দুর্নীতির অর্থ থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ

মিজান-বাছিরের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

মিজান-বাছির সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে ঘুষ লেনদেন সংক্রান্ত অপরাধে জড়িয়েছেন * আত্মরক্ষার্থে ডিআইজি মিজান দুর্নীতির টাকা থেকে ঘুষ দেন * বাছির আর্থিকভাবে লাভবান হতে মিজানকে অবৈধ সুযোগ দেয়ার ব্যবস্থা করে * ঘুষ লেনদেনের বিষয়ে কথা হয় রমনাপার্কে, টাকার ব্যাগ হস্তান্তর হয় শাহজাহানপুর ও শান্তিবাগে

  যুগান্তর রিপোর্ট ১৭ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মিজান-বাছিরের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা
ফাইল ছবি

চল্লিশ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে মিজান ও বাছিরের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। মঙ্গলবার বিকালে দুদকের পরিচালক শেখ মোহাম্মদ ফানাফিল্লা বাদী হয়ে দুদকের ঢাকা জেলা সমন্বিত কার্যালয়ে এ মামলা দায়ের করেন। দণ্ডবিধির ১৬১/১৬৫(ক)/১০৯ ধারা, ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারা এবং ২০১২ সালের মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের ৪(২)(৩) ধারায় দু’জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

এর আগে অনুসন্ধান টিমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এদিন দুপুরে দু’জনের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দেয় কমিশন।

মামলায় বলা হয়, ডিআইজি মিজানুর রহমান অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানের ফলাফল নিজের পক্ষে নেয়ার অসৎ উদ্দেশ্যে দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরকে অবৈধভাবে প্রভাবিত করেন। আর এজন্য তিনি অবৈধ পন্থায় অর্জিত অপরাধলব্ধ আয় থেকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ প্রদানের মাধ্যমে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

দুদক পরিচালক সাময়িক বরখাস্ত খন্দকার এনামুল বাছিরকে যে কোনো সময় গ্রেফতার করা হতে পারে। অপরদিকে গ্রেফতারের পর সাময়িক বরখাস্ত ডিআইজি মিজানুর রহমান কারাগারে থাকায় তাকে এ মামলায় গ্রেফতার দেখানো হতে পারে।

মামলায় বলা হয়, দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কমিশন থেকে অর্পিত দায়িত্ব পালনকালে অসৎ উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ডিআইজি মো. মিজানুর রহমানকে অবৈধ সুবিধা দেয়ার সুযোগ করে দেন।

ডিআইজি মিজান সরকারি কর্মকর্তা হয়ে নিজের বিরুদ্ধে আনীত অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার আশায় ঘুষ লেনদেনে জড়িয়ে পড়েন, যা দুদকের অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয়েছে।

দুদকের সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখত বিকালে এ মামলার বিষয়ে সাংবাদিকদের অবহিত করেন। তিনি বলেন, দু’জন সরকারি কর্মচারী ক্ষমতার অপব্যবহার করে অপরাধে জড়িয়েছেন।

মামলার আসামি হিসেবে পরিচালক বাছিরকে গ্রেফতার করা হবে কিনা জানতে চাইলে সচিব বলেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। আইন তার নিজের গতিতে চলবে। আসামি গ্রেফতার হবে কিনা সেটা তদন্ত কর্মকর্তাদের বিষয়।

সূত্র জানায়, মামলা রুজুর পরপরই দুদকের একটি টিম খন্দকার এনামুল বাছিরকে গ্রেফতার করার জন্য রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালায়। খবর পেয়ে বাছির আত্মগোপন করেছেন বলে কমিশন জানতে পেরেছে। এর আগে ২৪ জুন ডিআইজি মিজান, তার স্ত্রী রত্না রহমান, ভাই মাহবুব ও ভাগ্নে পুলিশের এসআই মাহমুদুল হাসানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ ও মানি লন্ডারিংয়ের মামলা করে দুদক।

ওই মামলায় হাইকোর্টে আগাম জামিন নিতে গেলে আদালত ডিআইজি মিজানের জামিনের আবেদন নাকচ করে দিয়ে তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দেন। পরে শাহবাগ থানা পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে জেলে পাঠায়।

মামলার এজাহারে বলা হয়, দুদক টিমের অনুসন্ধানকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, সংগৃহীত ও প্রাপ্ত রেকর্ডপত্র, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) ফরেনসিক প্রতিবেদন ও প্রত্যক্ষ সাক্ষীদের বক্তব্যসহ সার্বিক পর্যালোচনায় দুই আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে।

ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশন অনুসন্ধানের জন্য গৃহীত হয়। এরপর ২০১৮ সালের ২৫ অক্টোবর অভিযোগটি অনুসন্ধানের জন্য খন্দকার এনামুল বাছিরের নামে হাওলা করা হয়।

তিনি গত ২৯ অক্টোবর অনুসন্ধানভার গ্রহণ করেন। ওই অনুসন্ধান চলমান থাকাবস্থায় গত ৯ জুন বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় এই মর্মে সংবাদ প্রচারিত হয় যে, ডিআইজি মিজান দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরকে ৪০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়েছেন।

এই বিষয়টি কমিশনের নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি তাৎক্ষণিকভাবে খন্দকার এনামুল বাছিরের বক্তব্য গ্রহণ করেন। পারিপার্শ্বিক বিষয়াদি পর্যালোচনা করে এনামূল বাছির, ডিআইজি মিজানের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণের বিষয়ে প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছেন মর্মে প্রতিবেদন দেন।

পরে দুদক থেকে ১৩ জুন বিষয়টি অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ৩ সদস্যের একটি অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়। এর মাঝখানে বাছিরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

ওই টিম ঘটনাস্থল পরিদর্শন, এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িতদের বক্তব্য গ্রহণ, এনটিএমসি থেকে বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণ ও পারিপার্শ্বিক বিষয়াদি পর্যালোচনা করে। এতে দেখা যায়, ডিআইজি মিজানুর রহমান চলতি বছরের ১৫ জানুয়ারি একটি বাজারের ব্যাগে ২৫ লাখ টাকা খন্দকার এনামুল বাছিরকে দেয়ার জন্য আনেন। রাজধানীর রমনা পার্কে এ নিয়ে উভয়ে আলাপ-আলোচনা করেন।

এক পর্যায়ে আলোচনা শেষে তারা রমনা পার্ক থেকে বের হয়ে রাজধানীর শাহজাহানপুর এলাকায় খন্দকার এনামুল বাছিরের কাছে ২৫ লাখ টাকাসহ ব্যাগটি হস্তান্তর করেন। খন্দকার এনামুল বাছির টাকার ব্যাগ নিয়ে তার বাসার দিকে চলে যান। একইভাবে ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি শপিংব্যাগে ১৫ লাখ টাকা বাছিরকে দেয়ার জন্য আগের দিনের মতোই রমনা পার্কে যান মিজান।

সেখানে আলোচনা শেষে তারা পার্ক থেকে বের হয়ে রাজধানীর শান্তিনগর এলাকায় খন্দকার এনামুল বাছিরের কাছে ১৫ লাখ টাকাসহ ব্যাগটি হস্তান্তর করেন। যা অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠিত হয়।

ডিআইজি মিজান ও এনামুল বাছিরের মধ্যকার কথোপকথন পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা গেছে, এনামুল বাছির তার ছেলেকে ঢাকার কাকরাইলে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল থেকে আনা-নেয়ার জন্য ডিআইজি মিজানের কাছে একটি গাড়ি দাবি করেন। গাড়ি দাবির বিষয়টি স্বীকার করে বাছির বিভাগীয় তদন্ত টিমের কাছেও বক্তব্য প্রদান করেন।

ডিআইজি মিজানুর রহমান অবৈধ পন্থায় অর্জিত অপরাধলব্ধ আয় থেকে ৪০ লাখ টাকা অসৎ উদ্দেশ্যে খন্দকার এনামুল বাছিরকে ঘুষ হিসেবে প্রদান ও হস্তান্তর করেছেন। যা খন্দকার এনামুল বাছির গ্রহণ করেছেন এবং পরে তিনি অবৈধ পন্থায় প্রাপ্ত লাখ টাকার অবস্থান গোপন করেন।

ডিআইজি মিজানুর রহমান এবং খন্দকার এনামুল বাছির উভয়ে বেআইনিভাবে দুটি পৃথক সিম ব্যবহার করে একে অপরের সঙ্গে টেলিযোগাযোগসহ খুদে বার্তা আদান-প্রদান করেন তা প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়। ওই সিম দুটি ডিআইজি মিজানুর রহমানের বডিগার্ড মো. হৃদয় হাসান ও অর্ডারলি মো. সাদ্দাম হোসেনের নামে কেনা হয়।

ডিআইজি মিজানুর রহমানের ভাষ্যমতে, তিনি ০১৪০১৯৪৪৯১৫ নম্বরের সিমটি ব্যবহারের জন্য খন্দকার এনামুল বাছিরকে একটি স্যামসাং মোবাইল সেট কিনে দেন। অনুসন্ধানকালে এনটিএমসি’র প্রতিবেদন ও সাক্ষীদের বক্তব্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ০১৪০১৯৪৪৯১৫ নম্বরের সিমটি একটি স্যামসাং মোবাইলে ব্যবহৃত হয়েছে। মোবাইলটি ডিআইজি মিজানুর রহমানের বডিগার্ড হৃদয় হাসান গত ৯ জানুয়ারি বনানী সুপার মার্কেট থেকে কেনে।

মোবাইল অপারেটরদের দেয়া তথ্যমতে, ওই সিমটি হৃদয় হাসানের নামে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) কার্ড দিয়ে রেজিস্টার্ড করে কেনা হয়। পরবর্তীকালে ১০ জানুয়ারি ডিআইজি মিজানুর রহমান সিমসহ মোবাইলটি ব্যবহার করে তার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার জন্য দুদক পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরকে প্রদান করেন।

ডিআইজি মিজানুর রহমান অসৎ উদ্দেশ্যে পূর্বপরিকল্পিতভাবে খন্দকার এনামুল বাছিরের সঙ্গে ঘুষ লেনদেন সংক্রান্ত কথোপকথন রেকর্ড করে সংরক্ষণ করেছেন এবং পরবর্তীকালে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন মর্মেও অনুসন্ধানে প্রমাণ মেলে।

অভিযোগের দায় থেকে বাঁচার জন্য ডিআইজি মো. মিজানুর রহমান অসৎ উদ্দেশ্যে উৎকোচ/ঘুষ প্রদান করে খন্দকার এনামুল বাছিরকে প্রভাবিত করেছেন বলে প্রমাণিত হয়েছে।

খন্দকার এনামুল বাছির সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কমিশন থেকে অর্পিত দায়িত্ব পালনকালে অসৎ উদ্দেশ্যে নিজে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার আশায় ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে মিজানকে অবৈধ সুযোগ প্রদানের চেষ্টা করেন।

এ উদ্দেশ্যে তিনি মিজানের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা উৎকোচ বা ঘুষ হিসেবে গ্রহণ করেন। একইভাবে মিজানও সরকারি কর্মকর্তা হয়ে নিজের বিরুদ্ধে আনীত অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়ার আশায় অনুসন্ধানের ফলাফল নিজের পক্ষে নেয়ার চেষ্টা করেন। তিনি খন্দকার এনামুল বাছিরকে ঘুষ দেন। এই ঘুষ লেনদেনের ঘটনায় দু’জনই অপরাধী।

ঘটনাপ্রবাহ : ডিআইজি মিজান

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×