দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় বন্যা

আশ্রয়হীন মানুষের খাবারের অভাব

চার জেলায় দুই বোনসহ ৫ শিশুর মৃত্যু * টাঙ্গাইল ও কুড়িগ্রামে বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত * ১৬ নদীর পানি বিপদসীমার উপর * যমুনা, তিস্তা ও সাঙ্গুতে রেকর্ড পানিপ্রবাহ * ৯ জেলায় আরও অবনতির শঙ্কা

প্রকাশ : ১৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

বন্যার পানিতে বাড়িঘর ভেসে গেছে। গবাদিপশু আর সহায়-সম্বল নিয়ে বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে কয়েকটি পরিবার। এসব পরিবারের কৃষক আইয়ুব আলী, শাহারুল ও নজরুল ইসলাম জানান, তাদের ৩০ বিঘা জমির পাটের জাগ বানের পানিতে ভেসে গেছে। ওই পাট বিক্রি করে এবার কোরবানি ও সন্তানদের নতুন কাপড় দেয়ার স্বপ্ন ছিল। পাটের জাগের সঙ্গে তাদের সেই স্বপ্নও ভেসে গেল যমুনায়। বন্যায় বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে দেখা গেছে এমন চিত্র।

অন্যদিকে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় একটি ব্রিজে আশ্রয় নিয়েছে চারটি পরিবার। বৃহস্পতিবার সরেজমিন সেখানে দেখা যায়, লবণ দিয়ে ভাত মেখে একটি শিশুকে খেতে দেয়া হয়েছে। কিন্তু সে তরকারির জন্য কান্নাকাটি করছিল। বন্যা আক্রান্ত বেশির ভাগ জেলায়ই রয়েছে এমন কষ্ট আর দুর্ভোগের চিত্র।

বিভিন্ন স্থানে বাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন আরও লাখ লাখ মানুষ। কয়েকটি স্থানে সড়ক ও রেল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বানভাসি মানুষ গরু-ছাগল নিয়ে উঁচু সড়ক ও বাঁধে আশ্রয় নিলেও শুকনো খাবারের জন্য হাহাকার দেখা দিয়েছে।

সরকারিভাবে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও তা অপ্রতুল বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। টিউবওয়েল ডুবে যাওয়ায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট। ফলে ডায়রিয়াসহ নানা পানিবাহিত রোগবালাই ছাড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। টাঙ্গাইলে পানিতে ডুবে দুই বোনসহ চার জেলায় ৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বর্তমানে দেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা বন্যাকবলিত। ইতিমধ্যে তা ভয়াবহ আগ্রাসী রূপ নিয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল, বানের পানি ও দেশের ভেতরের বৃষ্টির কারণে এলাকাভেদে ১০ দিন ধরে চলছে এ বন্যা। যতই দিন যাচ্ছে, ততই তা শহর-গ্রাম ও জেলার পর জেলা প্লাবিত করছে। আগামী এক সপ্তাহেও বন্যা পরিস্থিতি থেকে মুক্তির কোনো আশা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।

সাধারণত ৫ দিনব্যাপী বন্যাকে স্বল্পমেয়াদি, ১০ দিন ধরে চললে মধ্যমেয়াদি এবং এর বেশি সময় ধরে চললে তা ভয়াবহ বন্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জেলা বান্দরবান, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি ও চট্টগ্রামে ৬-৭ জুলাই বন্যা শুরু হয়। সেখানকার বন্যা অবশ্য ইতিমধ্যে কেটে গেছে।

কিন্তু ১০ জুলাই থেকে সিলেট বিভাগ এবং ১১ জুলাই থেকে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায় শুরু হওয়া বন্যা এখনও চলছে। এর মধ্যে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু বাকি জেলাগুলোয় আরও কয়েকদিন বন্যা থাকতে পারে। রংপুর ও ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় চলমান বন্যা আগামী সপ্তাহেও শেষ না হওয়ার আশঙ্কা আছে। এমনটি হলে এ দুই বিভাগের বন্যা ভয়াবহ হিসেবে চিহ্নিত হবে।

বুয়েটের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় এবার নজিরবিহীন বন্যা হচ্ছে। জামালপুরে বাহাদুরাবাদ এবং গাইবান্ধার ফুলপুরে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি পানি উঠেছে এ বন্যায়। নীলফামারীতে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা এবং বান্দরবনে সাঙ্গু নদীতেও এবার অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে পানি উঠেছে। এ রেকর্ড ভঙ্গকারী বন্যার কারণে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি বেড়েছে। এটা ভবিষ্যতের জন্য আরও ভয়ংকর বার্তা দিচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবর্তিত পরিস্থিতি বা অল্প সময়ে অধিক বৃষ্টিপাত, নদ-নদীর নাব্য হ্রাস এবং বাঁধের দুর্বলতার কারণে এ বন্যা ও বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতি বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।

বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বন্যায় আক্রান্ত জেলাগুলোর মধ্যে আছে- কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ, টাঙ্গাইল, রাজবাড়ী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, চাঁদপুর, নেত্রকোনা, সিলেট, সুনামগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার।

এছাড়া চট্টগ্রাম, বান্দরবান, কক্সবাজার জেলার বন্যা কেটে গেছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নারায়ণগঞ্জের লাখপুর পয়েন্টে শীতলক্ষ্যা নদীর পানি বিপদসীমা পার হতে পারে। ফলে ওই এলাকাও বন্যাকবলিত হতে পারে।

কুড়িগ্রাম, জামালপুর ও গাইবান্ধায় চলমান ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি একই রকম থাকতে পারে। তবে ২৪ ঘণ্টায় বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর ও মুন্সীগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটবে। নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও সিলেটে পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকবে। চাঁদপুর, মাদারীপুর, নারায়ণগঞ্জ এলাকায় বন্যার পানির চাপ বাড়বে।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, বন্যার মূল কারণ উজানের বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের পানি। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে আগামী সপ্তাহজুড়ে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় বন্যা চলবে। সেক্ষেত্রে নীলফামারী থেকে শুরু করে মুন্সীগঞ্জ হয়ে শরীয়তপুর পর্যন্ত জেলাগুলোয় বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত থাকবে। চাঁদপুর ও মাদারীপুরের কিছু এলাকায়ও বন্যা আক্রান্ত হবে। তবে বন্যা ১৯৮৮ বা ১৯৯৮ সালের মতো হওয়ার আশঙ্কা এখন পর্যন্ত নেই।

আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, আসাম-মেঘালয়সহ ভারতের পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টির প্রবণতা কমেছে। যে কারণে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি অব্যাহত থাকবে। কিন্তু যে পরিমাণ বন্যার পানি উঠেছে, তা নামতে আগামী সপ্তাহ লেগে যাবে।

এফএফডব্লিউসির নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, আবহাওয়ার পূর্বাভাসে আগামী ৪-৫ দিন বৃষ্টির প্রবণতা ক্রমান্বয়ে হ্রাসের কথা আছে। কিন্তু মৌসুম সক্রিয় থাকায় এরপর ফের বৃষ্টি আসবে। তখন নদ-নদীর পানি আবার বেড়ে যাবে। তবে এ সময়ের মধ্যে বন্যার পানি নেমে গেলে নতুন পানি আর বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারবে বলে মনে হচ্ছে না।

বৃহস্পতিবার এফএফডব্লিউসির দেয়া বুলেটিনে বলা হয়, ১৬টি নদী ২৬ পয়েন্টে বিপদসীমার উপরে প্রবাহিত হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে- সুরমা, কুশিয়ারা, পুরাতন সুরমা, সোমেশ্বরী, কংশ, তিতাস, মেঘনা, ধরলা, ঘাগট, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, আত্রাই, গুর, ধলেশ্বরী ও পদ্মা।

বিভিন্ন ট্রেনের রুট পরিবর্তন : বন্যার পানিতে জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ বাজার, জামালপুর-তারাকান্দি, সরিষাবাড়ী-বয়ড়া রেলপথ সেকশনের বিভিন্ন স্থান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরে রেলপথ বিভাগের পরিচালক (জনসংযোগ) মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আন্তঃনগর তিস্তা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস ট্রেনসহ ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম স্টেশন থেকে ছেড়ে আসা অন্যান্য মেইল/এক্সপ্রেস, কমিউটার ও লোকাল ট্রেন দেওয়ানগঞ্জ বাজার এবং তারাকান্দি/বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব পর্যন্ত চলাচল না করে জামালপুর স্টেশন পর্যন্ত চলাচল করছে।

অপরদিকে পশ্চিমাঞ্চল রেলপথের বাদিয়াখালি রোড-ত্রিমোহনী জংশন স্টেশনের মধ্যবর্তী স্থানে রেলপথ বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ফলে ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া আন্তঃনগর লালমণি এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঢাকা-সান্তাহার-বগুড়া-বোনারপাড়া-কাউনিয়া-লালমনিরহাট রুটের পরিবর্তে ঢাকা-সান্তাহার-পার্বতীপুর-লালমনিরহাট রুটে এবং রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঢাকা-সান্তাহার-বগুড়া-বোনারপাড়া-কাউনিয়া-রংপুর রুটের পরিবর্তে ঢাকা-সান্তাহার-পার্বতীপুর-রংপুর রুটে চলাচল করছে।

এছাড়া আন্তঃনগর ৭৬৭/৭৬৮ দোলনচাঁপা এক্সপ্রেস ট্রেনটি দিনাজপুর-সান্তাহার-দিনাজপুর রুটের পরিবর্তে দিনাজপুর-গাইবান্ধা-দিনাজপুর রুটে এবং করতোয়া এক্সপ্রেস শান্তাহার-বুড়িমারী-সান্তাহার রুটের পরিবর্তে সান্তাহার-বোনারপাড়া-সান্তাহার পর্যন্ত চলাচল করবে।

ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

শেরপুর ও ঝিনাইগাতী : শেরপুর সদর উপজেলার কামারেরচর, চরপক্ষীমারি, বলাইরচর ও চরমোচারিয়া এবং শ্রীবরদী উজেলার ভেলুয়া ও খড়িয়াকাজীরচর ইউনিয়নের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এসব ইউনিয়নের বিপুলসংখ্যক মানুষ পানিবন্দি। কাঁচা ঘরবাড়ি, গ্রামীণ রাস্তাঘাট, রোপা আমনের বীজতলা, সবজিক্ষেত, মাছের ঘের পানিতে তলিয়ে গেছে।

শেরপুর-জামালপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের পোড়ার দোকান কজওয়েতে (ডাইভারশন) হাঁটুপানি প্রবল বেগে প্রবাহিত হচ্ছে। এ সড়কে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করলেও যে কোনো সময় শেরপুর-জামালপুর হয়ে রাজধানী ঢাকা ও উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে পারে। এদিকে ঝিনাইগাতীতে বানের পানিতে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ বিলাসপুর মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র মামুনের (১৩) লাশ বৃহস্পতিবার উদ্ধার করা হয়েছে।

এ নিয়ে চার দিনে ঝিনাইগাতীতে বন্যার পানিতে ডুবে শিশু ও বৃদ্ধাসহ ৪ জনের মৃত্যু হল। জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত আছে।

টাঙ্গাইল, ভূঞাপুর, দেলদুয়ার ও কালিহাতী : বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে ভূঞাপুর-তারাকান্দি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এ বাঁধটি ভেঙে যাওয়ায় ভূঞাপুর-তারাকান্দি সড়ক যোগাযোগও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে ভূঞাপুরসহ ঘাটাইল, কালিহাতী ও গোপালপুর উপজেলার বিরাট অংশ বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এর আগে বুধবার রাত ১১টার দিকে ভূঞাপুর উপজেলার তাড়াই এলাকার একটি বাঁধ ভেঙে অন্তত ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। পানির তোড়ে গাড়াবাড়ী-বাহাদীপুর সংযোগ সড়ক তাড়াই নামক স্থানে ভেঙে গেছে। তীব্র স্রোতে বেশ কয়েকটি ঘরবাড়িও ভেঙে গেছে।

জেলার পাঁচটি উপজেলার ১১১টি গ্রামের কয়েক লক্ষাধিক মানুষ বন্যাকবলিত। এদিকে কালিহাতীতে বন্যার পানিতে ডুবে দুই বোনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলার চরদুর্গাপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা হল- ওই গ্রামের আবু সাইদ মিয়ার মেয়ে লিনা (১২) ও তানজিলা (১০)। বাড়ি থেকে বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়া রাস্তা দিয়ে দোকানে যাওয়ার সময় স্রোতের টানে খালে পড়ে মৃত্যু হয় তাদের।

জামালপুর, বকশীগঞ্জ, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ ও সরিষাবাড়ী : লাইনে পানি ওঠায় জামালপুর-তারাকান্দি-যমুনা সেতু পূর্ব লাইন এবং জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। বুধবার রাতে নতুন করে বকশীগঞ্জ পৌর শহরের ৫টি ওয়ার্ডের বাসাবাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। বৃহস্পতিবার সকালে মেরুরচর ইউনিয়নের জাগিরপাড়া গ্রামের মাসুদ মিয়ার ছেলে মিনহাজ (৪) পানিতে ডুবে মারা যায়।

এদিকে দেওয়ানগঞ্জে পানি বাড়ার সঙ্গে বেড়েছে ভাঙন। দুই দিনে চিকাজানির খোলাবাড়িরচর উচ্চবিদ্যালয় খোলাবাড়ি গুচ্ছগ্রামের ৭০টি পরিবারের বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। গোটা উপজেলা ৩ ফুট পানির নিচে। ৭ দিন ধরে বাড়িতে আটকাপড়া মানুষ জ্বালানি সংকটের কারণে রান্নাবান্না করতে পারছেন না। পাশাপাশি গোখাদ্যের অভাবে গৃহস্থরা অসহায় হয়ে পড়েছেন। বৃহস্পতিবার সকালে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শন শেষে ব্রহ্মপুত্র নদে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম এমপি।

বগুড়া : জেলার তিন উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। ডুবে যাওয়া বাড়িঘর ফেলে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নেয়া বন্যার্তদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। এসব স্থানে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও গোখাদ্যের সংকট দেখা দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার সারিয়াকান্দির চন্দনবাইশা, কুতুবপুর, কর্নিবাড়ি, দেলুয়াবাড়ি, গজারিয়া, বাগবেড়, হাটশেরপুর, কাজলা ইউনিয়নের ময়ূরেরচর, কুড়িপাড়া গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বন্যাদুর্গতদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। শালুকা গ্রামের আশাদুল মণ্ডল ও করিম মণ্ডল জানান, কয়েকদিন ধরে ঘরের চালার ওপর পরিবার নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। কোনো সাহায্য পাননি বলেও দাবি করেন তারা।

এদিকে কালিতলা গ্রোয়েনের উজানে তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের ৩০ মিটার অংশ ধসে যাওয়ায় আশপাশে বসবাসকারী শতাধিক পরিবার আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। অনেকে তাদের বাড়িঘর ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আজাহার আলী মণ্ডল জানান, পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ রয়েছে। বন্যাদুর্গতরা যাতে অনাহারে না থাকে, সেজন্য তারা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

কুড়িগ্রাম, চিলমারী, উলিপুর ও রৌমারী : ব্রহ্মপুত্র ও ধরলার পানি কমতে শুরু করলেও টানা ৯ দিন পানিবন্দি মানুষ রয়েছে চরম দুর্ভোগে। সীমিত আকারে ত্রাণ শুরু হলেও বেশ কয়েক জায়গার মানুষ ত্রাণ পায়নি বলে জানিয়েছে। ফলে বানভাসি মানুষ রয়েছে খাদ্য সংকটে। বুধবার রাতে চিলমারী উপজেলার কাচকল এলাকায় বাঁধ ভেঙে গোটা উপজেলা পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

একই অবস্থা রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলায়। তিন উপজেলায় সব ধরনের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। কোমর পানিতে তলিয়ে আছে উপজেলা প্রশাসন, থানা, হাসপাতালসহ গোটা এলাকা। এখন পর্যন্ত বন্যায় ৫৬টি ইউনিয়নের ৫৭৮টি গ্রাম পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এতে সাড়ে ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। এদিকে উলিপুরের ধামশ্রেণি ইউনিয়নের মধ্য নাওড়া গ্রামে বাবলু মিয়ার মেয়ে ববিতা খাতুন (১৬) বানের পানিতে ডুবে মারা গেছে। সে পানি ভেঙে প্রতিবেশীর বাড়ি থেকে নিজ বাড়িতে ফেরার পথে স্রোতের টানে খালে পড়ে গিয়েছিল। এ নিয়ে ৯ দিনে জেলায় পানিতে ডুবে মারা গেল ১৪ জন। এর মধ্যে উলিপুরেই মারা গেছে ৮ জন।
গাইবান্ধা : বন্যায় ১ লাখ ৪ হাজার ৩৪০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের এক প্রেস বিফ্রিংয়ে জানানো হয়েছে। এছাড়া ১৬৬টি আশ্রয় কেন্দ্রে আছেন ৭১ হাজার ২৪ জন। জেলায় ২১৬টি প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। এছাড়াও ৫৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। অপরদিকে বন্যার পানির তোড়ে ৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয় নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। রেললাইনে বন্যার পানি ওঠায় বুধবার থেকে লালমনিরহাট-সান্তাহার ডিভিশনে সরাসরি ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করা হয়েছে ৫৮৫ টন চাল ও ৯ লাখ টাকা এবং ৩ হাজার ৫৫০ কার্টন শুকনো খাবার। তবে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোয় প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী দেয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) : যমুনার চরসহ পৌর এলাকার দ্বারিয়াপুর নতুনপাড়া, পোতাজিয়া ইউনিয়নের কাকিলামারি নিশিপাড়ার বন্যা পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। কাকিলামারি গ্রামের আবদুল আউয়াল আকন্দ (৪৫) ও তার স্ত্রী চায়না খাতুন (৪০) জানান, বন্যার পানিতে তাদের বাড়িঘর ডুবেছে ৫ দিন হল। চুলা ডুবে যাওয়ায় বাড়িতে রান্না হচ্ছে না। অনেক কষ্টে দিন কাটছে তাদের। তারা বলেন, ঘরে খাবার নেই। ফলে বেশির ভাগ সময় উপোস থাকতে হচ্ছে।
ফুলপুর (ময়মনসিংহ) : উপজেলার ছনধরা, সিংহেশ্বর ও ফুলপুর ইউনিয়ন বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়া রূপসী, বালিয়া, বওলা ও ভাইটকান্দি ইউনিয়নের আংশিক প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার আমন বীজতলা, আউশ ধান ও সবজিক্ষেত ডুবে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বন্যা এলাকার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।