বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগ

বেসিক ব্যাংক উদ্ধারে তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়

  হামিদ বিশ্বাস ১০ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বেসিক ব্যাংক উদ্ধারে তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়

ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে গর্তে পড়ে যাওয়া রাষ্ট্রায়ত্ত বেসিক ব্যাংককে উদ্ধারে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ছয় বছরের জন্য এ ছাড় দেয়া হয়।

সে কারণে ঋণের নামে অর্থ লুটে নেয়া বেসিক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি কমেছে। ব্যাংকের বর্তমান ঘাটতি ২৩৬ কোটি টাকা, যা গত বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ছিল ৩ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা। এতে মাত্র ছয় মাসের ব্যবধানে বেসিক ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি কমেছে ৩ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা।

একটি বিশেষ পদ্ধতিতে বিপুল অঙ্কের এ মূলধন ঘাটতি কমানো হয়। ফলে এখন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে বড় অঙ্কের ঘাটতি আর দেখা যাবে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বেসিক ব্যাংকে লুটপাটকারী কারও বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। অথচ মূলধন ঘাটতির প্রকৃত তথ্য কৌশলে আড়াল করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ যুগান্তরকে বলেন, শেখ আবদুল হাইসহ যারা বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে জড়িত, তাদের অবশ্যই বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে। তবে ব্যাংকটিকে যে ছাড় দেয়া হয়েছে, তা সাময়িকভাবে সমর্থন করি। এর মাধ্যমে যদি ব্যাংকটি উদ্ধার হয়, তাহলে ভালো।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিজেই ভাঙছে তার নিয়ম। তাহলে অভিভাবকহীন নিয়ম কে মানবে? ব্যাংকটির আজকের নাজুক অবস্থার জন্য যারা দায়ী, তাদের কাউকে এখনও বিচারের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়নি। তাহলে কেবল ছাড় দিলে কি বেসিক ব্যাংক উদ্ধার হবে। সুতরাং ছাড়ের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, বেসিক ব্যাংক যে খাদে পড়েছে, তা থেকে উদ্ধারে এর বিকল্প ছিল না। ব্যাংকটিকে বন্ধ করে দেয়ার দাবি উঠেছিল।

এটি বন্ধ করলে আমানতকারীদের ১১ হাজার কোটি টাকা কে দেবে? দ্বিতীয় দাবি ছিল একীভূত করা। এটি করলেও কোনো সমাধান নেই। কারণ এ মুহূর্তে সরকারি কোনো ব্যাংকের এমন সক্ষমতা নেই যে বেসিকের প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণসহ ব্যাংকটিকে কাছে টেনে নিতে পারবে।

এছাড়া বেসিক ব্যাংককে আর কোনো মূলধন জোগান দিতে চাইছে না সরকার। সে কারণে আপাতত ব্যাংকটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ৩ হাজার ২০০ কোটির কিছু বেশি টাকা ছাড় দেয়া হয়েছে। তবে তার অনুরোধ, ছাড় নিয়ে কথা না বলে যারা ব্যাংকটির এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, তাদের শাস্তি নিশ্চিত নিয়ে কথা বলুন। তাহলে আর কোনো ব্যাংকের এমন করুণ পরিণতি হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বেসিক ব্যাংকের ঋণমান অনুযায়ী ৫ হাজার ৬০৮ কোটি টাকা নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণ করার কথা। কিন্তু ব্যাংক তা শতভাগ সংরক্ষণ করতে পারেনি। এর মধ্যে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২ হাজার ৩৫৫ কোটি টাকা সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে, যা মোট সংরক্ষণ চাহিদার ৪২ শতাংশ। যদিও এর সিংহভাগ ইতিমধ্যে সংরক্ষণ করেছে বেসিক।

তবে বাকি ৩ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা আগামী ছয় বছর ধরে ধাপে ধাপে (প্রতি প্রান্তিকে নির্ধারিত অঙ্কের চার ভাগের এক ভাগ) সংরক্ষণের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থাৎ বেসিক ব্যাংককে ৩ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা ছাড় দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

জানতে চাইলে বেসিক ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আহম্মদ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু ছাড় দিয়েছে। তবে কোন উপায়ে এবং কীভাবে দিয়েছে, তা বিস্তারিত বলতে পারবেন ব্যাংকের প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকর্তা (সিএফও)।

বেসিক ব্যাংকের প্রধান অর্থনৈতিক কর্মকর্তা (সিএফও) নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ যুগান্তরকে বলেন, গত বছরের ডিসেম্বর প্রান্তিক থেকে সাত বছরের জন্য প্রভিশন সংরক্ষণে বেসিক ব্যাংককে বিশেষ ছাড় দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

২০১৯-২০২৪ সাল পর্যন্ত ছয় বছর। এর সঙ্গে ২০১৮ সালের তিন মাস যোগ করে তা সাত বছর ধরা হবে বলে জানান তিনি। সিএফও বলেন, ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪২ শতাংশ সংরক্ষণ করতে বলা হয়েছে। বাকি ৫৮ শতাংশ সংরক্ষণ করতে হবে আগামী ছয় বছরে। প্রভিশনে বিশেষ ছাড় দেয়ায় মূলধন ঘাটতি কমে এসেছে।

বেসিক ব্যাংকের বিভিন্ন আর্থিক সূচক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্যাংকটি যাচাই-বাছাই ছাড়া আগ্রাসীভাবে ঋণ দেয় যে এতে গ্রাহককে ঋণ দেয়ার নির্ধারিত সীমা পর্যন্ত অতিক্রম করে ফেলেছে। এখন পর্যন্ত অতিক্রম করা সীমা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের বেঁধে দেয়া নিয়মে বেসিক ব্যাংকের ঋণ-আমানত রেশিও (এডিআর) হওয়ার কথা ছিল ৮৫ শতাংশ।

কিন্তু গত মার্চে ব্যাংকটির এডিআর ছিল ১১৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ। অর্থাৎ ১০০ টাকা আমানত সংগ্রহ করে তা থেকে ৮৫ টাকা ঋণ বিতরণের কথা। কিন্তু বেসিক ব্যাংক ১০০ টাকা আমানতের বিপরীতে ঋণ দিয়েছে ১১৩ টাকা ৩৯ পয়সা, যা আগ্রাসী ব্যাংকিং হিসেবে বিবেচিত।

এছাড়া ব্যাংকটিতে সীমাহীন দুর্নীতি ও ঋণ অনিয়মের ফলে বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৮০৪ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৫৮ দশমিক ২৪ শতাংশ।

ব্যাংকটি গত মার্চ পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করেছে ১৫ হাজার ১১৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে আদায় অনিশ্চিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৫৬ শতাংশ।

প্রসঙ্গত, ২০০৯ সালে শেখ আবদুল হাই বাচ্চুকে চেয়ারম্যান করে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ গঠন করেছিল সরকার। ওই সময় এমডি হিসেবে নিয়োগ পান কাজী ফখরুল ইসলাম।

পর্ষদ এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ঋণের নামে ব্যাংকটির সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। এরপর থেকেই খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি ও লোকসানে ধুঁকছে ব্যাংকটি। ২০১৪ সালে দুর্নীতির দায়ে শেখ আবদুল হাই বাচ্চু পদত্যাগ করেন এবং এমডিকে অপসারণ করা হয়।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×