অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যাংক চেয়ারম্যান-এমডিদের বৈঠক

সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা হবে

হাত তুলে প্রতিশ্রুতি চেয়ারম্যান-এমডিদের * সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়ন করতে না পারলে খেলাপির পরিমাণ বাড়বে * টাকা পাচারকারী কেউ রক্ষা পাবে না

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৩ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যাংক চেয়ারম্যান-এমডিদের বৈঠক
অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যাংক চেয়ারম্যান-এমডিদের বৈঠক। ছবি: যুগান্তর

ব্যাংক ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে করা হবে। ব্যবসায়ী ও ঋণগ্রহীতা উভয়ের ভালোর জন্য এটি করা হবে। সিঙ্গেল ডিজিটে সুদের হার বাস্তবায়ন করতে না পারলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়বে। পাশাপাশি ঋণগ্রহীতা ও ব্যবসায়ী- কেউ লাভবান হবেন না।

সোমবার সচিবালয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি ও চেয়ারম্যানদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তিনি আরও বলেন, ব্যাংকিং সিস্টেমের বাইরে যারা টাকা বের করে পাচার করেছে, তাদের কাউকে ছাড় দেয়া হবে না, প্রচলিত আইনের আওতায় আনা হবে।

সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে ব্যাংকের এমডিদের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমার অনুরোধ আমি এ ব্যাপারে (সিঙ্গেল ডিজিট) প্রজ্ঞাপন জারি করি বা না করি, এটি আপনারা কার্যকর করবেন।

ব্যাংকের এমডিরা আপনাকে (অর্থমন্ত্রী) সিঙ্গেল ডিজিটে সুদের হার বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন কিনা- অর্থমন্ত্রীর কাছে জানাতে চান সাংবাদিকরা। এ সময় সেখানে উপস্থিত ব্যাংকের এমডি ও চেয়ারম্যানকে হাত তুলে আশ্বস্ত করতে বলেন অর্থমন্ত্রী। সঙ্গে সঙ্গে তারা (এমডি ও চেয়ারম্যান) হাত তুলে সিঙ্গেল ডিজিটে সুদ হার নামিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন অর্থমন্ত্রীকে।

জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এ বৈঠক করা হয়। অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সচিবালয়ের অর্থ মন্ত্রণালয়ে বিকাল ৩টায় বৈঠক শুরু হয়। চলে টানা সাড়ে তিন ঘণ্টা। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. আসাদুল ইসলাম, অর্থ সচিব আবদুর রউফ তালুকদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া, সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক, ডিবিবিএল, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এবং কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের এমডি ও চেয়ারম্যানরা। বৈঠক প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, বৈঠকে সুদ হার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নিয়ে আসব। সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়নের জন্য প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন। এ দেশের প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি নাগরিক ও ব্যবসায়ী যারা আছেন, তারা প্রত্যেকেই সিঙ্গেল ডিজিটে আনার জন্য বলেছেন। অর্থমন্ত্রী বলেন, সিঙ্গেল ডিজিটে সুদের বাস্তবায়ন না করতে পারলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়ে। এতে ব্যবসায়ী এবং ঋণগ্রহীতা লাভবান হয় না। ফলে ঋণগ্রহীতা ও ব্যবসায়ী উভয়কে লাভবান করতে আমরা এ কাজটি করতে চাই।

অর্থমন্ত্রী বলেন, সিঙ্গেল ডিজিট ৯ শতাংশ হলেও এটি পৃথিবীর সব দেশের চেয়ে বেশি। এই ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ সুদ দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করা সম্ভব নয়। আবার ব্যাংকগুলো সুদ হার যেভাবে হিসাব করে- তা বিচিত্র ধরনের। সাধারণ রেটে এটির হিসাব করা হয় না। এটিকে জ্যামাতিক হারে হিসাব করা হয়। যে কারণে সুদের হার আরও অনেক বেড়ে যায়।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আজকে ১০০ টাকা ছিল বিকালে ১০ টাকা যোগ করে সুদ হার নির্ধারণ করা হয়। আবার পরের দিন সেটির ওপর সুদ আরোপ করে নির্ধারণ করে থাকে। এই হিসাব কেউ প্রতিদিন, কেউ ত্রৈমাসিকভাবে করে গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এটি সঠিক নয়। ১০ শতাংশ সুদ হার থাকলে এটি এক বছরের জন্য ১০ শতাংশই থাকবে। এটি হবে সাধারণ সুদ হার।

এ সময় ব্যাংকের এমডিদের উদ্দেশে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমার অনুরোধ আমি এ ব্যাপারে প্রজ্ঞাপন জারি করি বা না করি এটি আপনারা কার্যকর করবেন। এতে আপনারা (এমডি/চেয়ারম্যান) লাভবান হবেন। তাদের উদ্দেশ করে আরও বলেন, টাকা পেলাম না- সেটি ভালো, কোনোদিন পেলাম না- সেটি ভালো, নাকি টাকা পাওয়া যাবে- সেটি ভালো। তাই যেটি দেশের অর্থনীতির জন্য ভালো হয়, নিজ নিজ স্থান থেকে ভালো কাজ করতে পারেন, সে জায়গায় নিতে হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকিং খাত আরও জোরদার করার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বৈঠকে। এখন থেকে ব্যাংকের গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখা হবে। যাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়েছে, সেগুলো গ্রাহকরা বলছে সমাধান করে দেয়া হবে। তবে যারা অন্যায়ভাবে টাকা নিয়েছে, আমদানি ও রফতানির নামে টাকা বিদেশে পাচার করেছে কিংবা দেশেই অন্য জায়গা নিয়ে বা বালিশের নিচে রেখেছে- এটি অপরাধ।

যারা ব্যাংকিং সিস্টেমের বাইরে টাকা বের করে নিয়েছেন তাদের দেশের প্রচলিত নিয়মে ব্যবস্থা নিচ্ছি। আপনারা জানেন অনেকেই জেলখানায় আছে। ব্যাংকিং খাতের অন্যায়ের কারণে তারা জেলে আছে। এমডি বা চেয়ারম্যান নয়, পরিবারসহ জেলে আছে। ফলে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। আইন আইনের গতিতে চলবে। আমাদের কাজ হবে বিচারটি আইনের কাছে নিয়ে যাওয়া।

আমরা পর্যালোচনা করে দেখেছি, বর্তমানে আমরা নিরাপদে আছি। প্রতি তিন মাস অন্তর এখন থেকে ব্যাংকিং খাতের সার্বিক অবস্থা নিয়ে বৈঠক করা হবে। দেশের অর্থনীতির সঙ্গে মিল রেখে সব ব্যাংকিং ও নন-ব্যাংকিং খাতকে চলতে হবে। প্রত্যেকটি ব্যাংককে আলাদা সেবা উইং করতে বলা হয়েছে, যাতে গ্রাহকরা সেবা পায়।

অর্থমন্ত্রী বলেন, আমি আগে বলেছিলাম খেলাপি ঋণ আর বাড়বে না। বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা হয়েছে, বেড়েছে। আমার কাছে তথ্য অনুযায়ী সেটি বাড়েনি। এ সময় তিনি তথ্য তুলে ধরে বলেন, ২০১৮ সালে ডিসেম্বরে সোনালী ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩০ দশমিক ৩৮ শতাংশ, এটি জুনে এসে দাঁড়িয়েছে ২৫ শতাংশে। জনতা ব্যাংক গত ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩৭ দশমিক ৩২ শতাংশ, সেটি জুনে এসে ৩৫ দশমিক ১৮ শতাংশে নেমেছে।

একইভাবে অগ্রণী ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ডিসেম্বরে ছিল ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ, তা জুনে হয়েছে ১৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ। রূপালী ব্যাংকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ১৯ শতাংশ, জুনে এসে দাঁড়িয়েছে ১৭ শতাংশ। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণ গত ছয় মাসে কোনো পরিবর্তন হয়নি। ডিসেম্বরে ছিল ৫৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ, জুনে একই হার বিরাজ করছে। বেসিক ব্যাংকে ডিসেম্বরে ছিল ৫৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ, জুনে একই হার রয়েছে।

অর্থমন্ত্রী এসব তথ্য তুলে ধরে বলেন, সার্বিকভাবে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমেছে। এটি একটি ভালো লক্ষণ। অর্থমন্ত্রী বলেন, ঋণখেলাপিদের বের হওয়ার যে নীতিমালা করা হয়েছে সেটি বাস্তবায়ন হলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বহু অংশে কমে যাবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×