রিফাত হত্যা

হত্যা পরিকল্পনায় ছিল মিন্নিও : এসপি

একটি মোবাইল ফোনের জন্যই হত্যা করা হয়! * তদন্তে হস্তক্ষেপ করবে না হাইকোর্ট * আরেক আসামি রিশান গ্রেফতার

  যুগান্তর রিপোর্ট ও বরগুনা দক্ষিণ প্রতিনিধি ১৯ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আদালতে মিন্নি। ফাইল ছবি
আদালতে মিন্নি। ফাইল ছবি

বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যায় জড়িত থাকার কথা তার স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি স্বীকার করেছেন বলে দাবি পুলিশ সুপার (এসপি) মারুফ হোসেনের।

বৃহস্পতিবার দুপুরে তার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন তিনি। এসপি বলেন, যারা হত্যাকারী ছিল তাদের সঙ্গে মিন্নি শুরু থেকেই যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। তিনি এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনায়ও অংশ নেন। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য যা যা করা দরকার, তার সবকিছুই তিনি করেছেন। হত্যাকারীদের সঙ্গে মিটিংও করেছেন। মিন্নি নিজেও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে তাকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।

রিফাত হত্যা মামলার তিন নম্বর আসামি রিশান ফরাজীকে গ্রেফতারের তথ্য জানাতে বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টায় ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে রিফাতকে হাজির করা হয়েছিল, তবে তার সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা বলতে দেয়া হয়নি।

এদিকে একটি মোবাইল ফোন সেটের জন্যই রিফাতকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশের একটি সূত্র। ওই সূত্রের মতে, ফোন নিয়ে বিরোধে রিফাতের কাছে মারধরের শিকার হওয়ায় রিফাত শরীফকে মারধর করার জন্য নয়ন বন্ডকে বলেছিলেন মিন্নি। সেটিই ঘটনাক্রমে হত্যাকাণ্ডে গড়ায়। এ তথ্য সঠিক কিনা জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. হুমায়ূন কবির বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘এটি ওই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কারণ। তবে এর সঙ্গে আরও বিষয় জড়িত ছিল।’ তা কি- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে এখন জানানো যাবে না।’

মিন্নিকে গ্রেফতার ও রিমান্ডে নেয়ার বিষয়ে প্রকাশিত সংবাদ বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের নজরে আনেন ফারুক হোসেন নামের এক আইনজীবী। এ সময় বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের বেঞ্চ বলেন, রিফাত হত্যা মামলার তদন্তে হাইকোর্ট কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।

এদিন বিকালে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে রিমান্ডে থাকা আসামি আল কাইয়ূম ওরফে রাব্বি আকন এবং অরিয়ান হোসেন শ্রাবণ। সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সিরাজুল ইসলাম গাজী জবানবন্দি গ্রহণের পর সন্ধ্যায় তাদের জেলহাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

তদন্ত কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, এ হত্যা মামলার দুই নম্বর আসামি রিফাত ফরাজীর ছোট ভাই রিশান ফরাজী। সে পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ডের ধানসিঁড়ি রোডের দুলাল ফরাজীর ছেলে। রিফাত ফরাজীকে ৩ জুলাই গ্রেফতার করা হয়েছিল। প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, অন্যান্য আসামির সঙ্গে রিফাত ফরাজী ও রিশান ফরাজী সরাসরি রিফাত হত্যায় অংশ নেয়।

পুলিশ সুপারের বক্তব্য : মো. মারুফ হোসেন বলেন, এ পর্যন্ত গ্রেফতার হওয়া আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং মিন্নির কথা থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে মিন্নিকে এ মামলার আসামি হিসেবে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে খুনিদের সঙ্গে মিন্নির কথোপকথন হয়েছে। একাধিক আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে মিন্নির জড়িত থাকার কথা জানিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও দু-একটি গণমাধ্যম বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রকাশ করছে অভিযোগ করে পুলিশ সুপার বলেন, এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডটি কোনো মাদকের কারণে ঘটেনি। ঘটেছে ব্যক্তিগত জিঘাংসার কারণে। মাদক বা অন্য কোনো ইস্যুর কথা উঠলে মামলাটির ফোকাস ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে পারে। এ মামলায় বাদী যাদের হত্যাকারী দাবি করেছেন, আমরা তাদের প্রায় সবাইকেই ধরেছি এবং কাউকেই ছাড় দিচ্ছি না। এ পর্যন্ত আমরা এজাহারভুক্ত ৮ জনকে গ্রেফতার করেছি। ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ নিয়ে বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ নেই।

নয়ন বন্ডদের যারা প্রশ্রয় দিয়েছেন, তাদের কী হবে? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নে মারুফ হোসেন বলেন, যাদেরই এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদেরই আইনের আওতায় আনা হবে। পুলিশ কোনো রাজনৈতিক চাপের মধ্যে আছে কিনা? জবাবে তিনি বলেন, পুলিশ কোনো চাপের মধ্যে নেই।

মোবাইল ফোনের জন্যই হত্যা : সূত্র জানায়, ২৬ জুন বুধবার রিফাতকে হত্যা করা হয়। এর ২ দিন আগে সোমবার হেলাল নামে একজনের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় রিফাত শরীফ। হেলাল রিফাত শরীফের বন্ধু হলেও নিহত নয়ন বন্ডের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। সেই মোবাইল ফোন উদ্ধারের জন্য নয়ন বন্ড মিন্নির দ্বারস্থ হয়। পরে রিফাত শরীফের কাছ থেকে ফোন উদ্ধার করেন মিন্নি। কিন্তু এটি করতে গিয়ে রিফাত শরীফের মারধরের শিকার হন।

হত্যাকাণ্ডের আগের দিন মঙ্গলবার নয়নের সঙ্গে দেখা করে মিন্নি সেই মোবাইল ফোন নয়নের হাতে তুলে দেন। এ সময় মিন্নি যে মারধরের শিকার হয়েছেন তার প্রতিশোধ নিতে স্বামী রিফাত শরীফকে মারধর করতে নয়ন বন্ডকে বলেন। তবে মারধরের সময় নয়ন যাতে উপস্থিত না থাকে, সেটাও মিন্নি নয়নকে সর্তক করে দেন। রিফাত হত্যার আগের দিন সন্ধ্যায় বরগুনা কলেজ মাঠে মিটিং করে রিফাত শরীফকে মারধরের প্রস্তুতি গ্রহণ করে বন্ড বাহিনী।

সূত্রমতে, রিফাত শরীফের ওপর হামলার আগ মুহূর্তে রিফাত শরীফের সঙ্গে মিন্নি কলেজ থেকে বের হলেও কলেজের সামনে পরিকল্পনা অনুযায়ী কোনো প্রস্তুতি দেখতে না পেয়ে সময়ক্ষেপণের জন্য স্বামীকে নিয়ে আবার কলেজে ঢোকেন মিন্নি। এর কিছুক্ষণ পরই বন্ড বাহিনীর কয়েকজন সদস্য একত্রিত হয়ে রিফাত শরীফকে মারধর করতে করতে কলেজের সামনের রাস্তা দিয়ে পূর্ব দিকে নিয়ে যায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী রিফাত শরীফকে মারধর করা হচ্ছে দেখেই মিন্নি তখন স্বাভাবিকভাবে হেঁটে যাচ্ছিলেন। তবে পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে নয়ন বন্ড রিফাত শরীফকে মারধর শুরু করলে মিন্নি তখনই এগিয়ে আসেন।

হস্তক্ষেপ করবেন না হাইকোর্ট : বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের হাইকোর্ট বেঞ্চে বৃহস্পতিবার আইনজীবী ফারুক হোসেন বলেন, বাদীর সবচেয়ে আস্থাভাজন হিসেবে মিন্নিকে এক নম্বর সাক্ষী করা হয়েছে। অথচ তাকে ১২ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করে আদালতে তোলা হয়। আদালত ৫ দিনের রিমান্ড দিয়েছেন। এ বিষয়টি উচ্চ আদালতের দেখা উচিত। তার পক্ষে কোনো আইনজীবীও দাঁড়াচ্ছেন না। আদালত তখন বলেন, পুলিশ তদন্ত করছে। এটাতে আমরা ইন্টারফেয়ার (হস্তক্ষেপ) করতে পারি না।

আইনজীবী তখন বলেন, তদন্ত হবে। কিন্তু সে (মিন্নি) তো সাক্ষী। তাকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। জবাবে আদালত বলেন, সে তো এখন গ্রেফতার। পুলিশ বলছে তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আছে। এখন আপনার কিছু করার থাকলে ফৌজদারি নিয়ম মেনে করুন। প্রপার চ্যানেলে আসুন। আমরা তদন্তে ইন্টারফেয়ার করতে পারি না।

পরে আইনজীবী ফারুক হোসেন বলেন, আমরা আদালতের কাছে বলেছি, এ মামলার চার্জশিটভুক্ত পাঁচ আসামিকে এখনও গ্রেফতার করা হয়নি। সেখানে মামলার এক নম্বর সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। তাকে রিমান্ডে নেয়ার কারণে মামলাটি অন্যদিকে চলে যেতে পারে। এ কারণে আমি বিষয়টি আদালতের নজরে এনেছিলাম।

বরগুনা সরকারি কলেজের মূল ফটকের সামনের রাস্তায় ২৬ জুন সকাল সাড়ে ১০টায় স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির সামনে কুপিয়ে জখম করা হয় রিফাত শরীফকে। বিকালে বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় রিফাতের বাবা আবদুল হালিম দুলাল শরীফ বরগুনা থানায় ১২ জনের নামে ও চার-পাঁচজনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করেন। প্রধান আসামি নয়ন বন্ড ২ জুলাই ভোরে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। তদন্ত কর্মকর্তা মো. হুমায়ূন কবির বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, এ পর্যন্ত রিফাত হত্যা মামলায় ১২ আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

এ হত্যার দ্বিতীয় ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মিন্নির সম্পৃক্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠে। ১৪ জুলাই রাতে মিন্নিকে গ্রেফতারের দাবি জানান মামলার বাদী। মঙ্গলবার সকালে পুলিশ লাইনসে নিয়ে মিন্নিকে দিনভর জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। রাতে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানানো হয়। বুধবার আদালত তার ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×