কুমিল্লায় আদালত কক্ষে বিচারকের সামনে খুন

হত্যা মামলায় হাজিরা দিতে এসে আসামির উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে ঢলে পড়ে অপর আসামি

  কুমিল্লা ব্যুরো ১৬ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আসামি হাসান
আসামি হাসান। ছবি: যুগান্তর

কুমিল্লায় আদালত কক্ষে বিচারক ফাতেমা ফেরদৌসের উপস্থিতিতে হত্যা মামলার শুনানি চলাকালে এক আসামি অপর আসামিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে। সোমবার দুপুরে অতিরিক্ত ৩য় দায়রা জজ আদালতে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

দুই আসামিই সম্পর্কে চাচাতো ভাই। ২০১৩ সালের হাজী আবদুল করিম হত্যা মামলার শুনানির দিন ছিল সোমবার। নিহত রাজমিস্ত্রি ফারুক (৩০) কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার কান্দি গ্রামের ওয়াহিদুল্লার ছেলে। ঘাতকের নাম হাসান (২৫)। সে লাকসাম উপজেলা ভোচপাড়া গ্রামের মৃত শহীদুল্লার ছেলে।

হাজী আবদুল করিম ছিলেন ঘাতক হাসানের সৎপিতা এবং ফারুকের চাচা। এরা দু’জনেই জামিনে ছিল। ঘাতক হাসানকে আদালত কক্ষেই গ্রেফতার করা হয়েছে। হত্যা মামলার আসামি হওয়ার জন্য হাসান দায়ী করছিল ফারুককে। এ ক্ষোভ থেকেই সে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খোদ আদালত কক্ষে ছুরি নিয়ে একজন আসামি কীভাবে প্রবেশ করল, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান জেলা ও দায়রা জজ, পুলিশ সুপারসহ পিবিআই কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় আদালত প্রাঙ্গণে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আদালতের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। এ বিষয়ে পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, ঘাতক হাসানকে আটক করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলার প্রস্তুতি চলছে।

এ ঘটনার পর থেকে আদালতের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাহ উদ্দিন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, ফারুককে ছুরিকাঘাত করার পর আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতাল এবং পরে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পর ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

কথা হয় বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের রোল অ্যান্ড পাবলিকেশনের সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট কাইমুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, আদালত প্রাঙ্গণে পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঘাতক হাসান এত বড় ছুরি নিয়ে কীভাবে প্রবেশ করল, সে প্রশ্ন আমাদেরও। এজলাসে এমন ঘটনা আমাদের খুবই শঙ্কিত করে তুলেছে, আমরা খুবই উদ্বিগ্ন। আদালতে পুলিশকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং বিচারালয়ের মতো স্পর্শকাতর স্থানটিকে নিরাপদ রাখতে হবে।

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, আদালতের প্রতিটি কক্ষেই পুলিশ নিয়োজিত থাকে, তারপরও এমন একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটে গেছে। তিনি বলেন, প্রতিদিনই আদালতে হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটে।

আমরা যদি প্রতিটি মানুষের দেহ তল্লাশির আওতায় নিয়ে আসি সে ক্ষেত্রে আইনজীবী এবং তাদের সহকারীসহ আদালতে কর্মরতরাও বিব্রত হন। এ ঘটনার পর আমরা জেলা জজের সঙ্গে আলোচনা করেছি। নিরাপত্তা এবং তল্লাশির বিষয়ে জেলা জজের সম্মতিক্রমে পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।

পুলিশ জানায়, সোমবার জেলার মনোহরগঞ্জ থানার হাজী আবদুল করিম হত্যা মামলায় হাজিরা দিতে আসে হাসান ও ফারুক। বিচারক ফাতেমা ফেরদৌস এজলাসে বসলে শুরু হয় আদালতের কার্যক্রম। শুনানি শুরু হলে আইনজীবীরা তাদের বক্তব্য উপস্থাপন করছিলেন। এমন সময় হাসান কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামি ফারুককে একের পর এক আঘাত করতে থাকে। কিল-ঘুষির সঙ্গে ফারুকের ওপর উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করতে থাকে।

আদালত কক্ষে সবাই অবাক বিস্ময়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকেন। তারা বুঝে উঠতে পারছিল না, আসলে কী হতে যাচ্ছে। আদালত কক্ষে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিরুপায় ফারুক দৌড়ে এজলাসের পাশে বিচারকের খাস কামরায় ছুটে গেলে হাসান সেখানে গিয়েও তাকে ছুরিকাঘাত করতে থাকে। এতে রক্তে ভেসে যায় আদালত কক্ষটি।

একপর্যায়ে পুলিশ হাসানকে আটক করে। পুরো ঘটনা বিচারকের সামনেই ঘটে। উপস্থিত আইনজীবী এবং তাদের সহকারীরা ফারুককে উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আদালতের বারান্দাসহ আশপাশের লোকজন দিগ্বিদিক ছোটাছুটি শুরু করেন।

কুমিল্লা বারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দ নুরুর রহমান বলেন, কুমিল্লার আদালতে এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা আগে ঘটেনি, এমন দুঃসাহস কোনো ব্যক্তি আগে কখনও দেখায়নি। এ ঘটনায় আদালতের বিচারক, আইনজীবীসহ সবাই হতাশ এবং শঙ্কিত। ঘাতকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

তদন্ত কমিটি গঠন : চাঞ্চল্যকর এ হত্যার ঘটনায় জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। পদোন্নতিপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তানভীর সালেহীন ইমন এবং ডিআইও-১ মাহবুব মোরশেদ।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×