পিপলস লিজিং দেউলিয়া

শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে জড়িতদের

জালিয়াতির তিন মামলায় দুদকের তদন্ত চলছে * আত্মসাৎ করা অর্থ আদায়ে মামলা হবে অর্থঋণ আদালতে

  যুগান্তর রিপোর্ট ২২ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের অর্থ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির মুখোমুখি করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য আইন অনুযায়ী সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে পিপলস লিজিংয়ে জালিয়াতির দায়ে এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের সাবেক চেয়ারম্যান ও পরিচালকসহ সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি), মহাব্যবস্থাপকসহ (জিএম) ১৪ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করেছে, যা এখন তদন্তাধীন। এ ছাড়া পিপলস লিজিংয়ের পরিচালকরা নামে-বেনামে প্রতিষ্ঠানের ৫৭৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে যার প্রমাণ মিলেছে। দায়িত্বশীলরা বলছেন, আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হলে জেল-জরিমানা হবে। এ ছাড়া অর্থ আদায় না হলে সব সম্পদ জব্দের বিধান রয়েছে। দায় শোধ না হওয়া পর্যন্ত নতুন ঋণ পাওয়ার পথও বন্ধ থাকবে।

সূত্র জানায়, এদিকে আর্থিক সংকটে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনায় সক্ষমতা হারানোর ফলে আদালতের নির্দেশে বাংলাদেশ ব্যাংক একে অবসায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এ জন্য গত বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে আদালত থেকে সত্যায়িত অনুলিপি বাংলাদেশ ব্যাংকে এসেছে। এখন বাংলাদেশ ব্যাংক পিপলস লিজিংয়ে একজন কর্মকর্তা নিয়োগ করবে। যিনি অডিট ফার্ম নিয়োগ করে এর সম্পদ ও দায়-দেনার হিসাব চূড়ান্ত করবেন। এরপর আনুপাতিক হারে পাওনাদারদের টাকা পরিশোধ করা হবে। প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে যদি আমানতকারীদের প্রাপ্য অর্থসহ সমুদয় দায়-দেনা পরিশোধ করা সম্ভব না হয় বাকি অর্থ আদায়ের জন্য জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। এ ছাড়া যেসব খেলাপি ঋণ রয়েছে সেগুলো আদায়ের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বপ্রাপ্ত এ কর্মকর্তা। সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে ওই প্রতিষ্ঠানের সব হিসাব জব্দ করা হয়েছে। শেয়ারবাজারে এর লেনদেন বন্ধ করা হয়েছে। ফলে এ প্রতিষ্ঠানের কোনো সম্পদ এখন আর হস্তান্তর বা স্থানান্তর করা যাবে না।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, পিপলস লিজিংয়ের ব্যাপারে এখন নিয়োগকৃত কর্মকর্তা সবকিছু করবেন। এ ব্যাপারে আইনে যা বলা আছে, সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া হবে। এ বিষয়গুলো আদালতকে নিয়মিতভাবে জানানো হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকও বিষয়টি তদারকি করবে। তিনি আরও বলেন, প্রতিষ্ঠানটির দেনার চেয়ে সম্পদের পরিমাণ বেশি। যে কারণে আমানতকারীদের ভয়ের কোনো কারণ নেই। তবে একটু ধৈর্য ধরতে হবে।

সূত্র জানায়, ২০১২ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ভালোভাবে চলছিল। ২০১৩ সালে এসে এতে পরিচালকদের কুদৃষ্টি পড়ে। তারা নামে-বেনামে অর্থ আত্মসাতের প্রক্রিয়া শুরু করে। এ প্রক্রিয়ায় জড়িত হয় প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহীরাও। নিজেদের পদ রক্ষার জন্য পরিচালকদের চাপে সব ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ড চালাতে থাকেন।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তদারকির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ওই সময়ে একটি মাত্র বিভাগ ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বাজার বিভাগ। এ বিভাগ থেকেই সব তদারকি হতো। জনবলের অভাবে তারা প্রতিষ্ঠানগুলোতে তদন্ত করতে পারত না। এ সুযোগেই পিপলস লিজিংয়ের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালকরা লুটপাটে নামে। পরে অবশ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে তদন্ত পরিচালনার জন্য একটি উপ-বিভাগ গঠন করেছে।

পিপলস লিজিংয়ে জালিয়াতির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৫ সালে একটি বিশদ তদন্ত করে। ওই তদন্তে আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকরা নামে-বেনামে প্রতিষ্ঠানের ৫৭৮ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা উঠে আসে। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠানের ৫ জন পরিচালককে অপসারণ করে। এর চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেন। মামলার কারণে সাবেক এমডি, ডিএমডি, জিএমসহ অনেকে চাকরিচ্যুত হন। পরে পর্ষদ পুনর্গঠন করা হয়। তারা প্রতিষ্ঠানটিকে এতদিন পরিচালনা করে আসছিলেন। কিন্তু খেলাপি ঋণ আদায় করতে পারেননি। নতুন আমানতও আনতে পারেননি। যে কারণে প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছিল। একই সঙ্গে নতুন বিনিয়োগও ছিল বন্ধ। সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটি দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে। যে কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একে অবসায়ন করার সিদ্ধান্ত নেয়।

সূত্র জানায়, প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের বড় অংশই ছিল এককভাবে সামসুল আলামিন গ্রুপের কাছে। ফলে তারাই জালিয়াতি করে। গ্রুপের ২০ প্রতিষ্ঠান ও ৭ জন পরিচালকের নামে-বেনামে ওইসব অর্থ আত্মসাৎ করা হয়। এসব প্রস্তাব পর্ষদেও উপস্থাপন করা হয়নি। এর মধ্যে সাবেক চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন প্রতিষ্ঠানের ১২৩ কোটি টাকার জমি নিজের নামে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়ে নেন। পরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের চাপে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। জমি রেজিস্ট্রি ও জালিয়াতির মাধ্যমে সাবেক চেয়ারম্যান মতিউর রহমান ১১৬ কোটি, সাবেক পরিচালক খবির উদ্দিন মিয়া ১০৭ কোটি, আরেফিন সামসুল আলামিন, নার্গিস আলামিন ও হুমায়রা আলামিনের নামে ২৯৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়।

এদিকে ২০১৯ সালের ২ জানুয়ারি সাড়ে ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের দায়ে সাবেক পরিচালকসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। এর আগে দুদক আরও দুটি মামলা করেছে ১৪ জনের নামে।

প্রতিষ্ঠানের এমডি সামি হুদা রোববার যুগান্তরকে বলেন, এখন আমাদের আর কিছু করার নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের অবসায়ক যেভাবে নির্দেশনা দেবেন আমরা সেভাবে কাজ করব।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, অবসায়ক দায়িত্ব নিয়ে প্রতিষ্ঠানের খেলাপিদের বিরুদ্ধে অর্থ আদায়ের জন্য দেউলিয়া আদালতে মামলা দায়েরসহ তা দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করবেন। এ মামলায় অর্থ নেয়ার ঘটনা প্রমাণ করা হলে জালিয়াতদের অর্থ ফেরত দিতে হবে। এ ছাড়া অবসায়ক প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্রের ভিত্তিতেই ঋণের বিপরীতে বন্ধকি সম্পদ বিক্রি করে দিতে পারবেন। এতে টাকা আদায় না হলে পিপলস লিজিং থেকে ঋণ নেয়া খেলাপিদের সম্পদ নিলাম করতে আদালতের অনুমতি চাইতে পারবেন। এর ভিত্তিতে টাকা আদায় করা সম্ভব হবে বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আদালতের রায়ের পরও টাকা আদায় না হলে গ্রুপটি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা হারাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, তাদের ব্যবসা পরিচালনার স্বার্থে এর দায় শোধ করতে হবে।

এদিকে ইতিমধ্যে সামসুল আলামিন গ্রুপের পরিচালকরা তাদের শেয়ার বিক্রি করে দায় কিছুটা শোধ করেছেন। আরও যেসব দায় আছে সেগুলো আদায়ের উদ্যোগ নেয়া হবে এখন।

প্রসঙ্গত, ১৯৯৭ সালে নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে পিপলস লিজিং। প্রতিষ্ঠানটির ১ হাজার ১৩১ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ৭৪৮ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ৬৬ দশমিক ১৪ শতাংশ। এখন নিয়মিত ঋণের পাশাপাশি খেলাপি ঋণও আদায়ের উদ্যোগ নেয়া হবে। আমানতকারীদের জমার পরিমাণ ২ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। এর বিপরীতে সম্পদের পরিমাণ ৩ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। লোকসানের পরিমাণ ২ হাজার ৩২৪ কোটি টাকা। ঋণ আদায় ও স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে আদানতকারীদের টাকা দেয়া হবে। প্রতিষ্ঠানটির লোকসান ও খেলাপি ঋণের কারণে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ২ হাজার কোটি টাকা।

এদিকে ২০০৫ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয় পিপলস লিজিং। প্রথমদিকে বিনিয়োগকারীদের ভালো লভ্যাংশ দিলেও গত ৩ বছরে কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি তারা। অবসায়নের পর শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীরা কিছুই পাবেন না।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×