বিদেশে যাচ্ছে। সাত হাজার কোট টাকা ব্যয় হয় বিদেশে চিকিৎসার জন্য। দেশের চিকিৎসা ব্যয়বহুল হওয়ায় মানুষ দরিদ্র হচ্ছে। সবাই ঢাকার কোনো না কোনো হাসপাতালে এটাচমেন্ট থাকে। এই এটাচমেন্ট বন্ধ করুন। মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ বিক্রি বন্ধ করুন। জবাবে মন্ত্রী বলেন, বিএনপি কমিউনিটি ক্লিনিক বন্ধ করে দিয়েছিল। আমরা ফের সেটা চালু করেছি। দেশে রাতকানা রোগ নেই। টিকাদান শতভাগ অর্জিত হয়েছে। আমেরিকায় বর্তমানে গড় আয়ু ৭৮ বছর। ইনশাআল্লাহ আমরা দ্রুতই সেই পর্যায়ে উন্নীত হব। সরকারি ৩৫টি মিলে প্রায় ১০০টি মেডিকেল কলেজ। বিএনপি-জামায়াত আমলে ১৫টিও ছিল না। একমাত্র ধনাঢ্য ব্যক্তি ছাড়া কেউ বিদেশে চিকিৎসা নিতে যায় না। ক্ষমতায় থাকতে খালেদা জিয়া-তারেক রহমানরা কখনও দেশে চিকিৎসা নেননি, তাদের মুখে চিকিৎসা নিয়ে কোনো কথা মানায় না।

ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় জাতীয় পার্টি ও বিএনপির সদস্যরা বলেন, নারীদের প্রতি বৈষম্য করা হয় বরাদ্দ প্রদানে। এই বৈষম্য দূর করতে হবে। বিশেষ বরাদ্দ প্রদানে দুর্নীতি হচ্ছে। একটি বিশেষ কোম্পানি থেকে সোলার প্যানেল নিতে বাধ্য করায় বেশি দাম নেয়া হয়। এতে অর্থের অপচয় হচ্ছে। শহরে সোলার কমিয়ে গ্রামে বরাদ্দ দেয়া উচিত। তারা বলেন, ঈদে ত্রাণ দেয়া হয়। কিন্তু তালিকা অনুযায়ী দেয়া হয় না। দেয়া হয় স্লিপ অনুযায়ী। এতে অনিয়ম হয়। টিআর-কাবিখার বরাদ্দ যাতে সঠিকভাবে হয় তা নজরদারি করুন।

ঘটনাপ্রবাহ : বাজেট ২০১৯

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×