এবার নতুন চ্যাম্পিয়ন

ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড ফাইনাল, অস্ট্রেলিয়ার বিদায়

  জ্যোতির্ময় মণ্ডল, বার্মিংহাম থেকে ১২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড ফাইনাল

প্রেসবক্সে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানের সাবেক পেসার ওয়াকার ইউনুস বললেন, ‘এই বলেই খেলা শেষ হোক’। জয় থেকে তখন দুই রান দূরে ইংল্যান্ড। ৩৩তম ওভারের প্রথম বলে জেসন বেহরেনডর্ফকে মিডঅন দিয়ে চার মেরে ওয়াকারের কথা সত্যি করলেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক ইয়ন মরগ্যান।

অপরপ্রান্ত থেকে দৌড়ে এসে মরগ্যানকে জড়িয়ে ধরে আবেগে ভাসলেন জো রুট। ওয়াকারের তাড়া ছিল ম্যাচ বিশ্লেষণে যাওয়ার। চার মারা দেখেই তিনি দিলেন ভোঁদৌড়। ইংল্যান্ডের জয়ের ৩০ সেকেন্ডের মধ্যেই বার্মিংহামের আকাশ সুখের কান্নায় ভেঙে পড়ল।

বৃষ্টিও যেন স্বাগতিকদের জয়ের অপেক্ষাতেই ছিল! অস্ট্রেলিয়ার কান্নাও হয়তো সেই বৃষ্টিতে ধুয়ে গেল। দীর্ঘ ২৭ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল ইংল্যান্ড।

বৃহস্পতিবার বার্মিংহামের এজবাস্টনে একপেশে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার ২২৩ রান তাড়া করে হেসেখেলে ইংল্যান্ড জিতেছে আট উইকেটে, ১০৭ বল হাতে রেখে। বিশ্বকাপ এখন এক ম্যাচের টুর্নামেন্ট।

রোববার লর্ডসে শিরোপা যুদ্ধে নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড। দু’বারের চ্যাম্পিয়ন ভারতের পর পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার বিদায়ে নিশ্চিত হয়ে গেল নতুন চ্যাম্পিয়ন পেতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ।

ইংল্যান্ড এর আগে তিনবার ও নিউজিল্যান্ড একবার ফাইনালে খেললেও শিরোপার দেখা পায়নি। সবকিছুরই একটা শেষ থাকে। যে দলটি এর আগে সাতবার সেমিফাইনালে খেলে কখনও হারেনি, সেই অস্ট্রেলিয়াকে এবার রীতিমতো উড়িয়ে দিল ইংল্যান্ড।

মানসিক বাধার দেয়াল গুঁড়িয়ে ১৯৯২ আসরের পর প্রথমবারের মতো ফাইনালের মঞ্চে পা রাখল ক্রিকেটের জনকরা। দু’দিনের ব্যবধানে দুই ফেভারিটের বিদায়। নিউজিল্যান্ডের ভারত বধের পর ইংল্যান্ড অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে বুঝিয়ে দিল কেউই অজেয় নয়।

টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমে অস্ট্রেলিয়া মাত্র ২২৩ রানে অলআউট হলেও তখনও ইংল্যান্ডের জয় নিশ্চিত বলা যাচ্ছিল না। আগেরদিনেই তো বিশ্ব দেখেছে এক লো স্কোরিং থ্রিলার।

নিউজিল্যান্ডকে ২৩৯ রানে থামিয়েও ১৮ রানের হারে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে গেছে ভারত। কাল আর তেমনটা হল না। জেসন রয় ৬৫ বলে ৮৫ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলে আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তের বলি হলেও ততক্ষণে ম্যাচের ভাগ্যলিপি লেখা হয়ে গেছে।

মাত্র ১৭ ওভারে ১২৪ রানের উদ্বোধনী জুটিতে অস্ট্রেলিয়ার ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা শেষ করে দেন রয় ও জনি বেয়ারস্টো (৩৪)। দুই ওপেনারের বিদায়ের পর আর কোনো উইকেট হারায়নি ইংলিশরা।

জো রুট (৪৯*) ও মরগ্যান (৪৫*) সাবলীল ব্যাটিংয়ে ম্যাচ শেষ করে আসেন। ইংল্যান্ডের এ দাপুটে জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছিলেন বোলাররা। ক্রিস ওকস ও আদিল রশিদ পেয়েছেন তিনটি করে উইকেট। জফরা আর্চার নেন দুটি। তবে ম্যাচের পরিস্থিতি বিবেচনায় সেরা হয়েছেন ২০ রানে তিন উইকেট নেয়া ওকস।

বার্মিংহামকে ইংল্যান্ডের সৌভাগ্যের শহর বললে ভুল হবে না। বিশ্বকাপে তাদের সেমিফাইনালের স্বপ্ন যখন ধূসর হতে বসেছিল, তখন এজবাস্টনে এসেই স্বস্তি ফিরেছিল স্বাগতিক শিবিরে।

ভারতকে হারিয়ে তারা বাঁচিয়ে রেখেছিল সেমির স্বপ্ন। সেই এজবাস্টনেই কাল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী অস্ট্রেলিয়াকে উড়িয়ে দিয়ে স্বপ্নপূরণের শেষ ধাপে পা রাখল ইয়ন মরগ্যানের দল। গত আসরের চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া কাল টস জিতে ব্যাটিংয়ে নেমেই পথ হারায়।

৬.১ ওভারে মাত্র ১৪ রানে তিন উইকেট তুলে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার টপঅর্ডার গুঁড়িয়ে দেন ইংল্যান্ডের দুই গতিময় পেসার ওকস ও আর্চার। ১০ ওভার শেষে অস্ট্রেলিয়ার রান ছিল মাত্র ২৭।

তবে স্টিভেন স্মিথ যে বড় ম্যাচের খেলোয়াড় সেটা প্রমাণ করলেন দলের বিপর্যয়ে হাল ধরে। ২০১৫ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ভারতের বিপক্ষে করেছিলেন সেঞ্চুরি। কাল ইংলিশদের বিপক্ষে রানআউটে কাটা পড়ার আগে করলেন ৮৫ রান।

ওকস ও আর্চারের তোপ আর আদিল রশিদের ঘূর্ণির মুখেও স্মিথের দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়েই লড়াইয়ের পুঁজি পায় পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। ৪৯ ওভারে ২২৩ রানে অলআউট হয় অস্ট্রেলিয়া।

আসরের দুটি সেমিফাইনালেই প্রথম ১০ ওভারে আগুন ঝরালেন পেসাররা। ওল্ড ট্রাফোর্ডে প্রথম সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ড প্রথম ১০ ওভারে এক উইকেট হারিয়ে তুলেছিল ২৭ রান। ভারত চার উইকেট হারিয়ে করেছিল ২৪।

কাল এজবাস্টনে একই পথে হাঁটে অস্ট্রেলিয়া। তিন উইকেট হারিয়ে তারা করতে পারে ২৭ রান। ইতিহাস পক্ষে ছিল অস্ট্রেলিয়ার। তারা যে বিশ্বকাপে আগের সাতটি সেমিফাইনালের একটিতেও হারেনি।

এবার সেই ধারায় ছেদ টেনে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার স্বপ্নের পালে জোর হাওয়া লাগে বোলারদের সৌজন্যে। বার্মিংহামের ঝলমলে আকাশ দেখে টস জিতে ব্যাটিংই সঠিক সিদ্ধান্ত মনে করেন অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক অ্যারন ফিঞ্চ।

তবে শুরুতেই ফিঞ্চের হাসি মুছে দেন ওকস ও আর্চার। তাদের যুগল তাণ্ডবে ১৪ রানের মধ্যে সাজঘরের পথ ধরেন ফিঞ্চ, ডেভিড ওয়ার্নার ও বিশ্বকাপে প্রথম খেলতে নামা পিটার হ্যান্ডসকম্ব।

ওকস ও আর্চারের আগুনে বাউন্সারের আঁচ সবচেয়ে বেশি টের পেয়েছেন অ্যালেক্স ক্যারি। আর্চারের চতুর্থ ওভারের একটি গতিময় বাউন্সারে ক্যারির হেলমেট উড়ে যায়। তবে রক্তাক্ত হয়েও দমে যাননি ক্যারি।

চতুর্থ উইকেটে স্মিথ ও ক্যারির ১০৩ রানের জুটিতে অস্ট্রেলিয়া ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজে পায়। তবে শুরুর ধাক্কা সামলানোর জন্য এ জুটিও যথেষ্ট হয়নি। ২৮তম ওভারে মিডলঅর্ডারে আরেকটি ধাক্কা দেন লেগ-স্পিনার আদিল রশিদ।

৭০ বলে ৪৬ রান করা ক্যারি আউট হন আদিল রশিদকে ছক্কা মারতে গিয়ে বাউন্ডারিতে ক্যাচ দিয়ে। ওই ওভারেই স্টয়নিসকেও ফিরিয়ে দেন রশিদ। তবে একপ্রান্তে স্মিথ ছিলেন অবিচল।

ক্যারির পর তাকে কিছুটা সঙ্গ দিয়েছেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল (২২) ও মিচেল স্টার্ক (২৯)। দ্বিতীয় ওভারে ব্যাটিংয়ে নামা স্মিথ এগিয়ে যাচ্ছিলেন সেঞ্চুরির দিকে। কিন্তু রানআউটের দুর্ভাগ্য তাকে থামিয়ে দেয় ৮৫ রানে।

বাটলারের দারুণ থ্রোতে ৪৮তম ওভারে ফেরার আগে তার ১১৯ বলের ইনিংসে ছিল ছয়টি চার। স্মিথের বিদায়ের পর পুরো ৫০ ওভার খেলতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। এক ওভার বাকি থাকতেই ২২৩ রানে গুটিয়ে যায় তারা।

অস্ট্রেলিয়া ২২৩/১০, ৪৯

ইংল্যান্ড ২২৬/২, ৩২.১

ফল : ইংল্যান্ড ৮ উইকেটে জয়ী

ঘটনাপ্রবাহ : আইসিসি বিশ্বকাপ-২০১৯

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×