অনুসন্ধান প্রতিবেদন আগামী সপ্তাহে

মিজান-বাছিরের বিরুদ্ধে এবার ঘুষের মামলা

পরিকল্পনামতো ৪০ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনে অংশ নেন ডিআইজি * প্রকাশ্যে ঘুষের স্বীকারোক্তি দেয়ায় মিজানকে জিজ্ঞাসাবাদ না-ও করা হতে পারে * ঘুষ গ্রহণ করে ফেঁসে যান পরিচালক বাছির

  মিজান মালিক ০৪ জুলাই ২০১৯, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মিজান-বাছির। ফাইল ছবি

ফরেনসিক পরীক্ষায় ঘুষ লেনদেন নিয়ে কথোপকথনের সত্যতা পাওয়ায় এবার মিজান ও বাছিরের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। দু’জনের ঘুষ কেলেঙ্কারির অনুসন্ধান শেষে আগামী সপ্তাহে মামলার সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল হতে পারে।

এতে কথোপকথন, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও প্রমাণাদি দুই কর্মকর্তার ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এসবের ভিত্তিতেই কারারুদ্ধ ডিআইজি মিজান ও দুদক পরিচালক এনামুল বাছিরকে আসামি করে মামলা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দুদক পরিচালক এনামুল বাছির ঘুষ গ্রহণ করেছেন, এটা অডিও রেকর্ডে প্রমাণ আছে। অন্যদিকে ডিআইজি মিজান নিজেই ঘুষ দেয়ার কথা প্রকাশ্যে বলেছেন। দুদক মনে করছে, এর মাধ্যমে ডিআইজি মিজান নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিজেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

দু’জনই ঘুষ লেনদেনে জড়িয়েছেন, যা দণ্ডবিধির ১৬১, ১৬৫(১), ১০৯ ধারা ও ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) (ক্ষমতার অপব্যবহার) ধারায় অজামিন ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। মিজান দুদকের মামলায় বর্তমানে কারাগারে আছেন। ঘুষ লেনদেন মামলায় এবার সাময়িক বরখাস্ত এনামুল বাছিরকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠানো হতে পারে।

দু’জনকেই রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। এদিকে মিজানসহ চারজনের অবৈধ সম্পদ তদন্তের জন্য দুদক পরিচালক মঞ্জুর মোর্শেদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের টিম গঠন করা হয়েছে। এর সদস্যরা কাজ শুরু করে দিয়েছেন।

দু’জনের বিরুদ্ধে ঘুষ কেলেঙ্কারির ঘটনা অনুসন্ধান শেষ করে এনেছে দুদক পরিচালক শেখ মো. ফানাফিল্লার নেতৃত্বে তিন সদস্যের টিম। আজ বা আগামী সপ্তাহে রিপোর্ট জমা দেয়া হবে। ১৫ দিন অনুসন্ধান টিম কাজ করে।

এর অংশ হিসেবে মিজান ও বাছিরের ঘুষ লেনদেন সংক্রান্ত অডিও ক্লিপ বা কথোপকথনের ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেলের (এনটিএমসি) কাছে আবেদন করে দুদক।

এনটিএমসি বিশেষজ্ঞ টিম দিয়ে বেশ কয়েকদিন সময় নিয়ে দু’জনের কথোপকথন ছাড়াও এ সংক্রান্ত পারিপার্শ্বিক অন্যান্য বিষয়াদি পরীক্ষা করে। এর মধ্যে ছিল- তাদের মধ্যে কতবার কথা হয়েছে, কোথায় কোন টাওয়ারের অধীন কথা হয়েছে, দুদকের মামলা থেকে রেহাই পেতে ডিআইজি মিজান কী কী করেছেন, অনুসন্ধান কর্মকর্তার সঙ্গে একান্ত বৈঠকে কী কী বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন, তারা কতবার এসএমএস বিনিময় করেছেন প্রভৃতি।

ফরেনসিক পরীক্ষায় ‘মামলার সুপারিশ করতে বাধ্য হওয়া বা মামলার সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিল ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না’- দুদক পরিচালক বাছিরের এমন কথোপকথনের অডিও নিবিড় পরীক্ষা করা হয়। এতে দু’জনের মধ্যে পুরো কথোপকথনের প্রমাণ মেলে।

অভিযোগ ওঠার পর এনামুল বাছির আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছিলেন, তিনি ঘুষ নেননি। ডিআইজি মিজান তার কণ্ঠ জোড়া লাগিয়ে বা নকল করে অডিও ক্লিপ তৈরি করেছেন। কিন্তু ফরেনসিক পরীক্ষায় তার বক্তব্য টেকেনি।

তিনি যেভাবে কথা বলেন, যখন থামেন, একটির পর একটি কথা যেভাবে বলেছেন তাতে প্রমাণ হয়েছে এখানে কোনো জোড়া লাগানো ক্লিপ নেই।

পুরোটাই আসল-অবিকল। যেভাবে কথা বলেছেন, পরিকল্পনা করে সেভাবেই ডিআইজি মিজান তার মুঠোফোনে সেই কথোপকথন ধারণ করেন।

ডিআইজি মিজান ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দেয়ার কথা একটি বেসরকারি টেলিভিশনকে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছেন। দুদকের অনুসন্ধান টিম ২৫ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অডিও প্রমাণ পেয়েছে। বাকি ১৫ লাখ টাকা কখন কীভাবে দিয়েছেন, সে বিষয়ে অডিও ক্লিপে কিছু নেই। তবে দুদকের মামলায় ৪০ লাখ টাকার ঘুষ লেনদেনের অভিযোগই থাকছে বলে জানা গেছে।

কারণ ডিআইজি মিজান প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন, তিনি দুদক পরিচালককে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন। এখন এটি প্রমাণের দায়িত্বও তার। কারণ তিনি ঘুষ দিয়ে দুদকের হাত থেকে বাঁচতে চেয়েছেন। তবে শেষরক্ষা হচ্ছে না নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযোগটি তিনি প্রকাশ্যে নিয়ে আসেন।

ফলে তিনিই বলতে পারবেন ১৫ লাখ টাকা কোন উৎস থেকে নিয়ে কখন বাছিরকে দিয়েছেন। এ কারণে মামলার পর তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে- এমন আভাসও পাওয়া গেছে।

ফরেনসিক পরীক্ষায় ১৫ জানুয়ারি রমনা পার্কে ঘুষের ২৫ লাখ টাকা লেনদেনবিষয়ক কথোপকথনকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ওই অডিও ক্লিপে পরিচালক বাছিরের উদ্দেশে ডিআইজি মিজানকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনার জন্য কিছু বই এনেছি। এগুলোয় আইনের বইটই আছে।’

জবাবে বাছির বলেন, নিয়ে আসেন টাকা... কোন ফর্মে আনছেন? বাজারের ব্যাগে... না!’ ডিআইজি মিজান বলেন, ‘বাজারের ব্যাগে। বড় ভলিউম না... এই টোয়েন্টি ফাইভ তো। তেমন বড় ভলিউম না... সব এক হাজার টাকার নোট।’

বাছির বলেন, ‘আচ্ছা...। আমি আপনার সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ চাই... এইটা হইল কথা। বাকিগুলো হইল...!’ এ পর্যায়ে ডিআইজি মিজান বলেন, ‘না না শুনেন আর ১৫ লাখ টাকা আমাকে নেক্সট ৮-১০ দিন সময় দিলে আমি ম্যানেজ করে ফেলব।’

জবাবে বাছির বলেন, ‘এত সময় দেয়া যাবে না... আগামী সপ্তায়...। এভাবেই তাদের মধ্যে ঘুষ লেনদেনের কথা এগোতে থাকে। টাকা নেয়ার পরও মামলার সুপারিশ করায় ডিআইজি মিজান বাছিরকে চার্জ করেন। তিনি বলেন, তিনি না চাইলেও উপায় ছিল না।’ দু’জনের মধ্যে একদিন নয়, একাধিকবার কথা হয়েছে।

‘এসএমএস’ বিনিময় হয়েছে বহুবার। ডিআইজি মিজান দুদক পরিচালকের সঙ্গে কথা বলার জন্য একটি ফোন ও সিমকার্ড কিনে দেন। বডিগার্ড হৃদয়ের নামে এই ফোন সেটসহ সিম কেনা হয়। সেই নম্বরেই দু’জনের মধ্যে কথা হয়।

দেখা হয় একাধিকবার। দুই দফায় ঘুষ বিনিময় হয়। সেই টাকা একটি বেনামি হিসাবে কীভাবে রাখা যায়, পরিচালক সেই পরামর্শও চেয়েছিলেন ডিআইজি মিজানের কাছে।

মিজান শুধু একজন পরিচালককে ঘুষ দিয়েই ক্ষান্ত হননি; নয়াপল্টনের হোটেল ভিক্টরিতে একটি গোপন বৈঠকেরও আয়োজন করেন। সেখানে পরিকল্পনা করে তিনি বৈঠকে অংশগ্রহণকারী লন্ডনপ্রবাসী আবদুল দয়েস ও সদ্য অবসরে যাওয়া দুদক পরিচালক এমএ আজিজ ভুঁইয়ার কথোপকথন রেকর্ড করেন।

তা পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিআইজি মিজানের বক্তব্য খুব স্পষ্ট। বাকি দু’জনের বক্তব্য একটু অস্পষ্ট। তারা কী কী আলোচনা করেছেন, তা রেকর্ড করে পরে সময়মতো কাজে লাগান ডিআইজি মিজান।

সূত্র জানায়, ঘুষ লেনদেনের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিআইজি মিজানকে ৮ জুলাই দুদকে হাজির হতে যে নোটিশ দেয়া হয়েছিল, এখন তার আর প্রয়োজন নেই। উচ্চ আদালতের নির্দেশে গ্রেফতারের পর তাকে জেলে নেয়ায় ওই নোটিশের কার্যকারিতা নেই। এ পর্যায়ে তাকে আর জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন আছে বলেও মনে করেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।

ঘটনাপ্রবাহ : ডিআইজি মিজান

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত