ঋণ জালিয়াতির টাকা বিদেশে পাচার

বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট, দুর্নীতি দমন কমিশন ও এনবিআরের শুল্ক গোয়েন্দা অধিদফতর তদন্ত করছে * টাকা পাচার বন্ধে কঠোর অবস্থান নিতে ব্যাংকগুলোর প্রতি অর্থনীতিবিদদের পরামর্শ * অর্থ ফেরানোর সুযোগ আছে, উদ্যোগ নেই

  দেলোয়ার হুসেন ১২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঋণ জালিয়াতির টাকা বিদেশে পাচার

ব্যাংকিং খাতে ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা টাকার বড় অংশই বিদেশে পাচার হয়েছে। জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা অসাধু ব্যাংক কর্মকর্তাদের সহায়তায় এসব অর্থ পাচার করেছেন।

মিথ্যা তথ্য দিয়ে ব্যাংকের মাধ্যমে হলমার্ক গ্রুপ ৪৬ কোটি টাকা, বিসমিল্লাহ গ্রুপ ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা, ক্রিসেন্ট গ্রুপ ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, প্যাসিফিক গ্রুপ ৭৩০ কোটি টাকা, বেসিক ব্যাংক থেকে চারটি প্রতিষ্ঠান ১৭৫ কোটি টাকা, ইমাম গ্রুপ ৮৮ কোটি টাকা পাচার করেছে।

এছাড়া আমদানির পণ্য দেশে না এনে, আমদানি পণ্যের মূল্য বেশি দেখিয়ে, রফতানির মূল্য দেশে না এনে, শিল্পের যন্ত্রপাতি আমদানির নামে এসব অর্থ পাচার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, টাকা পাচারের ঘটনাগুলো প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে উঠে এসেছে। বর্তমানে এগুলো নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও এনবিআরের শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর আলাদাভাবে তদন্ত করছে।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী যে কোনো সংস্থার তদন্তে অর্থ পাচারের ঘটনা ধরা পড়লে তা আরও সুনির্দিষ্ট করতে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও মাঠে নামে।

পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তদন্ত প্রতিবেদনগুলো বিএফআইইউ ও দুদকে পাঠাতে হয়। তারা সেগুলো আরও বিশদ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়। এছাড়া শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর থেকেও ব্যবস্থা নেয়া হয়।

এ প্রসঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, টাকা পাচারকারীরা নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে ব্যাংকিং খাতকে বেছে নিয়েছে। আমদানি-রফতানি দুইভাবেই টাকা পাচার হচ্ছে। এর মানে, এসবের সঙ্গে জড়িত ব্যাংক, কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ সঠিকভাবে কাজ করছে না। যে কারণে টাকা পাচার হচ্ছে। এগুলো বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় অর্থনীতি রক্তশূন্য হয়ে যাবে।

বিএফআইইউ’র এক কর্মকর্তা বলেন, তারা কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। গত ছয় মাসে টাকা পাচারের প্রায় অর্ধশতাধিক ঘটনা তদন্ত হয়েছে। আরও তদন্ত চলছে।

সূত্র জানায়, হলমার্ক গ্রুপ সোনালী ব্যাংকসহ ২৬টি ব্যাংক থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করে। এর মধ্যে তারা যুক্তরাজ্যে সোনালী ব্যাংকের মালিকানাধীন সোনালী ব্যাংক ইউকে লিমিটেড থেকে ৬৫ কোটি টাকার একটি এলসির দেনা শোধের নামে পাচার করেছে।

সোনালী ব্যাংকের গ্যারান্টিতে পণ্য আমদানির এলসি খোলা হয়েছিল যুক্তরাজ্যের একটি ব্যাংকে। পণ্য দেশে না আসায় দেনা শোধ করছিল না সংশ্লিষ্ট ব্যাংক। যেহেতু এটি আন্তর্জাতিক দায়, সে কারণে ব্যাংকের ইমেজের স্বার্থে পরিশোধ করতেই হবে। এ কারণে সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে ওই সময়ে সোনালী ব্যাংক ইউকে’কে দেনা পরিশোধের নির্দেশ দেয়া হয়। এই নির্দেশ মোতাবেক ওই অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে। ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ূন কবির এ নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। ঘটনাটি দুদক তদন্ত করছে।

৫টি ব্যাংক থেকে বিসমিল্লাহ গ্রুপ জালিয়াতি করে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর পুরোটাই তারা বিদেশে পাচার করেছে। ওই টাকায় দুবাইয়ে তারা হোটেল ব্যবসা করছে বলে তথ্য পেয়েছে বিএফআইইউ।

ক্রিসেন্ট গ্রুপ জনতা ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে ৫ হাজার কোটি টাকা নিয়েছে। এর মধ্যে তারা ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে বলে তথ্য পেয়েছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। তারা আরও তদন্ত করছে। এ পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। এদিকে তাদের পাচার করা অর্থের ব্যাপারে বিএফআইইউ ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে। তদন্ত শেষে পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হবে।

প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোনো দেশের কাছে পাচার করা অর্থ সম্পর্কে তথ্য চাইতে হলে বিএফআইইউর তদন্তে তা প্রমাণিত হতে হয়। এর ভিত্তিতে বিএফআইইউ বিভিন্ন দেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে পাচার করা অর্থ ফেরত আনতে পারে। কিন্তু বিএফআইইউ থেকে সে রকম জোরালো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না।

প্যাসিফিক গ্রুপ কয়েকটি ব্যাংক থেকে প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর মধ্যে এবি ব্যাংকের গ্যারান্টিতে বেসরকারি খাতের ১২টি ব্যাংক থেকে সিটিসেল ঋণ নিয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা। প্যাসিফিক মোটরস নিয়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা। এসব অর্থের মধ্যে প্রায় ৪৩০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

বেসিক ব্যাংক জালিয়াতি করে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৭৫ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

বেসিক ব্যাংকের দুটি শাখা থেকে আমদানি ও রফতানির মাধ্যমে ১৬টি প্রতিষ্ঠান ১৭৫ কোটি টাকা পাচার করে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাচার করা হয়েছে ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে। শান্তিনগর শাখা থেকে তুলনামূলকভাবে কম পাচার হয়েছে। ছোট ছোট এলসির মাধ্যমে এই টাকা পাচার হয়।

সূত্র জানায়, ব্যাংকের শান্তিনগর শাখার গ্রাহক রিয়াজুল ইসলাম দুবাইভিত্তিক একজন ব্যবসায়ী। তার ব্যবসায়িক অংশীদার হচ্ছেন শাহরিয়ার খান জয়।

তিনি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চুর ছোট ভাই পান্নার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এ কারণে বেসিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হলে ফাইল তৈরির কাজ পড়ত জয়ের ওপর।

যেসব ফাইল জয়ের প্রতিষ্ঠান থেকে তৈরি ওইগুলোর ঋণ দ্রুত পর্ষদে পাস হয়ে যেত। এমনই একটি প্রকল্পের বন্ধকি জমির প্রকৃত মূল্য আড়াই কোটি টাকা।

ব্যাংকে এর মূল্য দেখানো হয়েছে ৪৫ কোটি টাকা। এর বিপরীতে ঋণ দেয়া হয়েছে ২৯ কোটি টাকা। ঋণের পুরো টাকাই বিদেশে পাচার করে দেয়া হয়েছে। ব্যাংকের একই শাখা থেকে ফিয়াজ এন্টারপ্রাইজ ভোগ্যপণ্য আমদানির জন্য লোন এগেনস্ট ট্রাস্ট রিসিপ্টি (এলটিআর) সুবিধা নেয়। কথা ছিল ওই অর্থে আমদানি করা ভোগ্যপণ্য বিক্রি করে ব্যাংকের দেনা শোধ করবেন।

ওই অর্থে তিনি ভোগ্যপণ্য আমদানি করেছেন এমন কোনো তথ্য পায়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এদিকে তিনি ওইসব ঋণও পরিশোধ করেননি। এ খাতে তার বকেয়া ঋণের পরিমাণ ৫০ কোটি টাকা। ফলে ওই অর্থও বিদেশে পাচার করা হয়েছে। এ বিষয়গুলোএখন দুদক থেকে সুনির্দিষ্টভাবে তদন্ত হচ্ছে।

সোনালী ব্যাংকের রমনা কর্পোরেট শাখা থেকে কয়েকটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠান ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। এর মধ্যে পাচার হয়েছে ২২২ কোটি টাকা।

এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সোনালী ব্যাংকের একজন ডিজিএম দেশ ছেড়ে কানাডা চলে গেছেন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় সোনালী ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ডিজিএমের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। এই প্রথম সোনালী ব্যাংক নিজে বাদী হয়ে তার কোনো ডিজিএমের বিরুদ্ধে মামলা করল।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, চট্টগ্রামকেন্দ্রিক ৭টি শিল্প প্রতিষ্ঠান বিদেশ থেকে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য চট্টগ্রামের চারটি ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় এলসি খোলে। এসব এলসির বিপরীতে ১৭৩ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধ করা হয়েছে।

কিন্তু দেশে কোনো শিল্পের কাঁচামাল আসেনি। যেসব কনটেইনারে এসব এলসির বিপরীতে পণ্য এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে সেগুলোর মধ্যে শিল্পের কাঁচামালের পরিবর্তে পাওয়া গেছে ইটের গুঁড়া, আবর্জনাময় বালি, বিভিন্ন পণ্যের পোড়া অংশের ছাই, গুঁড়া পাথর ও সিমেন্টের ব্লক।

চট্টগ্রামের এবি অ্যান্ড ডি কর্পোরেশন, আরামিট থাই অ্যালুমিনিয়াম, এসআর মেটাল ইন্ডাস্ট্রিজ, এসএল স্টিল, এলএসআই, ইয়াছির এন্টারপ্রাইজ ও সেবা এন্টারপ্রাইজের নামে এলসিগুলো খোলা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, যেহেতু ব্যাংকের মাধ্যমে দেনা শোধ করা হয়েছে, কিন্তু পণ্য আসেনি- এর মানে হচ্ছে ওই সব টাকা পাচার করা হয়েছে। এ ঘটনাটি এখন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর থেকে তদন্ত হচ্ছে।

ইমাম গ্রুপের ঋণের পরিমাণ ৮০০ কোটি টাকা। যার পুরোটাই খেলাপি। এর মধ্যে একটি ব্যাংকের চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ শাখা থেকে ইমাম ট্রেডার্সকে ১৭৫ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়। এর ১০০ কোটি টাকা এলসির বিপরীতে এবং ৭৫ কোটি টাকা এলটিআর। এসব ঋণের টাকায় পণ্য আমদানি করার কথা। বাস্তবে বেশির ভাগ পণ্যই দেশে আসেনি। এসব অর্থও বিদেশে পাচার হয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×