এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল: বেড়েছে পাসের হার ও জিপিএ-৫

ইংরেজি ও আইসিটিতে ভালো করায় ইতিবাচক প্রভাব * সবচেয়ে বেশি পাস কুমিল্লা বোর্ডে, কম চট্টগ্রামে

  মুসতাক আহমদ ১৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এইচএসসি
ছবি-যুগান্তর

শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ও আইসিটিতে তুলনামূলক ভালো করায় এবার এইচএসসির সার্বিক পাসের হার বেড়েছে। পাশাপাশি বেড়েছে জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা।

অপরদিকে গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার এবং জিপিএ-৫ বেড়েছে। এক্ষেত্রে বিজ্ঞান, মানবিক ও বিজনেস স্টাডিজের বিভিন্ন বিষয়ে পাসের হারও ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে।

বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের ফল বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। বুধবার ৮টি সাধারণ, মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল ঘোষণা করা হয়।

এবারের ফল বিশ্লেষণে গত বছরের ঠিক উল্টো চিত্র দেখা গেছে। গত বছর ইংরেজি ও আইসিটির পাসের হার কমে গিয়েছিল। এ কারণে সার্বিক পাসের হারও কম ছিল। এ বছর এ দুটি বিষয়ে শিক্ষার্থীরা ভালো করায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুটোই বেড়েছে।

এইচএসসিতে পাসের হার ৭১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। আর জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪১ হাজার ৮০৭ শিক্ষার্থী। গত বছর এইচএসসিতে সম্মিলিত পাসের হার ছিল ৬৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ২৫ হাজার ৫৬২ শিক্ষার্থী।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার পাসের হার বেড়েছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ, আর জিপিএ-৫ বেড়েছে ১৬ হাজার ২৪৫টি। গত তিন বছরের মধ্যে এবার পাসের হার সর্বোচ্চ।

এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের গড় হার ৭৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬২৯ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে পাস করেছেন ৯ লাখ ৮৮ হাজার ১৭২ জন। ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৭১.০৯ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১৮১৮৭ জন।

রাজশাহীতে পাসের হার ৭৬.৩৮ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৬৭২৯ ছাত্রছাত্রী। কুমিল্লায় পাসের হার ৭৭.৭৪ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২৩৭৫ শিক্ষার্থী। যশোরে পাসের হার ৭৫.৬৫ শতাংশ, ৫৩১২ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন।

চট্টগ্রামে পাস ৬২.১৯ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১৪১২ জন। বরিশালে পাস ৭০.৬৫ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১২০১ জন। সিলেটে পাস ৬৭.০৫ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ১০৯৪ জন। দিনাজপুরে পাস ৭১.৭৮ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪০৪৯ জন।

মাদ্রাসা বোর্ডে পাসের হার ৮৮.৫৬ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২২৪৩ জন। কারিগরি বোর্ডে পাসের হার ৮২.৬২ শতাংশ, জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩২৩৬ জন। এছাড়া ঢাকা বোর্ডের অধীনে ডিপ্লোমা-ইন-বিজনেস স্টাডিজ পরীক্ষা নেয়া হয়। এতে পাসের হার ৬০ শতাংশ, কেউ জিপিএ-৫ পায়নি।

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এ প্রসঙ্গে বলেন, শিক্ষার্থীরা এখন অনেক বেশি মনোযোগী। তারা পরীক্ষার জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিল। অভিভাবক-শিক্ষকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। গত বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে সরকার গুণগত মানোন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছিল। এ কারণে এ বছর ফলের সূচকে বেশকিছু ইতিবাচক লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছে। পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য এ তথ্যগুলো খুবই ইতিবাচক।

বুধবার ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীন অনুষ্ঠিত এইচএসসি, মাদ্রাসা বোর্ডের অধীন নেয়া আলিম এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে নেয়া এইচএসসিসহ (বিএম) মোট ১০ বোর্ডের পরীক্ষার ফল প্রকাশ উপলক্ষে দুপুর সাড়ে ১২টায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করা হয়।

এর আগে সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে ফলাফলের সারসংক্ষেপ তুলে দেয়া হয়। সারসংক্ষেপ হাতে পাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী বলেন, উচ্চ মাধ্যমিকের ফল যথেষ্ট ভালো ও গ্রহণযোগ্য। শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীরা আরও মনোযোগী হলে তারা ভবিষ্যতে ভালো করতে পারবে বলে মনে করেন তিনি।

গত বছরে এইচএসসিসহ ১০ শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার ছিল আগের ৬ বছরের মধ্যে সর্বনিু। কিন্তু এবারের পাসের হার তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

গতবছর এইচএসসি, আলিম এবং এইচএসসিতে (বিএম) পাসের হার ছিল ৬৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ আর ২০১৭ সালে ছিল ৬৮ দশমিক ৯১ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে ছিল ৭৪ দশমিক ৭০ শতাংশ। শুধু পাসই নয়, জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে রেকর্ডসংখ্যক।

এবার ১০ শিক্ষা বোর্ডে ৪৭ হাজার ২৮৬ শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ সাফল্যের মুখ দেখেছেন। গতবছর এ সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ২৬২। ২০১৭ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৩৭ হাজার ৯৬৯ জন।

আর ২০১৬ সালে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৫৮ হাজার ২৭৬ শিক্ষার্থী। ১০ শিক্ষা বোর্ডের হিসাবে গত বছরের তুলনায় এবার পাসের হার বেড়েছে ৭ দশমিক ২৯ শতাংশ, আর জিপিএ-৫ বেড়েছে ১৮ হাজার ২৪টি।

বিভিন্ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকরা মনে করেন, পাসের হার ও জিপিএ-৫ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে ইংরেজি এবং আইসিটি। এছাড়া বিষয়ভিত্তিক পাসের হারও ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেন, এবার ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৭১.০৯ শতাংশ আর গত বছর ছিল ৬৬.১৩ শতাংশ। পাসের হার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইংরেজি এবং আইসিটিতে বর্ধিত পাসের হার ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। যেমন- গত বছর ঢাকা বোর্ডের ইংরেজিতে পাসের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ, এবার তা বেড়ে হয়েছে ৭৬.৩৪ শতাংশ। আইসিটিতে পাসের হার ৯০.০২ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৮২.৮৩ শতাংশ।

ফল বিশ্লেষণে পাসের হার বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আরেকটি কারণ চিহ্নিত করা গেছে। তা হচ্ছে বিভাগ ও বিষয়ভিত্তিক পাসের হার। এ বছর বিজ্ঞানে পাসের হার ৮৫.৫৭ শতাংশ। গত বছর এই বিভাগে প্রায় ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছিল।

এই পাসের হার বৃদ্ধিতে বিজ্ঞান বিভাগের, রসায়ন-পদার্থের মতো বিষয়ে গত বছরের চেয়ে পাসের হার বেড়েছে। দেখা গেছে, যে বোর্ডগুলোয় এসব বিষয়ে পাস বেড়েছে, সেখানে গড় পাসের হারও বেশি।

এ বছর যশোর বোর্ডে পাসের হার সবচেয়ে বেশি ৭৫.৬৫ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় ১৫ শতাংশের বেশি। ২০১৮ সালে এ বোর্ডে ৬০.৪০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছিল। এবার সেটা হয়েছে ৭৫.৬৫ শতাংশ।

দেখা গেছে, এই বোর্ডে পদার্থ ও রসায়নসহ অন্যান্য বিষয়ে পাসের হার গত বছরের চেয়ে বেশি। মাদ্রাসা বোর্ডেও ঘটেছে একই ঘটনা। এই বোর্ডে পাসের হার এবার ১০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৮৮.৫৬ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ৭৮.৬৭ শতাংশ।

এই বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক কায়সার হোসেন বলেন, মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কাছে আরবি, ইংরেজি এবং আইসিটি কঠিন বিষয় হিসেবে পরিচিত।

এবার আরবিতে পাসের হার গত বছরের তুলনায় ৩.৩২, ইংরেজিতে ৭.১৪ এবং আইসিটিতে ১.৯১ শতাংশ বেশি। বিষয়ভিত্তিক বেশি পাসই বোর্ডের সার্বিক ফলের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বাড়িয়েছে পাসের হার।

সবচেয়ে কম পাস মানবিকে : বিষয়ভিত্তিক পাসের হার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মানবিকে সবচেয়ে বেশি ফেল করেছে। এই বিভাগে পাসের হার ৬৫.০৯ শতাংশ। এটা অবশ্য গত বছরের চেয়ে বেশি।

গত বছর মানবিকে ফেল করেছিল ৪৪ শতাংশ। অপরদিকে মানবিক, বিজ্ঞান ও বিজনেস স্টাডিজের মধ্যে পাসের হার বরাবরের মতোই বেশি বিজ্ঞানে। বিজ্ঞানে পাসের হার ৮৫.৫৭ শতাংশ। গত বছর বিজ্ঞানে প্রায় ৭৯ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছিল।

এই তিন বিভাগে বিষয়ভিত্তিক পাসের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মানবিকের বিভিন্ন সাবজেক্টে গত বছরের চেয়ে খারাপ করেছে শিক্ষার্থীরা। যেমন- এ বছর ৮ বোর্ডে মানবিকের বিষয় পৌরনীতিতে গড় পাসের হার ৮৮.১৮, যা গতবছর ছিল ৯৩.৪১।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানবিকের বিষয়গুলোতে পাসের হার গত বছরের মতো থাকলে সম্মিলিত পাসের হারে দ্বিগুণ প্রভাব ফেলতো। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেন, যদি মানবিকে আর এক শতাংশ শিক্ষার্থী বেশি পাস করত, তাহলে সার্বিক পাসের হার দুই শতাংশ বেড়ে যেত।

গ্রামাঞ্চলে তুলনামূলক খারাপ ফল : গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের ফল তুলনামূলক খারাপ। এবার সর্বমোট ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৬২৯ শিক্ষার্থী এ পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ৯ লাখ ৮৮ হাজার ১৭২ জন। ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৫৭ ছাত্রছাত্রী ফেল করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফেল করা এসব শিক্ষার্থীর বেশির ভাগই গ্রামাঞ্চলের এবং সুবিধাবঞ্চিত অভিভাবকের সন্তান বা কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষার্থী।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীন বিভিন্ন জেলার ফল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মহানগরীতে যেখানে পাসের হার ৮৬ শতাংশের বেশি, সেখানে রাজবাড়ী জেলায় ৫২ শতাংশ শিক্ষার্থী ফেল করেছে।

আবার নারায়ণগঞ্জে ৭৩ শতাংশের বেশি পাসের হার, কিন্তু ফরিদপুরে মাত্র ৫৫ শতাংশ পাস করেছে। এই বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেন, আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি, ফরিদপুর, রাজবাড়ী এবং মাদারীপুর জেলায় পাসের হার কম। এই বোর্ডের অধীন সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জেলা নেত্রকোনা-কিশোরগঞ্জেও পাসের হার কম।

চার সূচকই ঊর্ধ্বমুখী : ভালো ফলের সূচক হিসেবে চারটি দিক ধরা হয়। এগুলো হচ্ছে- পাসের হার, মোট জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা, শতভাগ ও শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। এবার চার সূচকই ঊর্ধ্বমুখী।

এ বছর ১০ বোর্ডে মোট পাসের হার গত বছরের চেয়ে বেশি। বেড়েছে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা। অপরদিকে গত বছর শতভাগ পাস করা কলেজ ও মাদ্রাসা ছিল ৪০০টি, এবার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯০৯টি। শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানও কমেছে। গত বছর ছিল ৫৫টি, এবার কমে হয়েছে ৪১টি।

ঘটনাপ্রবাহ : এইচএসসি পরীক্ষা ২০১৯

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×