বন্ধ হচ্ছে পিপলস লিজিং

অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় আমানতকারীরা

প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের (পিএলএফএসএল) আমানতকারীসহ প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে।

নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত অনেকেরই অসুস্থ হওয়ার অবস্থা। অনেকে দীর্ঘ চাকরি জীবনে যে সঞ্চয়টুকু করেছেন তাও আটকা পড়েছে প্রতিষ্ঠানের কাছে।

সাধারণ আমানতকারীদেরও ছোটাছুটি করতে দেখা গেল। তাদের আটকে পড়া আমানতের পরিমাণ প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা। অর্থ ফেরত পাওয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকের আশ্বাসের পরও তারা আশ্বস্ত হতে পারছে না।

কিভাবে তারা ঢাকা ফেরত পাবে এর কোনো উত্তর দিতে পারেননি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সামি হুদা। এ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে-বাইরে চরম হতাশা বিরাজ করছে।

বৃহস্পতিবার পিপলস লিজিংয়ের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে আমানতকারীদের প্রচণ্ড ভিড় লক্ষ্য করা গেল। আমানতের টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে অনেককেই দৌড়ঝাঁপ করতে দেখা যায়। জানার চেষ্টা করছিলেন কিভাবে তারা তাদের টাকা ফেরত পাবেন।

কিন্তু কেউ-ই সন্তোষজনক উত্তর পাননি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। অনেককে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখা যায়। আমানতকারীরা একটি টোকেন হাতে নিয়েই বাড়ি ফিরেছেন। কথা হয় পিপলস লিজিংয়ের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজী আহমেদের সঙ্গে।

তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, দু’দিন থেকে আমাদের অফিসে আমানতকারীরা ভিড় করছেন। তাদের কিভাবে সান্ত্বনা দেব, সে ভাষা জানা নেই। আমাদের অফিসে কর্মী সংখ্যা ২৫০ জন। আমানতকারীদের পাশাপাশি আমরাও হতাশ।

বলতে পারেন এক ধরনের অসুস্থ জীবনযাপন করছি। এই বয়সে চাকরি কোথায় পাব। আবার আমাদের জমানো টাকাগুলো ফিরে পাব কিনা সেটাও জানি না। আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির এমডি সামি হুদা জানান, বিষয়টা এখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

জানি না ভবিষ্যতে কি হতে যাচ্ছে। বলতে পারেন আমার নিজেরই এখন চাকরি নেই।

কথা হয় মিরপুর ১২ নম্বর থেকে আসা সালমা আক্তারের সঙ্গে। তিনি জানান, আমার জীবনের শেষ সম্বল ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকা পিপলস লিজিংয়ে রেখেছিলাম। এত বড় বিপদে পড়ক চিন্তাও করতে পারিনি। কোথায় গেলে টাকা ফিরে পাব, কিভাবে পাব এবং কতদিনে পাব এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।

দুই বছর আগে চাকরি হারিয়ে এই টাকাটাই আমার একমাত্র সম্বল। এ ব্যাপারে তিনি সাংবাদিকদের সহযোগিতা চেয়েছেন। রফিকুল ইসলাম নামের আরও একজন আমানতকারী জানান, আমার ৯ কোটি টাকা রয়েছে।

শুধু এখানে নয়, আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ অন্য লিজিং কোম্পানিতেও রয়েছে। পিপলস লিজিং দেখে অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে টাকা তোলার জন্য আবেদন করেছি। তারাও টাকা দিতে পারছে না। ওই প্রতিষ্ঠানগুলো আবার বন্ধ হবে কিনা তা নিয়েও দুশ্চিন্তায় আছি।

গত সপ্তাহেও সরগরম ছিল পিপলস লিজিংয়ের প্রধান কার্যালয়। কয়েকদিনের ব্যবধানে পাল্টে গেছে সেই দৃশ্যপট। কারও মাঝে চাকরি হারানোর হতাশা, কারও মাঝে আমানত হারানোর হতাশা। মূলত পিপলস লিজিং বন্ধের প্রক্রিয়াটি গোপনে চললেও এটি দৃশ্যমান হয় বুধবার।

ওইদিন বিকালে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃসংবাদটি জানায়। এ সময় আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেয়ার আশ্বাসও দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

মালিকপক্ষের লুটপাটে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতিষ্ঠান বন্ধের খবর গণমাধ্যমে শুনে বৃহস্পতিবার আমানতকারীরা ছুটে যান পিপলস লিজিং কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে। জমানো টাকা কিভাবে ফেরত পাবেন, সে বিষয়টি জানার চেষ্টা করলেও কোনো সদুত্তর পাননি তারা।

প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী জানান, আগের পর্ষদের অনিয়মের দায় কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। ৩ বছর বন্ধ ঋণ কার্যক্রম। তবে সবার মতো তারও চাওয়া আমানতকারীরা যেন তাদের টাকা ফেরত পান।

প্রতিষ্ঠানটির বিতরণ করা ১১শ’ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৭শ’ কোটি টাকাই খেলাপি। যার বেশির ভাগই নামে-বেনামে বের করে নিয়েছে মালিকপক্ষ।

তবে বুধবার সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেছেন, আমানতকারীর অর্থ কোন উপায়ে ফেরত দেয়া হবে, সে বিষয়ে আইনে কিছু বলা নেই। এক্ষেত্রে আদালত যে উপায়ে অর্থ পরিশোধ করতে বলবেন, সেভাবেই করা হবে।