রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

রাখাইনে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টিই বড় চ্যালেঞ্জ

মিয়ানমার সরকারের পদক্ষেপ জানাতে আসছে প্রতিনিধি দল * মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার হরণ করায় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের উদ্বেগ * মিয়ানমারের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা যথেষ্ট নয় : জাতিসংঘ বিশেষ দূূত

  মাসুদ করিম ২০ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা
রোহিঙ্গা শরণার্থী। ফাইল ছবি

রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করাই প্রত্যাবাসনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মিয়ানমার বলছে, তারা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে আগ্রহী। তবে রোহিঙ্গারা রাখাইনে তাদের নিজ বসতবাড়িতে বসবাসের জন্যে নিরাপত্তাসহ উপযুক্ত পরিবেশ নেই বলে অভিযোগ করে আসছে।

এ কারণে ইতিপূর্বে প্রত্যাবাসনের দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার পরও কোনো রোহিঙ্গাই মিয়ানমারে ফিরে যেতে আগ্রহী হয়নি। মিয়ানমার থেকে শিগগিরই একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসবে। প্রতিনিধি দলটি রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার লক্ষ্যে মিয়ানমার সরকার কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সে সম্পর্কে বাংলাদেশ সরকার এবং রোহিঙ্গাদের অবহিত করবে বলে জানা গেছে।

এদিকে শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের এক সম্মেলনে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার হরণ করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে মাইক পেন্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে। তিনি রোহিঙ্গাদের ওপর নিষ্ঠুরতা পরিচালনায় দায়ীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে বলেও জানান।

পেন্স বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেনও অংশ নেন। বিশ্বের ১০৬টি দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে ৪০ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতিনিধিত্ব করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।

এছাড়া রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর নির্যাতন চালানোর অভিযোগে মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ চার সেনা কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরোপ যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের বিশেষ দূত ইয়াংহি লি। বৃহস্পতিবার মালয়েশিয়ার কুয়লালামপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, তারা (মিয়ানমারের চার জেনারেল) কখনোই যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে যায়নি। আসুন আরও বাস্তববাদী হই। লি বলেন, সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং, উপ-সেনাপ্রধান সোয়ে উইন এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল থান ও এবং অং অং ছাড়াও রোহিঙ্গা নিপীড়ন বিষয়ে ২০১৮ সালে প্রকাশিত জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে অন্য যে দু’জন সেনা কর্মকর্তার নাম এসেছে তাদের সবাইকে গণহত্যার অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত।

জানতে চাইলে শরণার্থী প্রত্যাবাসন, পুনর্বাসন ও ত্রাণসংক্রান্ত কমিশনার আবুল কালাম শুক্রবার যুগান্তরকে বলেন, ‘মিয়ানমার থেকে একটি প্রতিনিধি দল শিগগিরই আসবে। রোহিঙ্গাদের ফিরে যেতে উদ্বুদ্ধ করবে। তাদের সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে জানাবে।’ তবে প্রতিনিধি দলের সফর সম্পর্কে তিনি আর বিস্তারিত কিছুই বলেননি।

বাংলাদেশ সরকার মনে করে, মিয়ানমার মুখে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার কথা বললেও এ ব্যাপারে তাদের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করেই বলেছেন, মিয়ানমার আসলে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে চাইছে না। এটাই হল বড় সমস্যা। তিনি অবশ্য মনে করেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিলে এ সমস্যার সমাধান হবে। কারণ বাংলাদেশের পক্ষে এত বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে দীর্ঘদিন আশ্রয় দেয়া সম্ভব নয়।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে রাজি করাতে বাংলাদেশ নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীন ও ভারতের সঙ্গেও কাজ করবে করছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে সংকট নিরসনে মিয়ানমারের ওপর চাপ বৃদ্ধি করতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) সঙ্গেও কাজ শুরু করেছে। রোহিঙ্গাদের শান্তিপূর্ণ উপায়ে ফেরত পাঠানোই বাংলাদেশের কূটনীতির কেন্দ্রীয় অগ্রাধিকার। বাংলাদেশ অবশ্য মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ঠিক রেখে প্রত্যাবাসন সম্পাদনে আগ্রহী। তার অংশ হিসেবে বিশ্বব্যাপী এ সংকটের ব্যাপারে সচেতনতা গড়ে তোলার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।

রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে বসবাসের পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশটির ওপর চাপ বৃদ্ধির জন্যে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর চীনের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি চীন সফর করেছেন। সেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে এ বিষয়ে তার আলোচনা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে রাজি করাতে আলোচনা করবে চীন।

অপরদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কঠিন পদক্ষেপই নেয়া হয়েছে। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর বিচারবহির্ভূত গণহত্যা চালানোর অভিযোগে মিয়ানমারের সেনাপ্রধানসহ সামরিক বাহিনীর শীর্ষ চার কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের জন্য যারা দায়ী, তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে মিয়ানমার সরকার কোনো উদ্যোগই নেয়নি। এতে আমরা উদ্বিগ্ন। মিয়ানমার সেনাবাহিনী সারা দেশেই নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘন চালিয়ে যাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়া চার কর্মকর্তা হলেন- মিয়ানমারের সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইং, সেনাবাহিনীর উপপ্রধান ভাইস সিনিয়র জেনারেল সো উইন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল থান ও এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অং অং। নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী মিয়ানমারের ওই সেনা কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাবেন না। যুক্তরাষ্ট্রে তাদের কোনো সম্পত্তি থাকলে তা বাজেয়াপ্ত করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তারা কোনো ধরনের ব্যবসায়িক লেনদেন করতে পারবেন না।

পম্পেও বলেন, রাখাইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িত থাকার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়ার পরই মিয়ানমারের ওই চার শীর্ষ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৭ সালে রাখাইনের ইন দিনে সেনা অভিযানের সময় শিশুসহ ১০ রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যার পর লাশ পুঁতে ফেলার ঘটনায় সাত সেনা সদস্যকে ১০ বছরের সাজা দিয়েছিলেন দেশটির সামরিক আদালত। কিন্তু ৭ মাস না যেতেই তাদের গোপনে ছেড়ে দেয়া হয়।

সেনাপ্রধান হ্লাইং নিজেই ওই সাতজনকে মুক্তির আদেশ দিয়েছিলেন বলে জানান পম্পেও। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বেশ কিছু স্থাপনায় বিদ্রোহীদের হামলার অভিযোগ তুলে রোহিঙ্গাদের গ্রামে গ্রামে শুরু হয় সামরিক বাহিনীর অভিযান। তাদের ওপর গণহত্যা, ধর্ষণ, জ্বালাও-পোড়াও, লুটপাট চালানো হয়। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

এদিকে, রোহিঙ্গাদের গণহত্যার বিষয়ে তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। অনুমতি পেলে চলতি বছরের অক্টোবরেই তদন্ত শুরু হবে। আইসিসির ডেপুটি প্রসিকিউটর জেমস স্টিওয়ার্ট বলেছেন, অক্টোবরেই তদন্ত শুরুর অনুমতি চেয়েছি। যদি প্রি-ট্রায়াল চেম্বার অনুমতি দেয় তবে অতি দ্রুত তদন্ত শুরু করতে পারব। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে আইসিসির চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি জানান।

মিয়ানমার আইসিসিকে কোনো প্রকার সহযোগিতার অনুমতি দিতে অস্বীকার করেছে। মিয়ানমার বলেছে, তারা আইসিসির সদস্য নয় ফলে তাদের বিরুদ্ধে বিচার করা সম্ভব নয়।

তবে আইসিসির প্রসিকিউটর বলেন, রাখাইনে নির্যাতনের ফলে তার প্রভাব বাংলাদেশের ওপর পড়েছে। বাংলাদেশ আইসিসির রোম সনদে স্বাক্ষরকারী দেশ। আইসিসির মতে, মিয়ানমার রোম সনদে স্বাক্ষর না করলেও রোহিঙ্গা বিতাড়নে দেশটি যে অপরাধ করেছে, তার ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে স্বাক্ষরকারী দেশ বাংলাদেশের ওপর। তাই রোম অনুযায়ী এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আদালত ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরেসের সঙ্গে আলোচনা করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে এ বৈঠক হয়। গুতেরেস আগে থেকেই রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে খুবই আন্তরিক। সে কথা তিনি পুনর্বার জানিয়েছেন। আশা করা হচ্ছে, সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে তুলে ধরা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবারের সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

আরও
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×