১৩ কোটি টাকার ঋণ ১৯ কোটিতেও শোধ হয়নি

আরও পাওনা দাবি ৩৩ কোটি * প্রতিকার চেয়ে দুদক ও র‌্যাব কার্যালয়ে চিঠি

  তোহুর আহমদ ১৬ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঋণ
ঋণ। প্রতীকী ছবি

১৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ১৯ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও ঋণের টাকা শোধ হচ্ছে না। ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান আরও দাবি করছে ৩৩ কোটি টাকা। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের এমন ঋণ নৈরাজ্যের অভিযোগ ভূরিভূরি। তবে এবার ঋণগ্রহীতার অভিযোগ মামলা পর্যন্ত গড়িয়েছে।

ঋণসংক্রান্ত জটিলতায় বিবদমান দুই প্রতিষ্ঠান হচ্ছে নর্দান ইউনিভার্সিটি পরিচালনাকারী আইবিএটি ট্রাস্ট (বর্তমানে এনইউবি ট্রাস্ট) এবং ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ফিনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেড।

উভয় প্রতিষ্ঠান এখন মুখোমুখি অবস্থানে। দু’পক্ষই নিজেদের দাবিতে অটল। দ্বন্দ্ব নিরসনে উভয় পক্ষের মধ্যে একাধিক সমঝোতা বৈঠক হলেও তা সফল হয়নি। ইতিমধ্যে বিষয়টির মীমাংসা চেয়ে একাধিক আবেদন বাংলাদেশ ব্যাংক ছাড়িয়ে দুদক ও র‌্যাব কার্যালয়েও পৌঁছেছে।

বন্ধকী সম্পদ বিক্রির অভিযোগ : মামলার এজাহার ও দুদক চেয়ারম্যানের কাছে জমা দেয়া লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালে ফিনিক্স ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের সঙ্গে আইবিএটি ট্রাস্টের একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী ফিনিক্স তাদের মালিকানাধীন ৪টি বাণিজ্যিক ফ্লোর ট্রাস্টের কাছে বিক্রি করবে।

যার দাম ধরা হয় ১৮ কোটি টাকা। এজন্য ট্রাস্টের নামে উচ্চ সুদে ১৩ কোটি টাকা ঋণ দেয় ফিনিক্স। ঋণদাতা ও সম্পত্তি বিক্রেতা একই প্রতিষ্ঠান হওয়ার সুবিধা কাজে লাগায় ফিনিক্স। নজিরবিহীনভাবে তারা একদিক দিয়ে ঋণের নামে টাকা ছাড় করে, অন্য দিক দিয়ে ফ্লোর বিক্রির নামে টাকা ফিরিয়ে নেয়।

এমনকি সম্পত্তি বন্ধক থাকার তথ্য গোপন করে ট্রাস্টের নামে তিনটি ফ্লোর রেজিস্ট্রি করে দেয়া হয়। একপর্যায়ে জানা যায়, ফিনিক্সের বিক্রি করা সম্পত্তি একটি বেসরকারি ব্যাংকে বন্ধক রয়েছে। ঘটনা জানার পর ফিনিক্সের কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হয়। কিন্তু ফিনিক্স কোনো যুক্তিযুক্ত জবাব না দিয়ে টালবাহনার পথ বেছে নেয়।

ফিনিক্স দাবি করে বিক্রীত সম্পত্তি সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক। ব্যাংকে দায়বদ্ধ থাকার বিষয়টি তাদের জানা নেই। উভয় পক্ষের চিঠি চালাচালির একপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আরেকটি চিঠি হাতে পায় আইবিএটি ট্রাস্ট। যাতে ফিনিক্সের জালিয়াতির বিষয়টি দিবালকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায়।

কারণ, ট্রাস্টের কাছে সম্পত্তি বিক্রির এক বছর আগে ২০০৭ সালের ৯ আগস্ট এক পত্রের মাধ্যমে ফিনিক্স ফাইন্যান্সকে বন্ধক সম্পর্কে অবহিত পত্র দেয় ব্যাংক। কিন্তু বিষয়টি জানার আগেই ফিনিক্স ফাইন্যান্সকে সুদসহ ঋণের ১৫ কোটি ২৩ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়ে যায়।

ফলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে আইবিএটি ট্রাস্ট। একদিকে সুদসহ বিপুল অংকের টাকা পরিশোধ করা হয়ে গেছে, অন্যদিকে ব্যাংকে বন্ধক থাকায় সম্পদের নিষ্কণ্টক মালিকানাও পাওয়া যাচ্ছে না। আইবিএটি ট্রাস্টের আমছালা দুটোই যাওয়ার উপক্রম।

অনেকটা মরিয়া হয়ে বন্ধকী ফ্লোর বিক্রির জবাব চেয়ে ফিনিক্স ফাইন্যান্স কর্তৃপক্ষকে দাফায় দফায় চিঠি দেয় আইবিএটি ট্রাস্ট। সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নিতে অনুরোধ করা হয়। কিন্তু কোনো কিছুতেই সাড়া দেয়নি ফিনিক্স। উল্টো ঋণের সুদসহ কথিত পাওনার অংক তারা বাড়িয়েই চলে। ট্রাস্টকে টাকা পরিশোধের জন্য নানা হুমকিও দেয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকে চিঠি : একপর্যায়ে ঘটনার বিশদ বিবরণ দিয়ে বিষয়টি লিখিতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের উচ্চপর্যায়কে জানানো হয়। ২০১৬ সালের ৪ ডিসেম্বর আইবিএটি ট্রাস্ট বাংলাদেশ ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজারকে লেখা এক চিঠিতে জানায়, ফিনিক্স ফাইন্যান্স ২০০৮ সালের ১০ জুলাই ৪টি ফ্লোর বিক্রির জন্য আইবিএটি ট্রাস্টের সঙ্গে চুক্তি করে।

একই তারিখে তারা ট্রাস্টের অনুকূলে ১৩ কোটি টাকা ঋণও মঞ্জুর করে। একই দিনে সম্পত্তি বিক্রির চুক্তি ও দ্রুততম সময়ে ঋণ মঞ্জুরের প্রক্রিয়া দেখলেই বোঝা যায়, ত্রুটিপূর্ণ সম্পত্তি দ্রুত বিক্রির জন্য তড়িঘড়ি ঋণ অনুমোদন করা হয়েছে।

দুদক চেয়ারম্যানের কাছে দেয়া অপর এক অভিযোগে বলা হয়, একদিকে জালিয়াতির মাধ্যমে সম্পদ বিক্রি অন্যদিকে ট্রাস্টকে ফাঁদে ফেলে কৌশলে ঋণের তিন গুণ টাকা আদায়ের কৌশল ফিনিক্সের। দুর্নীতির মাধ্যমে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে তারা দ্রুত ঋণ দেয়ার নামে ত্রুটিপূর্ণ সম্পত্তি ট্রাস্টের কাছে বিক্রি করে।

এ বিষয়ে যথাযথ কৈফিয়ত চাওয়া হলে ফিনিক্সের পক্ষ থেকে কোনো সদুত্তর দেয়া হয়নি। উল্টো বারবার তারা ঋণের টাকা পরিশোধের তাগাদা দেয়। এমনকি বেআইনিভাবে নানা উসিলায় দণ্ড সুদ, বকেয়া সুদ এবং চক্রবৃদ্ধি সুদসহ আরও নানা নিয়মের মারপ্যাঁচে ফেলে ঋণের অংককে পাহাড়সম বানায়।

সর্বশেষ, তারা ট্রাস্টের কাছে ৫৫ কোটি টাকা পাওনা দাবি করে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী, ১৩ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে এক টাকাও পরিশোধ না করলে ট্রাস্টের সর্বোচ্চ দায় ৩৯ কোটি টাকার বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। সেখানে ফিনিক্স ৫৫ কোটি টাকার দাবি তুলেছে।

ফিনিক্সের জবাব : বাংলাদেশ ব্যাংকে আইবিএটি ট্রাস্টের অভিযোগ খণ্ডন করে দফাওয়ারি জবাব দেয় ফিনিক্স ফাইন্যান্স। ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর এক চিঠিতে তারা বলছে, আইবিএটি ট্রাস্টকে তারা ফ্লোর কেনার জন্য কোনো ঋণ দেয়নি।

ট্রাস্টের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নর্দান ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের জন্য ১৩ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়। আর ট্রাস্টের কাছে বিক্রীত সম্পত্তি ব্যাংকে দায়বদ্ধ থাকার বিষয়টি সঠিক নয়।

ঋণের টাকা যথাসময়ে পরিশোধ না করায় ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্বিন্যাস করায় আরোপিত সুদসহ সমুদয় পাওনা অনুমোদিত ঋণের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে গেছে। এ বিষয়ে ট্রাস্টের চেয়ারম্যানের সঙ্গে একাধিক সমঝোতা বৈঠক করা হলে তারা সুদসহ ঋণ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েও বরখেলাপ করে। তারা পাওনা পরিশোধ না করে অস্বাভাবিক আচরণে লিপ্ত।

এদিকে সমঝোতার সব প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ায় আদালতের দ্বারস্থ হয় আইবিএটি ট্রাস্ট। প্রতারণার মাধ্যমে সম্পত্তি বিক্রি ও চেক জালিয়াতির অভিযোগে গত বছর মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে দায়েরকৃত মামলায় আসামি ফিনিক্স ফাইন্যান্সের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

মামলা আমলে নিয়ে ফিনিক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম ইন্তেখাব আলমের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পারোয়ানা জারি করেন আদালত।

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে ফিনিক্স ফাইন্যান্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম ইন্তেখাব আলম সোমবার যুগান্তরকে বলেন, দুদক বা র‌্যাব কেন তারা যেখানে ইচ্ছে অভিযোগ করুক। সুদ-আসলসহ ঋণের সমুদয় পাওনা তাদের দিতেই হবে।

কারণ, আমরা শক্ত আইনগত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছি। আইবিএটি ট্রাস্টের মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তাদের মামলাটি সাজানো। তারপরও সেটি আইনগতভাবেই মোকাবেলা করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে ট্রাস্টের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু ইউসুফ মো. আবদুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, ঋণের ফাঁদে ফেলে অভিনব উপায়ে ফিনিক্স ফাইন্যান্স আমাদের কাছ থেকে বিপুল অংকের টাকা হাতিয়ে নেয়ার তৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে। তারা একদিকে সত্য গোপন করে জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকের কাছে বন্ধক থাকা সম্পদ আমাদের কাছে বিক্রি করেছে।

অন্যদিকে নজিরবিহীনভাবে ২৭ পার্সেন্ট পর্যন্ত ঋণের সুদ ধার্য করে বিরাট অংকের দায়-দেনার হিসাব খাড়া করেছে। আমরা ন্যায়বিচারের আশায় সরকারের উচ্চপর্যায়কে বিষয়টি অবহিত করেছি। তাদের বিরুদ্ধে আদালতেও মামলা করা হয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×