নিষ্ঠুর নিয়ম!

ইংল্যান্ডের মাথায় মুকুট, হারেনি নিউজিল্যান্ডও

প্রকাশ : ১৬ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ইশতিয়াক সজীব

ইংল্যান্ড-নিউজিল্যান্ড। ছবি: সংগৃহীত

টুইটারে এক ক্রিকেটপ্রেমীর প্রশ্ন, ‘এর চেয়ে দুই দলকে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করাটা কি যৌক্তিক হতো না?’ আরেকজন লিখেছেন, ‘ওয়ানডে ইতিহাসের সেরা ম্যাচে এক উদ্ভট নিয়মে ইংল্যান্ডকে জিতিয়ে ক্রিকেটকে হারিয়ে দিল আইসিসি।’

নিউজিল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক স্টিফেন ফ্লেমিং এক শব্দে বলে দিয়েছেন সবকিছু, ‘নিষ্ঠুর!’ শুধু বাউন্ডারি সংখ্যা বিবেচনায় বিশ্বকাপ ট্রফির নিষ্পত্তি নিয়ে রোববার রাত থেকে ঝড় চলছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। ২০১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালকে বলা হচ্ছে ওয়ানডে ইতিহাসের সেরা ম্যাচ।

ক্রিকেট তার গৌরবময় অনিশ্চয়তা ও সৌন্দর্যের সবটুকু ঢেলে দিয়েছিল লর্ডসের রবিবাসরীয় ফাইনালে। যেখানে রান কিংবা উইকেটের ব্যবধানে নয়, ম্যাচের ফল লেখা হয়েছে বাউন্ডারির হিসাবে। ২৬-১৭ ব্যবধানে নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হল ইংল্যান্ড! পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকা ম্যাচের ভাগ্য বদল হয়েছে অসংখ্যবার।

অবিশ্বাস্য নাটকীয়তায় ভরা শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচ টাই হয়ে গড়ায় সুপার ওভারে। সেখানেও রোমাঞ্চের তীব্র দুলুনি শেষে আবারও ‘টাই’। একই ম্যাচে দু’বার স্কোর সমান। শেষ পর্যন্ত আইসিসির টাইব্রেক নিয়মের একটি ধারা মেনে শিরোপার ফয়সালা হয়েছে বাউন্ডারির হিসাবে।

সুপার ওভারসহ গোটা ম্যাচে ইংলিশদের চার ও ছক্কা ছিল মোট ২৬টি, নিউজিল্যান্ডের ১৭টি। ট্রফির ভাগ্য লেখা হয়েছে এখানেই। এমন সমানে সমান লড়াইয়ের পর বিশ্বকাপ শিরোপার নিষ্পত্তি হয়েছে যে নিয়মে, তা মেনে নিতে পারছেন না অনেকেই।

এক বাক্যে সবাই বলছেন, শিরোপা ইংল্যান্ড জিতলেও হারেনি নিউজিল্যান্ড। সাবেক তারকাদের অভিমত, অপ্রচলিত বাউন্ডারি-নিয়মে ইংল্যান্ডের হাতে শিরোপা তুলে না দিয়ে দুই দলকে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা উচিত ছিল।

অযৌক্তিক বাউন্ডারি নিয়মের সমালোচনা করে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পেসার ব্রেট লি বলেছেন, ‘বিজয়ী বাছাইয়ের খুব বাজে একটি পদ্ধতি এটি। এ নিয়ম বদলাতেই হবে।’

অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি লেগ-স্পিনার শেন ওয়ার্নারের অভিমত, ‘খেলার মানদণ্ডে নিউজিল্যান্ডই আসল বিজয়ী। ফল যাই হোক, তারা হারেনি।’ আরেক সাবেক অসি তারকা ডিন জোন্সও প্রশ্ন তুলেছেন বাউন্ডারি-নিয়মের যৌক্তিকতা নিয়ে, ‘নিয়মটি নিয়ে ভাবা উচিত। অন্তত আরেকটি সুপার ওভার হতে পারত।

বিশ্বকাপ ফাইনালের চূড়ান্ত ফল বাউন্ডারি সংখ্যার ওপর ভিত্তি কর হতে পারে না।’ ভারতের সাবেক ওপেনার গৌতম গম্ভীরও তুলেছেন একই প্রশ্ন, ‘এত বড় মাপের ম্যাচের চূড়ান্ত ফল কীভাবে বাউন্ডারি বেশি মারা দিয়ে নির্ধারিত হয়, তা আমার বোধগম্য নয়।

অদ্ভুত নিয়ম। ম্যাচ টাই হওয়া উচিত ছিল।’ ভারতের ২০১১ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক যুবরাজ সিং বলেছেন, ‘এই নিয়মের সঙ্গে আমি একমত নই। তবে নিয়ম তো নিয়মই।’

ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ভনের টুইট, ‘এই ম্যাচে কোনো দলেই হার প্রাপ্য ছিল না। ক্রিকেটের জন্য, দুর্দান্ত একদিন। এটাই নতুন প্রজন্মকে ক্রিকেটের প্রতি উৎসাহিত করবে।’ এ ধরনের সান্ত্বনায় অবশ্য মন গলছে না কিউইদের। ক্ষোভে ফুঁসছে নিউজিল্যান্ডের গণমাধ্যম। সাবেকরা পুড়ছেন আক্ষেপে।

আইসিসিকে কটাক্ষ করে সাবেক কিউই অলরাউন্ডার স্কট স্টাইরিসের টুইট, ‘ভালোই দেখাল আইসিসি। আপনারা সত্যিই রসিক!’ নিউজিল্যান্ড হেরাল্ড লিখেছে, ‘২২ নায়কের ফাইনালে কেউ জেতেনি। নিষ্ঠুর বাউন্ডারি-নিয়ম নিউজিল্যান্ডের জয় ছিনতাই করেছে।’ নিউজিল্যান্ডের ক্রীড়ামন্ত্রী গ্র্যান্ট রবার্টসনের কণ্ঠেও মৃদু আক্ষেপ, ‘এমন অসাধারণ একটি ম্যাচের এমন সমাপ্তি প্রাপ্য ছিল না। তবে এই দলকে নিয়ে গর্বিত গোটা দেশ।’

সবচেয়ে বেশি আক্ষেপে পোড়ার কথা যার সেই কেন উইলিয়ামসন কিন্তু বিতর্ক উস্কে না দিয়ে উল্টো স্পোর্টসম্যানশিপের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। স্বপ্নভঙ্গের হতাশা নিয়েই নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক বলেছেন, ‘এখন যে তীব্র আবেগ কাজ করছে তাতে এমন কিছু মেনে নেয়া কঠিন। কিন্তু নিয়ম তো নিয়মই।

সবার জন্যই তা এক। আইসিসিও হয়তো ভাবতে পারেনি এই নিয়ম কখনও ব্যবহার করতে হবে। আপনিও নিশ্চয় ভাবেননি এমন প্রশ্ন করতে হবে। আমিও ভাবিনি এমন কিছুর উত্তর দিতে হবে। কীভাবে ইংল্যান্ড জিতল? বাউন্ডারি বা এমন কিছুতে! দিনশেষে কোনো একটি দলকে শিরোপা পেতেই হতো। আমি হতাশ এজন্য যে, সেই দলটি আমরা নই।’

ইংল্যান্ড অধিনায়ক ইয়ন মরগ্যানের কথার সুরও অনেকটা একইরকম, ‘সূক্ষ্মতম যে ব্যবধান ছিল, তা যে কোনো দিকেই যেতে পারত। সৌভাগ্যবশত সেটি আমাদের দিকে এসেছে। অবিশ্বাস্য এই ম্যাচে দুই দলকে আলাদা করার মতো কিছুই ছিল না। নিয়ম অনেক আগেই করা হয়েছে। এসবের ওপর আমাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।’